মুসলিম বিশ্বের জন্য ব্যাংকিং নতুন কোন বিষয় নয়। ইসলামের ইতিহাসের প্রাথমিক পর্যায়েই মুসলমানরা একটি অর্থনৈতিক পদ্ধতি গড়ে তুলতে সক্ষম হয় এবং তা ছিল সুদবিহীন ও ইসলামী শিক্ষার সাথে সাযুজ্যপূর্ণ। ইসলামী সভ্যতার গৌরবোজ্জ্বল দিনে এই পদ্ধতি সম্পূর্ণ ফলপ্রসূভাবে কাজ করেছে এবং শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে যারা অর্থ যোগদান দিত তাদের ইসলামের ইতিহাসের প্রথম দিকে সারাফ (Sarraf) বা সায়ারিফাহ (Sayarifah) বলা হতো। আব্বাসীয় খলিফা আল মুকতাদির(২৯৫-৩২০ হিজরী/৯০৮-৯৩২ খ্রিষ্টাব্দ) এর আমলে তারা আধুনিক ব্যাংক ব্যবস্থার অধিকাংশ মৌলিক কর্মকাণ্ড শুরু করে। তাদের নিজস্ব বাজার ছিলো। সেটা আজকের দিনের নিউইয়র্কে ওয়াল স্ট্রিট ও লন্ডনের লোম্বার্ড স্ট্রিট এর মতই; অনেকটা তৎকালীন বিদ্যমান প্রযুক্তিগত পরিবেশে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে তা অব্যাহত থাকে। এই পদ্ধতি মুসলিম বিশ্বের সমস্ত সঞ্চিত অর্থ একত্রিত করতে সক্ষম হয়। ফলে সে অর্থ কৃষি, শিল্প উৎপাদন ও দেশ-বিদেশে ব্যবসা-বাণিজ্য করার কাজে যোগান দেওয়া সম্ভব হয়। শুধু মুসলমানরাই নয়, তৎকালীন ইহুদী ও খ্রিস্টানরাও সুদের কারবারের চেয়ে এই পদ্ধতিকেই শ্রেষ্ঠ বলে গ্রহণ করে। ফলে তাদের মধ্যে সুদী কারবার আর সাধারণ পদ্ধতি হিসাবে থাকেনি। প্রতিবন্ধকতার মধ্যে থেকেও তারা ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প কৃষির জন্য প্রয়োজনীয় সব ব্যাংকিং চাহিদা পূরণ করতো।
১৯৫০ ও ১৯৬০ এর দশকে ইসলামী ব্যাংকিং ছিল শুধুমাত্র একটি একাডেমিক স্বপ্ন। এমনকি শিক্ষিত মুসলমানদের মধ্যেও গুটিকয়েক লোক এ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ছিলেন। অথচ এখন তা ব্যবহারিকভাবেই বাস্তব। ইংল্যান্ডের ফেডারেল রিজার্ভ বোর্ড ও ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের মতো পাশ্চাত্যের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সমূহ আইএমএফ ও বিশ্ব ব্যাংকের মতো আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহ এবং যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড ওরাইস ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাজ্যের লন্ডন স্কুল অব ইকোনোমিক্স ও ডারবান ইউনিভার্সিটির মতো মর্যাদা সম্পন্ন শিক্ষা কেন্দ্রসমূহের দৃষ্টি আকর্ষণে সক্ষম হয়েছে ইসলামী ব্যাংক। পাশ্চাত্যর প্রচার মাধ্যমেও এ ব্যাপারে বেশ আনুকূল্য পাওয়া যাচ্ছে। ইসলামী ব্যাংক ব্যবস্থা সম্ভাবনা ভবিষ্যতে উজ্জ্বল কারণ বর্তমানে আন্তর্জাতিক অর্থব্যবস্থায় যে অস্থিতিশীলতা বিরাজমান তাতে উপলব্ধিই আসবে যে, এই পদ্ধতিতে কৃত্রিম পরিবর্তন এনে এ অস্থিতিশীলতা দূর করা সম্ভব নয়। বরং ইসলামী অর্থ ব্যবস্থার মতো বৃহত্তর বাজার শৃঙ্খলা পদ্ধতি এতে প্রবেশ করে দিতে পারলেই তা সম্ভব হবে। এই পদ্ধতি প্রবর্তনের সম্ভাবনা উজ্জ্বল।
১৯৬১ সালে মিশরে কলেজ অফ ইসলামিক রিসার্চ কায়েম হয়। সেখানে ইসলামী অর্থনীতি ও ব্যাংকিং বিষয়টি গুরুত্ব পায়। ১৯৬৪ সালের মার্চে মিশরের ‘কলেজ অফ ইসলামিক রিসার্চ’ এর উদ্যোগে তিন দিনব্যাপী একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ৪০টির বেশি মুসলিম দেশের প্রতিনিধিরা সম্মেলনে অংশ নেন। তারা মুসলিম জাহানকে সুদমুক্ত ইসলামী শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক কায়েমের নানা দিক নিয়ে ব্যাপক আলোচনা করেন। তারা ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠার কিছু মৌলিক নীতি নির্দেশনা তৈরি করেন।
১৯৭৫ সালের ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক কাজ শুরু করার পর এক দশকের মধ্যে এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপে ৪০টিরও বেশি ইসলামী ব্যাংক কায়েম হয়। এরমধ্যে দুবাই ইসলামী ব্যাংক, কুয়েত ফাইন্যান্স হাউস, বাহরাইন ইসলামী ব্যাংক জর্দান ইসলামী ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড, ব্যাংক ইসলাম মালয়েশিয়া বারহাদ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এই সময় ইরান, পাকিস্তান ও সুদানের ব্যাংকিং খাত ইসলামী পদ্ধতিতে পুনর্গঠনের সিদ্ধান্ত হয়। সৌদি আরবের ফয়সাল গ্রুপ ও দাল্লা বারাকা গ্রুপ বিভিন্ন দেশে ইসলামি ব্যাংক প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা রাখে। এই সময় ইসলামী ব্যাংক গুলির মাঝে সমন্বয়, পদ্ধতিগত উন্নয়ন, ইসলামী ব্যাংকিং বিষয়ক শিক্ষা ও জনসচেতনা সৃষ্টির লক্ষ্যে দার-আল মা’ল গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা সৌদি শাহজাদা মোহামদ আল ফয়সল ও মিৎগামার ইসলামী ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা মিশরের ডক্টর আহমদ আল নাজ্জারের নেতৃত্বে ‘ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অফ ইসলামিক ব্যাংকস’গঠিত হয়। এ সকল উদ্যোগের মধ্য দিয়ে ৭০ এর দশক ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠা জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
১৯৩৭ সালে শেরে বাংলা ফজলুল হক বাংলার প্রধানমন্ত্রী হন। মুসলমানগণ স্বশাসনের স্বপ্ন দেখার সুযোগ পান। মুসলিম লীগ ও কৃষক প্রজা পার্টি আইনসভায় কৃষক-প্রজাদের স্বার্থে বিভিন্ন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেয়। জমিদার-মহাজনদের প্রতিভু জাতীয় কংগ্রেস কৃষক- প্রজা গরিষ্ঠ মানুষের পক্ষের সেই উদ্যোগে বাধা দেয়। এই দান্দিক পথ বেয়ে ১৯৪০ সালে শেরে বাংলা পাকিস্তান প্রস্তাব স্থাপন করেন। বাংলার মুসলমানগণ আত্মপরিচয়, ও নিজস্ব জাতিসত্তার ভিত্তিতে রাষ্ট্র সত্তা অর্জনের এই আন্দোলনে সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেন। তাদের আত্মত্যাগের পিছনে নিজেদের অর্থনৈতিক চিন্তা ও দর্শন রূপায়ণের প্রেরণাও কাজ করেছে। বাংলাদেশের বর্তমান ইসলামী ব্যাংকিং আন্দোলন পূর্ব পুরুষদের সেই সংগ্রামেরই ধারাবাহিকতা।
সময়ের বিবর্তনে ইসলামী ব্যাংকিং বিষয়টি নজরের আড়ালে থাকেনি। ১৯৪৮ সালের পয়লা জুলাই ‘স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তানে’র উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে নব নিযুক্ত গভর্নর জাহিদ হোসেন দেশের সুদমুক্ত ইসলামী ব্যাংক কায়েমের প্রস্তাব করেন। প্রধান অতিথি কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ উদ্বোধনী ভাষণে গভর্নরের প্রস্তাব সমর্থন করেন। পাকিস্তানে সুদমুক্ত ব্যাংকিং চাদর এই সম্মতি দেওয়ার মাত্র দুই মাস এগারো দিন পর কায়েদে আজম ১১ই সেপ্টেম্বর ইন্তিকাল করেন। ১৯৪৯ সালের ১২ ই মার্চ পাকিস্তান গণপরিষদে ‘আদর্শিক মূলনীতি প্রস্তাব’ গৃহীত হয়। এর ফলে ইসলামী অর্থব্যবস্থার আইনি ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হয়।
১৯৫১ সালের ২১-২৪ জানুয়ারি সর্বদলমতের আলেম সমাজের ‘২২ দফা শাসনতান্ত্রিক মূলনীতি প্রস্তাব’ এ ইসলামী রীতি প্রথা ও আচার-আচরণ পুনরুজীবন’কে ‘রাষ্ট্রীয় কর্তব্য’ সাব্যস্ত হয়। এসবের মধ্যদিয়ে পাকিস্তানে ইসলামী অর্থব্যবস্থা ও ইসলামী ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠায় রাষ্ট্রীয় প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত হয়।
বাংলাদেশে ইসলামী অর্থনীতি চর্চার ঐতিহ্য সমৃদ্ধ। সুদমুক্ত ইসলামী ব্যাংকিং লেনদেনের আকুতিও এখানে অনেক পুরনো। সেই জন প্রত্যাশা পূরণের জন্য বহু মনীষী দীর্ঘ সময় ধরে নানাভাবে কাজ করেছেন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর পূর্ব বাংলায় ইসলামী অর্থনীতি প্রতিষ্ঠার দাবি জোরদার হয়। এই বিষয়ে লেখালেখি ও আলোচনা বাড়ে। সে সময়ের নেতৃস্থানীয় আলেমদের মধ্যে মাওলানা শামসুল হক ফরিদপুরী, মাওলানা আতহার আলি, খতিবে আযম মাওলানা সিদ্দিক আহমদ, মুফতি দীন মুহাম্মদ খান, মাওলানা নূর মোহাম্মদ আজমী, মাওলানা সৈয়দ মুসলেহ উদ্দিন, শায়খুল হাদিস মাওলানা আজিজুল হক, মাওলানা মুহাম্মদ আব্দুর রহীম, মাওলানা মুহীউদ্দিন খান, মাওলানা সৈয়দ মুহাম্মদ মাসুম, মাওলানা সৈয়দ মুহাম্মদ আলী, মাওলানা আব্দুল মান্নান তালিব, মাওলানা জুলফিকার আহমদ কিসমতি প্রমুখ ইসলামী অর্থনীতির শ্রেষ্ঠত্ব তুলে ধরে মাহফিল ও সভাস সমাবেশে জনমত সংঘটিত করেন। তাদের কেউ কেউ প্রচুর লেখালেখি করেন। এ সময়ের শিক্ষক বুদ্ধিজীবী ও চিন্তাবিদদের মধ্যে কবি বেনজির আহমদ, কবি গোলাম মোস্তফা, প্রিন্সিপাল আবুল কাশেম, দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ , প্রফেসর ড. এম এন হুদা, ডক্টর কে টি হোসেন, ডক্টর হাসান জামান প্রমুখ ইসলামী অর্থনীতি নিয়ে বিস্তর লেখালেখি করেন। ফলে ইসলামিক অর্থনীতি নিয়ে আলোচনার একটি শক্তিশালী ধারা তৈরি হয়। এই সময় ইসলামী অর্থনীতি নিয়ে সবচেয়ে বেশি লেখালেখি ও বুদ্ধিবৃত্তিক অন্যান্য অবদান রাখেন মাওলানা মুহাম্মদ আব্দুর রহীম। তিনি পঞ্চাশের দশকে দৈনিক আজাদ ও মাসিক মোহাম্মদীতে ইসলামী অর্থনীতি বিষয়ে বেশ কিছু মূল্যবান প্রবন্ধ- নিবন্ধ লিখেন। সে সব প্রবন্ধ ১৯৫৬ সালে ‘ইসলামে অর্থনীতি’নামে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। প্রবন্ধের সংকলন হলেও এই গ্রন্থটি বাংলা ভাষায় ইসলামী অর্থনীতি বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত হয়। ষাটের দশক থেকে মাওলানা আব্দুর রহীম ‘সাপ্তাহিক জাহাজে নও’নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করেন। এই পত্রিকায় তিনি নিয়মিত ইসলামী অর্থনীতি নিয়ে চিন্তামূলক লেখা লেখি করেন। ইসলামী অর্থনীতির ওপর তিনি বিভিন্ন সেমিনার ও মাহফিলে নিয়মিত আলোচনা করেন। তার লেখা ও আলোচনা দেশের বহু পন্ডিত ও চিন্তাশীলকে অনুপ্রাণিত করে।
পাকিস্তান আমলের শেষ দিকে পূর্ব পাকিস্তানে ইসলামী অর্থনীতি ও সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি বিষয়ে বিতর্ক চলে। সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের রোমান্টিক চিন্তায় প্রভাবিত কিছু তরুণের বুকে জামায় সাঁটানো চীনের কমিউনিস্ট পার্টির নেতা মাও সেতুং -এর প্রতিকৃতি আর তাদের হাতে মাও সেতুং- এর ছোট একটি লাল বই থাকা তখনকার কিছু তরুণের ফ্যাশনে পরিণত হয়। সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি নিয়ে কিছু তরুণের এই মাতামাতি দেখে আলেম ও ইসলামী চিন্তাবিদগণ ইসলামী অর্থনীতির শ্রেষ্ঠত্ব তুলে ধরার আরো বেশি তাগিদ অনুভব করেন। এ সময় নানা মতের বহু আলেম এবং বিভিন্ন ইসলামিক রাজনৈতিক দল মতের কর্মীগণ সমাজতন্ত্রের মোকাবেলায় জনগণের কাছে ইসলামী অর্থনীতির শ্রেষ্ঠত্ব তুলে ধরতে দেশের প্রত্যন্ত এলাকায় সভা-সমাবেশ- মাহফিল আয়োজন করেন। এ সময় বহু প্রবন্ধ- নিবন্ধ, পুস্তিকা ও গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। ইসলামী অর্থনীতির শ্রেষ্ঠত্ব তুলে ধরার তখনকার চেষ্টা বিরাট আন্দোলনে পরিণত হয়।
১৯৭৬ সালে মাওলানা মুহাম্মদ আব্দুর রহীমের নেতৃত্বে গবেষণা ও প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ‘বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টার’কায়েম হয় ।এটি শীঘ্রই তরুণ চিন্তাবিদের আকর্ষণীয় কেন্দ্র হয়ে ওঠে। এই সেন্টারের চেয়ারম্যান মাওলানা আব্দুর রহীমের নেতৃত্বে সে বছরই সাহিত্য- সংস্কৃতি -অর্থনীতি বিষয়ে তিনটি আলাদা প্রতিষ্ঠান গঠিত হয়। তার একটি হলো ‘ইসলামিক ইকোনমিকস রিসার্চ ব্যুরো । ‘ইসলামিক ইকোনমিকস রিসার্চ ব্যুরো’ বাংলাদেশ ইসলামী অর্থনীতি চর্চার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ। এই ব্যুরোর কার্যক্রমের ভেতর দিয়েই বাংলাদেশে ইসলামী ব্যাংকিং আন্দোলনের প্রথম নিউক্লিয়াস গড়ে ওঠে বলে আমি মনে করি।