ড. ইকবাল কবীর মোহন
ইসলাম সর্বাধুনিক ও সার্বজনীন একটি জীবনব্যবস্থা। সমগ্র মানবতার মুক্তির জন্য ইসলামের অভ্যুদয়। মহানবী (সা)-এর মাধ্যমে ইসলাম পরিপূর্ণতা লাভ করেছে। আল কুরআনে আল্লাহতাআলা ঘোষণা করেছেন, ‘আজকের এই দিনে আমি তোমাদের আনুগত্যের বিধান পরিপূর্ণ করে দিলাম, তোমাদের প্রতি আমার নিয়ামত স¤পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জীবন বিধান হিসেবে মনোনীত করলাম।’ (সূরা মায়েদা : ৩)
মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা) সর্বশেষ নবী। মানবতা যখন নীতিহীনতা, অধর্ম ও কুসংস্কারের শেষপ্রান্তে গিয়ে উপনীত হয়েছিল, ঠিক সে সময় মহানবী (সা)-এর আগমন ঘটে। তিনি মানবতাকে নিশ্চিত ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করেন। মানবতাকে মুক্তির সোপানে পৌঁছে দেয়ার জন্য ইসলামের আলো নিয়ে অগ্রসর হন। কোনো নিদিষ্ট গোষ্ঠী, বর্ণ বা সম্প্রদায়ের কল্যাণের জন্য তিনি আগমণ করেন নি। তিনি সত্য দীনের প্রতি সমাজের সকল স্তরের মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করেন। তাঁর প্রণীত সমাজনীতি, রাজনীতি, অর্থ ও রাষ্ট্রনীতি, যুদ্ধ ও শান্তির ফর্মূলা ছিল সবার জন্য-সার্বজনীন। তাঁর কার্যক্রম ছিল মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি তৈরির জন্য নিবেদিত। তিনি ধর্ম, বর্ণ ও গোষ্ঠী নির্বিশেষে সবার মধ্যে শান্তির সেতুবন্ধন রচনা করেন। মহানবী (সা) যখন মদিনায় ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থ্া কায়েম করেন, তখন তিনি মদিনার গণ্ডির বাইরের দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক স্থাপনের জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। মহানবী (সা) ইসলামী আদর্শকে দেশে দেশে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য বিভিন্ন রাষ্ট্রে দূত প্রেরণ করেন। বর্তমান দুনিয়ায় আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভিত্তি হচ্ছে পারস্পরিক সম্পর্ক উন্নয়ন, সম-মর্যাদার ভিত্তিতে দেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা বিধান, শান্তিপূর্ণ চুক্তি স্থাপন, মানবাধিকারের নীতি প্রতিষ্ঠা, দেশে দেশে বাণিজ্য সম্প্রসারণ, বিভিন্ন দেশের দূত প্রেরণ ও অন্য দেশের দূতদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল আচরণ, সামরিক কৌশল ও আত্মরক্ষার নীতি গ্রহণ, আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান ইত্যাদি।
আন্তর্জাতিক স¤পর্ক স্থাপনের সূচনা
ইসলামের প্রাথমিক যুগে ইসলামের ক্রম-বর্ধমান বিকাশের সময়কালে মক্কার প্রভাবশালী সমাজপতি ও নেতারা চিন্তায় পড়ে গেল। তাই তারা সমাজে তাদের কর্তৃত্ব হারানোর ভয়ে নব্য মুসলিমদের ওপর নিপীড়ন শুরু করে। এমনকি ঈমানদারদের সমাজ থেকে বয়কট করা হয়। বিরোধিতা চরমে পৌঁছলে মহানবী (সা) তাঁর অনুচরদের মক্কা ছেড়ে আবিসিনিয়ায় আশ্রয় গ্রহণ করার নির্দেশ দেন। এক সময় মুসলমানরা সেখানে মুহাজির হিসেবে তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন। এভাবে মহানবী (সা) অন্য দেশের সঙ্গে মুসলমানদের আন্তর্জাতিক ও বৈদেশিক স¤পর্ক স্থাপনের সূচনা করেন। মক্কায় মুসলমানদের নিরাপত্তার অভাবজনিত ঘটনার প্রেক্ষাপটে আবিসিনিয়ায় মুসলমানদের নিরাপদে বসবাস করার যে চিন্তা মহানবী (সা) করেন তাতে তাঁর আন্তর্জাতিক চিন্তাধারার পরিচয় পাওয়া যায়।
বিভিন্ন দেশে দূত ও প্রতিনিধি দল প্রেরণ ও গ্রহণ
বর্তমান আধৃুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় দেশে দেশে সম্পর্ক স্থাপনের অন্যতম একটি বিধান হলো এক দেশের সাথে অন্য দেশের দূত ও প্রতিনিধি বিনিময়। রাষ্ট্র কাঠামোর ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ক্ষেত্রে দূত নিয়োগ ও দূত গ্রহণের রীতি সর্বপ্রথম চালু করেন আল্লাহর নবী মুহাম্মদ (সা)। মদিনা রাষ্ট্রের নেতৃত্ব গ্রহণ করার পর মহানবী (সা) বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের কাছে দীনের দাওয়াত, ন্যায় ও শান্তির বার্তা দিয়ে তাঁর দূতদের প্রেরণ করেন। তিনি রোম (বর্তমান তুরস্ক ও ফিলিস্তিন) সম্্রাট হিরাক্লিয়াসের কাছে দিমহা ইবনে খলিফা আল কালবি (রা)-কে দূত হিসেবে প্রেরণ করেন। পারস্য (বর্তমান ইরান) সম্রাট খসরু পারভেজের কাছে আবদুল্লাহ ইবনে হুজাফা আস-সাহমি (রা), মিসরের শাসক মুকাওকিসের কাছে হাতিব ইবনে আরিল বালতাআ (রা), হাবশার শাসক নাজ্জাশি আসহামার কাছে আমর ইবনে উমাইয়া আদ-দামরি (রা), বাহরাইনের শাসক মুনজির ইবনে সাওয়ার কাছে আলা ইবনে আল-হাদরামি (রা), ওমানের শাসক জায়ফর ও আবদে আল জালাদির কাছে আমর ইবনে আল-আস (রা), ইয়ামামার শাসক হাউজা ইবনে আলির কাছে সালেত ইবনে আমর (রা)-কে প্রেরণ করেন। একইভাবে বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদল ও দূতদের মহানবী (সা) অত্যন্ত সম্মান ও শ্রদ্ধার সাথে গ্রহণ করেন। হাবশার ন্যায়পরায়ণ রাজা নাজ্জাশি আসহামা ইসলাম গ্রহণ করার পর নবীজীর কাছে বিশেষ দূত ও প্রতিনিধি দল প্রেরণ করেন। নাজরানের রাজা নবম হিজরীতে প্রধান বিশপ আবু হারিসার নেতৃত্বে ৬০ সদস্যের একটি বিরাট খ্রিষ্টান প্রতিনিধি দল মদিনায় প্রেরণ করেন। নবীজি তাদেরকে মসজিদে নববীতে থাকার ব্যবস্থা করেন এবং তাদেরকে নিজস্ব রীতি অনুযায়ী প্রার্থনা করার অনুমতি দান করেন। ইয়েমেনের হিময়ার ও আশআরি গ্রোত্রের রাজারা নবীজির কাছে দূত পাঠিয়ে তাদের ইসলাম গ্রহণের বার্তা প্রেরণ করেন। বাহরাইনের শাসক মুনজির ইবনে সাওয়া তার দূত এবং মিসরের শাসক মুকাওকিস নবীজির কাছে বন্ধুত্বপূর্ণ চিঠিসহ বিশেষ দূত ও উপঢৌকন মদিনায় প্রেরণ করেন। তায়েফ, ইয়ামামা, নজদ ও উত্তর আরবের বিভিন্ন অঞ্চলের রাজা, বাদশাহ ও শাসকরা দূত পাঠিয়ে নবীজিকে সম্মান দেখান। এভাবে দূত ও প্রতিনিধি দল প্রেরণ করে মহানবী (সা) যেমন দেশে দেশে সম্পর্ক স্থাপনের আন্তর্জাতিক রীতির প্রচলন করেন, তেমনি একইভাবে তিনি বিভিন্ন দেশের দূত ও প্রতিনিধি দলকে সম্মান ও মর্যাদার সাথে গ্রহণ করে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।
শান্তি, সহাবস্থান ও নিরাপত্তার চুক্তি
মহানবী (সা) ইসলামবিরোধী শক্তির চাপে এক সময় মদিনায় হিজরত করেন। কালক্রমে সেখানে কায়েম করেন একটি আধুনিক ইসলামী রাষ্ট্র। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ইতিহাসে আজও এ ধরনের শান্তিপূর্ণ ও কল্যাণকর রাষ্ট্র দ্বিতীয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। মদিনা রাষ্ট্রকে পরিপূর্ণতা দান এবং এটাকে শান্তির আবাস হিসেবে গড়ে তোলার জন্য তিনি ইহুদি ও পৌত্তলিকদের সাথে একটি সন্ধি চুক্তি স্বাক্ষর করেন। তখনকার দিনে এটি ছিল একটি আন্তর্জাতিক মানের চুক্তি। ইতিহাসে এই চুক্তি ‘মদিনা সনদ’ নামে পরিচিত। এ চুক্তির মাধ্যমে মহানবী (সা) জাতি, ধর্ম ও গোষ্ঠী নির্বিশেষে মদিনায় একটি শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করেন। শুধু তাই নয়, মদিনা সনদের মাধ্যমে মহানবী (সা) প্রতিটি গোত্রের মানুষের জানমাল ও ধর্মের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন। এ চুক্তির মাধ্যমে মুসলমানদের সঙ্গে অন্য ধর্মাবলম্বী মানুষের জোটবদ্ধভাবে জীবনযাপন সম্ভব হয়েছিল। মহানবী (সা) এই চুক্তির মাধ্যমে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো জন্ম দিয়েছিলেন এমন একটি ‘লীগ অব নেশনস’ বা জাতিপুঞ্জ যা আধুনিককালের জাতিসংঘের ধারণার সাথে স¤পূর্ণ মিলে যায়। এই চুক্তির মাধ্যমে সমাজ থেকে হানাহানি, বিরোধ ও খুনের সংস্কৃতি দূরীভূত হয়। স্থাপিত হয় মৈত্রী ও পার¯পরিক সম্প্রীতির বন্ধন।
আমরা দেখতে পাই, আজকাল বিশ্বে কোনো দেশ বা জাতির সঙ্গে অন্য কোনো দেশ বা জাতির বিরোধ দেখা দিলে তা আন্তর্জাতিক আইনে সালিশ-মীমাংসা করে মিটিয়ে ফেলার চেষ্টা করা হয়। অথচ এই আন্তর্জাতিক বিরোধ মীমাংসার প্রবক্তা ছিলেন নবী মুহাম্মদ (সা)। কুরআনে বলা হয়েছে, ‘মুমিন মুসলমানরা তো পর¯পর ভাই ভাই। সুতরাং তোমরা দুই ভাইয়ের মধ্যে আপোসরফা করিয়ে দাও।’ (সূরা হুজরাত : ১০)। কুরআনের এই নীতির বাস্তবায়ন করেন মহানবী (সা)।
আল্লাহর রাসূল (সা) বুঝতে পেরেছিলেন, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করে নিজের মিশন বাস্তবায়ন করার জন্য গোত্রীয় ও আন্তর্জাতিক শান্তিচুক্তি অপরিহার্য। এজন্য বিভিন্ন সময় তিনি শান্তিচুক্তি স্থাপন করেছিলেন। এর মধ্যে অন্যতম একটি চুক্তি ছিল হুদায়বিয়ার সন্ধি। ৬২৮ সাল বা ৬ হিজরী সালে মক্কার কুরাইশ এবং মুসলমানদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ এই শান্তিচুক্তি সম্পাদিত হয়েছিল। এই চুক্তির কারণে উভয়পক্ষের মধ্যে যুদ্ধ-বিগ্রহ ও অশান্তি বন্ধ হয়। এর ফলে মক্কা-মদিনা ও এর বাইরে বিভিন্ন অঞ্চল ও এলাকায় ইসলামের দাওয়াত দ্রুত সম্প্রসারিত হয় এবং অবশেষে ৮ হিজরী তথা ৬৩০ সালে ঐতিহাসিক মক্কা বিজয় করা নবীজির পক্ষে সহজ হয়।
শান্তি ও নিরাপত্তা স্থাপনে মহানবী (সা)-এর এই সার্বজনীন বিধানের কারণে কোনো জাতীয় সীমানা, গোত্রীয় আনুগত্য, সাম্প্রদায়িক স্বার্থ মুসলমানদের পৃথক করতে পারেনি। মুসলমানরা সবাই ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ। সবাই এক আল্লাহকে প্রভু হিসেবে মান্য করে। এক কুরআনকে অনুসরণ করে। একইভাবে রোজা রাখে ও নামাজ পড়ে। তারা একই স্থানে একইভাবে হজ স¤পাদন করে এবং ঈদ অনুষ্ঠান পালন করে। এসব আনুষ্ঠানিকতা থেকে বোঝা যায়, ইসলামের আইন ও বিধান আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন। এর যাবতীয় বিধান ও নির্দেশাবলি সার্বজনীন। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষের ক্ষেত্রেও রাসূল (সা) প্রদর্শিত জীবনবিধান সমভাবে প্রযোজ্য।
মানবাধিকারের বিশ্বজনীন নীতি
আধুনিককালে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হচ্ছে মানবাধিকার প্রসঙ্গ। মানবাধিকারের নীতিমালা সার্বজনীন ও তা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। ১৯৪৮ সালের ১০ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণাপত্র গ্রহণ এবং জারি করে। বিশ্বের প্রতিটি রাষ্ট্র ও সরকার জাতিসংঘ প্রণীত মানবাধিকারের নীতিমালা মেনে চলতে বাধ্য। অথচ মানবাধিকারের সত্যিকারের নীতিমালা প্রণয়ণ করেছিলেন মুহাম্মদ (সা)। তিনি মানুষের অধিকারগুলোর অন্তর্নিহিত বাস্তবতা ও প্রয়োজন অনুধাবন করে তার সফল বাস্তবায়ন করে গেছেন। মানুষের এসব মৌলিক অধিকার যাতে বিঘ্নিত না হয় সে জন্য নৈতিক বিধান ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করেছেন। তবে রাসূল (সা)-এর সময় মানবাধিকারের বিধিগুলো যতটা সঠিক মনে হয়েছিল আজ অনেক দেশ ও জাতি তার তোয়াক্কাই করছে না। বর্তমান সার্বজনীন বা আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের ঘোষণাপত্রের প্রথম অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘সব মানুষ স্বাধীনভাবে এবং সমমর্যাদা ও সমান অধিকার নিয়ে জন্মেছে।’ অথচ ইসলামই প্রথম মানুষের এই সমমর্যাদাকে নিশ্চিত করেছিল।
মানুষের সমমর্যাদা ও সব মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব স¤পর্কে আল্লাহতাআলা কুরআনে বলেন, ‘আমি তো আদম সন্তানকে মর্যাদা দান করেছি জল ও স্থলে তাদের চলাচলের বাহন দিয়ে, তাদের উত্তম রিজিক দান করেছি এবং আমার অসংখ্য সৃষ্টির ওপর তাদের উল্লেখযোগ্য শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছি।’ (সূরা বনি ইসরাইল : ৭০)। এ দুনিয়ার সবকিছুই আল্লাহ মানুষের জন্য সৃষ্টি করেছেন। সমান অধিকারের এই বিষয়টি বোঝাতে গিয়ে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘তোমরা কি দেখো না, আল্লাহ আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে সবই তোমাদের কল্যাণে নিয়োজিত করেছেন।’ (সূরা লোকমান : ২০)
প্রকৃতপক্ষে দুনিয়ার আলো, বাতাস, পানি ও অন্যান্য সীমাহীন সৃষ্টি থেকে শুধু মুসলমানরাই নয়, সব জাতি ও বর্ণের মানুষ উপকৃত হচ্ছে। মানবাধিকারের ঘোষণাপত্রে গোত্র, বর্ণ, ভাষা, ধর্ম ও এলাকাভেদে কোনো পার্থক্য না করার কথা বলা হয়েছে। মহানবী (সা) তাঁর বিদায় হজে¦র ভাষণে এ বৈষম্যের দেয়াল ভেঙে দিয়েছিলেন। তিনি ঘোষণা করেন, ‘হে লোকসকল! নারীর ওপর তোমাদের যেমন অধিকার রয়েছে তেমনি তোমাদের ওপরও নারীদের অধিকার রয়েছে। তোমাদের দাস-দাসীদের প্রতি সদয় হও। তাদের নির্যাতন করার কোনো অধিকার তোমাদের নেই। নিজেরা খাও, যে বস্ত্র পরিধান করো, তাদেরও অনুরূপ খাদ্য ও বস্ত্র দেবে।’ আল্লাহর রাসূল (সা) উপস্থিত মুমিনদের উদ্দেশে এই ঘোষণা দিলেও এটি ছিল সকল মানুষের জন্য একটি অতি মানবিক ও নৈতিক আবেদন।
এভাবে মহানবী (সা) মানুষে মানুষে সব বৈষম্য দূর করেছিলেন। মানবাধিকারের ঘোষণা অনুযায়ী প্রত্যেক মানুষের জীবন, স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার অধিকার আছে। ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও ব্যক্তির জীবন ও নিরাপত্তার বিষয়ে ইসলামের বিধান অত্যন্ত ¯পষ্ট। কুরআনে পাকে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নরহত্যা বা পৃথিবীতে ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপের অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তি ব্যতিরেকে কেউ কাউকে হত্যা করলে সে যেন সমগ্র মানবতাকে হত্যা করল, আর কেউ কারো প্রাণ রক্ষা করলে সে যেন পৃথিবীর সমগ্র মানবগোষ্ঠীকে প্রাণে রক্ষা করল।’ (সূরা মায়েদা : ৩২)
সাম্য ও সমতার আন্তর্জাতিক নীতি
সাম্য ও সমতার আন্তর্জাতিক নীতি হলো, আইনের চোখে সবাই সমান। কোনোরূপ বৈষম্য ব্যতিরেকে সবার আইনের দ্বারা সমভাবে রক্ষিত হওয়ার অধিকার আছে। ইসলাম ন্যায়বিচারের নীতিকে সমুন্নত রেখেছে। আল্লাহ পাক কুরআনে বলেছেন, ‘স্পষ্ট প্রমাণাদিসহ আমি রাসূলদেরকে দুনিয়ায় পাঠিয়েছি। সাথে দিয়েছি কিতাব ও ন্যায়বিচারের মানদণ্ড, যাতে তারা মানুষের মাঝে সুবিচার প্রতিষ্ঠা করে।’ (সূরা হাদিদ : ২৫)। আল্লাহ তাআলা অন্যত্র বলেন, ‘আল্লাহ (বান্দাদেরকে) ন্যায়বিচার ও ইহসান করার নির্দেশ দিয়েছেন।’ (সূরা নাহল : ৯০)। মানবতার জন্য আল্লাহর রাসূল (সা) সম অধিকারের নীতি স¤পর্কে বিদায় হজে¦র ভাষণে বলেন, ‘একজন আরব একজন অনারব ব্যক্তির চেয়ে শ্রেষ্ঠ নয়। তেমনি একজন আরব একজন আরব ব্যক্তির চেয়েও শ্রেষ্ঠ নয়। তোমরা সকলেই এক আদমের সন্তান ও আদম মৃত্তিকার তৈরি।’
শ্রমজীবী মানুষের প্রতি ইনসাফের নীতি
বিশ্ব আধুনিক মানবাধিকার আইনে শ্রমিকের সব ন্যায়সঙ্গত অধিকার নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি রয়েছে। ১৯১৯ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা’ এর আইনে বিশ্বব্যাপী শ্রমিকের অধিকার, নিরাপত্তা, কর্মপরিবেশ এবং মালিক-শ্রমিক সম্পর্ক সুদৃঢ় করার নীতি ঘোষণা করা হয়েছে। অথচ আজ থেকে ১৪৫০ বছর আগে মহানবী (সা) প্রথম শ্রমিকের সকল মানবিক ও নিরাপত্তার অধিকার নিশ্চিত করেছিলেন। তিনি শ্রমজীবি মানুষের অধিকার নিশ্চিত করার জন্য তাদেরকে মনিবের ভাই হিসেবে মর্যাদা দিয়ে বলেন, ‘তোমাদের দাস-দাসী (অধীনস্থ কর্মচারী) তোমাদেরই ভাই।’ (সহিহ বুখারি : ৩০)। শ্রমিক, অধীনস্থ কর্মচারী ও দাসদের সমার্থ্যরে বাইরে কাজ দিয়ে তাদের কষ্ট না দিতে রাসূল (সা) বলেন, ‘তাদের (শ্রমিক বা অধীনস্থ) এমন কাজের কষ্ট দেবে না, যা তাদের সাধ্যের বাইরে।’ (সহিহ বুখারি : ৩০)। শ্রমিকের অধিকার সম্পর্কে মহানবী (সা) আরো বলেন, ‘তাদের জন্য যা অতি কষ্টকর সে কাজের বোঝা তাদের উপর চাপিয়ে দিও না।’ (সহিহ বুখারি : ৩০)। শ্রমিকের অধিকার নিশ্চিত করার নিমিত্তে রাসূল (সা) অন্যত্র বলেন, ‘শরীরের ঘাম শুকানোর আগেই তার (শ্রমিকের) মজুরী পরিশোধ করে দাও।’ (ইবনে মাজাহ : ২৪৪৩)
ন্যায়, সততা ও সমতার লড়াই
আধুনিক বিশ্বে দেখা যায়, অত্যাচারী ব্যক্তি বা শক্তির হাত থেকে মুক্তি লাভ করে ন্যায়বিচার কায়েম, সাম্য প্রতিষ্ঠা ও স্বৈরাচারী শাসককে দমনের জন্য যুদ্ধ করার প্রয়োজন হয়। আন্তর্জাতিকভাবে ও জাতিসংঘের বিধানমতে এ ন্যায়যুদ্ধকে অনুমোদনও দেয়া হয়। ন্যায়বিচার ও সাম্য কায়েম হোক বা না হোক অন্তত বিশ্ববাসীকে আশ্বস্ত করার জন্য হলেও যুদ্ধ করার বেলায় এ শান্তির বাণীই প্রচার করা হয়। অথচ আল্লাহর নবী (সা) শুধু ন্যায় ও অধিকার প্রতিষ্ঠার কারণ ছাড়া যুদ্ধকে কোনোক্রমেই অনুমোদন করেননি। আর ততক্ষণ পর্যন্ত লড়াই করার কথা বলা হয়েছে যতক্ষণ পর্যন্ত ন্যায় ও সত্য প্রতিষ্ঠিত না হয়। এ ব্যাপারে আল্লাহর বাণী হচ্ছে, ‘তোমরা তাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করো, যতক্ষণ না ফেতনা দূরীভূত হয় এবং আল্লাহর দীন সামগ্রিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। (সূরা আনফাল : ৩৯)। আজ ১৪৫০ বছর পরও রাসূল (সা)-এর যুদ্ধ করার নীতি কতটা আধুনিক ও সার্বজনীন তা অবাক হওয়ার মতো! তবে আজকাল ন্যায়নীতি কায়েমের নাম করে অন্য দেশ দখল এবং অন্য জাতিকে পদানত করার অসৎ নীতিকে রাসূল (সা) কোনোভাবেই অনুমোদন করেননি। কুরআন এ ব্যাপারে নির্দেশ দিয়েছে, ‘তোমরা নেক কাজ এবং তাকওয়ার ব্যাপারে সহযোগিতা করো। গুনাহের কাজ ও জুলুমবাজির ব্যাপারে কোন রকম সহযোগিতা করবে না।’ (সূরা মায়েদা : ২)
যুদ্ধে ন্যায় ও ইনসাফের ঝান্ডাকে সমুন্নত রাখার জন্য পরম শত্রুকেও মুসলমানদের আগে আক্রমণ করতে নিষেধ করা হয়েছে। আবার অন্যপক্ষ যদি আপসের প্রস্তাব নিয়ে আসে তা মেনে নিতে ইসলাম নির্দেশ দিয়েছে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘এবং তারা যদি আপস রফার দিকে ঝুঁকে পড়ে, তা হলে আপনিও সেজন্য এগিয়ে যাবেন। আর আল্লাহর ওপরই ভরসা করুন।’ (সূরা আনফাল : ৬১)
এভাবে ইসলামের যুদ্ধ ও শান্তিনীতির কারণেই দেখা গেল, মক্কা বিজয়ের সময় কোনো শত্রুর মাথা কাটা যায়নি। কারো ঘর-বাড়ি, সহায়-সম্পদ লুন্ঠিত হয়নি। কারো ওপর কোনো অত্যাচার ও নিপীড়নও হয়নি। ইসলামের শত্রুরা সেদিন মহানবী (সা)-এর কাছ ক্ষমা পেয়েছিল। এর ফলে ইসলামের ছায়াতলে এসে আশ্রয় নিয়েছিল লাখ লাখ মানুষ। প্রায় গোটা দুনিয়া মুসলমানদের করতলগত হয়েছিল। ইসলামের ন্যায় ও ভারসাম্যপূর্ণ বিধানের কল্যাণেই কেবল তা সম্ভব হয়েছিল। পরবর্তীকালে ইসলামী রাষ্ট্রের পতন হলেও ইসলামের বিধান পরাজিত হয়নি। দুনিয়ার কোটি কোটি মানুষের মনের মণিকোঠায় এ বিধানের আলো প্রজ্বলিত ছিল এবং আজও আছে। শত সহস্র বাধা-বিপত্তির পর ন্যায়, সততা ও সমতার লড়াইয়ে আল্লাহর রাসূলের অনন্য কৌশল ও নীতি আজও মানুষের মনে আশার আলো প্রজ¦লিত করে রেখেছে।
পরিশেষে একথা নিঃসন্দেহে বলা যায়, মহানবী (সা) মানবতার জন্য একজন আদর্শ ধর্মপ্রচারক, নীতিবান রাষ্ট্রনায়ক, সমাজ সংস্কারক, চরিত্রবান নেতা, আদর্শ শিক্ষক ও সামরিক বিশারদই ছিলেন না, তিনি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার অন্যতম নির্মাতা ছিলেন। তাঁর এই রাষ্ট্রচিন্তা ও আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গি ছিল সততা, ন্যায্যতা, সমতা ও নৈতিকতার আলোকে অনন্য ও সার্বজনীন। তাঁর এই মহান আদর্শ ও নীতির সফলতা ও অনন্যতা সম্পর্কে আধুনিককালের অনেক মনীষী ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। বিশ্বখ্যাত মার্কিন ইতিহাসবিদ ও জ্যোতির্বিজ্ঞানী মাইকেল এইচ হার্ট তার বিখ্যাত বই ‘ঞযব ১০০ : A Ranking of the Most influential Persons in History’ এ বলেছেন, ‘ইতিহাসে মুহাম্মদই একমাত্র ব্যক্তি যিনি ধর্মীয় ও ধর্মনিরপেক্ষ উভয় স্তরেই সর্বোচ্চ সফল হয়েছিলেন। একজন রাজনৈতিক নেতা হিসেবে তিনি তেরো শতাব্দী ধরে মানব ইতিহাসের ওপর তাঁর প্রভাব বজায় রেখেছেন।’ স্কটিশ ইতিহাসবিদ ও দার্শনিক টমাস কার্লাইল তাঁর ‘On Heroes, Hero-Worship, and The Heroic in History’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘আরবদেরকে তিনি এক শতাব্দীরও কম সময়ে একটি যাযাবর ও বিশৃঙ্খল জাতি থেকে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী ও সভ্য জাতিতে রূপান্তরিত করেছিলেন। তাঁর রাষ্ট্র চিন্তার মূল ভিত্তি ছিল নৈতিকতা ও কঠোর ন্যায়বিচার।’ বিখ্যাত ইতিহাসবিদ প্রফেসর ফিলিপ কে হিট্টি History of the Arabs’’ গ্রন্থে মদিনা রাষ্ট্র গঠন ও মদিনার সনদ নিয়ে লিখেছেন, ‘মদিনা রাষ্ট্রের মাধ্যমে মুহাম্মদ (সা) রক্তের সম্পর্কের বদলে আদর্শের ভিত্তিতে একটি সম্পূর্ণ নতুন রাজনৈতিক সমাজ (উম্মাহ) গড়ে তোলেন। মদিনার সনদ ছিল বিশ্বের প্রথম লিখিত সংবিধান, যা বহুজাতিক ও বহু ধর্মীয় সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠার অনন্য হাতিয়ার।’
লেখক :
প্রাবন্ধিক, শিশুসাহিত্যিক ও সিনিয়ার ইসলামী ব্যাঙ্কার।