একটি নদীর পানি যদি ধীরে ধীরে কিছু জায়গায় আটকে যেতে শুরু করে, তাহলে একসময় পুরো নদীর প্রবাহই বাধাগ্রস্ত হয়। নদী তখন আর কেবল একটি স্থানে থেমে থাকে না তার প্রভাব পড়ে আশপাশের জমি, কৃষি, জীববৈচিত্র্য এবং মানুষের জীবনযাত্রায়। অর্থনীতিও ঠিক তেমনই একটি প্রবাহমান নদী। আর এই প্রবাহ সচল রাখার অন্যতম প্রধান মাধ্যম হলো ব্যাংকিং খাত। কিন্তু যখন বিপুল পরিমাণ ঋণ ব্যাংকে আর ফিরে আসে না, তখন সেই প্রবাহে তৈরি হয় ভয়াবহ স্থবিরতা। খেলাপি ঋণ শুধু একটি আর্থিক পরিসংখ্যান নয় এটি এমন একটি দীর্ঘস্থায়ী ব্যাধি, যা ধীরে ধীরে একটি দেশের অর্থনীতির রক্তসঞ্চালনকে দুর্বল করে দেয়। বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত আজ যে সংকটগুলোর মুখোমুখি, তার মধ্যে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের নাম খেলাপি ঋণ বা নন-পারফর্মিং লোন (NPL) । বছরের পর বছর ধরে এই সমস্যা বাড়লেও কার্যকরভাবে এর সমাধান করা যায়নি। ফলে ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা কমছে, উদ্যোক্তারা প্রয়োজনীয় অর্থায়ন পাচ্ছেন না, বিনিয়োগে স্থবিরতা তৈরি হচ্ছে এবং শেষ পর্যন্ত এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে।
ব্যাংকের মূল কাজ হলো জনগণের আমানত সংগ্রহ করে সেই অর্থ উৎপাদনশীল খাতে ঋণ হিসেবে বিতরণ করা। একজন আমানতকারী ব্যাংকে অর্থ জমা রাখেন এই বিশ্বাসে যে তার অর্থ নিরাপদ থাকবে এবং ব্যাংক সেই অর্থ সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা করবে। অন্যদিকে একজন উদ্যোক্তা সেই অর্থ ঋণ হিসেবে নিয়ে ব্যবসা সম্প্রসারণ করেন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেন এবং অর্থনীতিকে গতিশীল করেন। অর্থাৎ ব্যাংক হলো সঞ্চয় ও বিনিয়োগের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধন। কিন্তু এই ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো ঋণ সময়মতো পরিশোধ হতে হবে। যখন কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত সময়েও ঋণ পরিশোধ করে না এবং দীর্ঘ সময় ধরে বকেয়া রাখে, তখন সেটি খেলাপি ঋণে পরিণত হয়। বাংলাদেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগজনক। বিভিন্ন সময় পুনঃতফসিল, বিশেষ সুবিধা কিংবা নীতিগত শিথিলতার মাধ্যমে খেলাপি ঋণ কম দেখানোর চেষ্টা করা হলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। অনেক বড় ঋণগ্রহীতা বছরের পর বছর ঋণ পরিশোধ না করেও নতুন সুবিধা পেয়ে যাচ্ছেন। ফলে একটি ভুল বার্তা সমাজে ছড়িয়ে পড়ছে ঋণ না দিলেও তেমন কোনো বড় শাস্তির মুখোমুখি হতে হয় না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। মোট ঋণের একটি বড় অংশ এখন অনাদায়ী। অর্থনীতিবিদদের মতে, প্রকৃত খেলাপি ঋণের পরিমাণ সরকারি হিসাবের চেয়েও বেশি হতে পারে, কারণ বিভিন্ন পুনঃতফসিল ও নীতিগত সুবিধার মাধ্যমে অনেক ঋণ আনুষ্ঠানিকভাবে খেলাপির তালিকার বাইরে রাখা হয়। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, খেলাপি ঋণের বড় অংশই কয়েকজন বড় ঋণগ্রহীতার হাতে কেন্দ্রীভূত। অর্থাৎ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা নয়, বরং বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠী ও প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতাদের অনাদায়ী ঋণই এই সংকটকে আরও জটিল করে তুলছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোও বারবার সতর্ক করেছে যে, উচ্চ খেলাপি ঋণ ব্যাংকের স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগ পরিবেশ এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য বড় হুমকি। একটি দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা দুর্বল হলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও সেই দেশের অর্থনৈতিক পরিবেশ সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা পোষণ করেন।
খেলাপি ঋণ কোনো একদিনে সৃষ্টি হয়নি। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের দুর্বল সুশাসন, রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল ঋণ মূল্যায়ন এবং আইনের অসম প্রয়োগ। অনেক ক্ষেত্রে যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়াই প্রভাবশালী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছে বড় অঙ্কের ঋণ অনুমোদন করা হয়েছে। ঋণ দেওয়ার সময় প্রকল্পের বাস্তবতা, ব্যবসার সক্ষমতা কিংবা ঝুঁকি যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয়নি। আবার ঋণ নেওয়ার পর অর্থ নির্ধারিত খাতে ব্যবহার না করে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার ঘটনাও কম নয়। এর পাশাপাশি দীর্ঘসূত্রিতা বড় একটি সমস্যা। খেলাপি ঋণ আদায়ে মামলা হলেও বছরের পর বছর আদালতে ঝুলে থাকে। ফলে ঋণখেলাপিরা সময়ক্ষেপণের সুযোগ পান। অনেকেই আইনের ফাঁকফোকর ব্যবহার করে বারবার সময় নেন, পুনঃতফসিলের সুবিধা ভোগ করেন কিংবা নতুন ঋণও সংগ্রহ করেন। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো জবাবদিহির অভাব। ব্যাংকের পরিচালনা, ঋণ অনুমোদন এবং তদারকিতে যদি স্বচ্ছতা না থাকে, তাহলে অনিয়মের সুযোগ তৈরি হয়। অনেক সময় ব্যাংকের ভেতরের দুর্বল ব্যবস্থাপনাও বড় অঙ্কের ঋণ ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে।
একটি ব্যাংক যখন ঋণ দেয়, তখন সে আশা করে নির্দিষ্ট সময় শেষে সেই অর্থ সুদসহ ফিরে আসবে। কিন্তু বিপুল পরিমাণ ঋণ আটকে গেলে ব্যাংকের হাতে নতুন করে ঋণ দেওয়ার মতো অর্থের সংকট তৈরি হয়। ফলে নতুন উদ্যোক্তা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এবং সম্ভাবনাময় ব্যবসাগুলো প্রয়োজনীয় অর্থায়ন থেকে বঞ্চিত হয়। অনেক ভালো প্রকল্পও কেবল অর্থের অভাবে বাস্তবায়িত হতে পারে না। ব্যাংক তখন ঝুঁকি কমাতে ঋণ প্রদানে আরও সতর্ক হয়ে যায়। কঠোর শর্ত আরোপ করে, জামানতের পরিমাণ বাড়ায় কিংবা অনেক আবেদনই প্রত্যাখ্যান করে। এর ফলে প্রকৃত উদ্যোক্তারাও ক্ষতিগ্রস্ত হন। অন্যদিকে খেলাপি ঋণের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে ব্যাংককে অতিরিক্ত সংরক্ষণ রাখতে হয়। এতে ব্যাংকের মুনাফা কমে যায় এবং মূলধনের ওপর চাপ তৈরি হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ব্যাংককে সরকারের সহায়তারও প্রয়োজন পড়ে, যা শেষ পর্যন্ত জনগণের অর্থ থেকেই আসে।
যখন ব্যাংক নতুন ঋণ দিতে পারে না, তখন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় উৎপাদন ও বিনিয়োগ। নতুন শিল্পকারখানা গড়ে ওঠে না, বিদ্যমান শিল্প সম্প্রসারণ বাধাগ্রস্ত হয়, কর্মসংস্থানের সুযোগ কমে যায়। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা ব্যবসা চালিয়ে নিতে হিমশিম খান। অনেক ব্যবসা বন্ধ হয়ে যায় অথবা উৎপাদন কমিয়ে দিতে বাধ্য হয়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে কর্মসংস্থানের ওপর। নতুন চাকরি সৃষ্টি কমে যায়, বেকারত্ব বাড়ে এবং মানুষের আয় কমে আসে। যখন মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়, তখন বাজারে চাহিদাও কমে। ফলে ব্যবসা আরও সংকুচিত হয়। এভাবে একটি নেতিবাচক চক্র তৈরি হয়, যা পুরো অর্থনীতিকে ধীরগতির দিকে ঠেলে দেয়। খেলাপি ঋণ বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও নেতিবাচক বার্তা দেয়। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা এমন দেশে বিনিয়োগ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন, যেখানে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী, স্বচ্ছ এবং জবাবদিহিমূলক। ব্যাংকিং খাত দুর্বল হলে বিনিয়োগকারীদের আস্থাও কমে যায়। এর পাশাপাশি আমানতকারীদের মধ্যেও অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। মানুষ যদি মনে করে ব্যাংকের অর্থ নিরাপদ নয়, তাহলে ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। যদিও বাংলাদেশে ব্যাংকিং ব্যবস্থা এখনো কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে, তবুও দীর্ঘমেয়াদে এই আস্থার সংকট অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক।
খেলাপি ঋণের সংস্কৃতি বন্ধ করতে হলে কেবল নতুন নীতিমালা প্রণয়ন যথেষ্ট নয় প্রয়োজন কার্যকর বাস্তবায়ন। প্রথমত, ঋণ অনুমোদনের পুরো প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ ও প্রযুক্তিনির্ভর করতে হবে। রাজনৈতিক কিংবা ব্যক্তিগত প্রভাবমুক্ত থেকে প্রকৃত যোগ্যতা ও সক্ষমতার ভিত্তিতে ঋণ বিতরণ নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। বছরের পর বছর মামলা ঝুলিয়ে রাখার সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে। বিশেষায়িত আদালতের মাধ্যমে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা গেলে ঋণ আদায় প্রক্রিয়া অনেক কার্যকর হবে। তৃতীয়ত, পুনঃতফসিলের সুযোগ যেন প্রকৃত সমস্যাগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা পান, কিন্তু ইচ্ছাকৃত খেলাপিরা যেন সেটিকে দায় এড়ানোর কৌশল হিসেবে ব্যবহার করতে না পারেন, তা নিশ্চিত করতে হবে। চতুর্থত, ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনায় সুশাসন জোরদার করতে হবে। জবাবদিহি, অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি ক্ষমতা আরও কার্যকর ও স্বাধীন হওয়াও জরুরি। খেলাপি ঋণকে সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য একটি সংস্কৃতিতে পরিণত হতে দেওয়া যাবে না। একজন সৎ উদ্যোক্তা সময়মতো ঋণ পরিশোধ করেন, আর ইচ্ছাকৃত খেলাপি যদি একই সুবিধা ভোগ করেন, তাহলে পুরো আর্থিক ব্যবস্থার নৈতিক ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়ে।
একটি দেশের অর্থনীতি শুধু বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্প দিয়ে শক্তিশালী হয় না শক্তিশালী হয় তখনই, যখন তার আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো জনগণের আস্থা ধরে রাখতে পারে। ব্যাংকিং খাতের সুস্থতা ছাড়া টেকসই উন্নয়ন কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকে। বাংলাদেশ আজ যে অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলোর মুখোমুখি, তার মধ্যে খেলাপি ঋণ অন্যতম গুরুতর।