ঘরের মাটিতে পাকিস্তানের বিপক্ষে প্রথম টেস্ট জিতেছে বাংলাদেশ। সফরকারীদের মাত্র ১৬৩ রানে অলআউট করে ১০৪ রানের বড় জয় তুলে নিয়েছে টাইগাররা। ফলে দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে গেল বাংলাদেশ। পাকিস্তানের বিপক্ষে প্রথম টেস্ট ম্যাচ জয়ের জন্য ২৩ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে বাংলাদেশকে। এই দুই দশকেরও বেশি সময়ে টানা ১১টি ম্যাচ হেরেছে টাইগাররা। অবশেষে ২০২৪ সালে পাকিস্তানের মাটিতে গিয়ে পেয়েছে প্রথম জয়ের দেখা। দুই ম্যাচের ওই সিরিজে ২-০ ব্যবধানেই জিতেছিল বাংলাদেশ। দুই টেস্ট যথাক্রমে ১০ ও ৬ উইকেটে জিতেছিল টাইগাররা। এবার মিরপুর টেস্টেও পাকিস্তানকে হারালো শান্ত বাহিনী। মিরপুর টেস্টে নাহিদ রানার আগুনঝরা বোলিংয়ে পাকিস্তানকে পাত্তাই দেয়নি বাংলাদেশ। পেসার নাহিদ রানা করেছে ক্যারিয়ার সেরা বোলিং। সেই সাথে অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তর দুর্দান্ত ব্যাটিংয়ে। বাংলাদেশ ১০৪ রানের বড় ব্যবধানে হারিয়েছে পাকিস্তানকে। এই প্রথম পাকিস্তানকে রানের ব্যবধানে হারালো টাইগাররা। সব মিলিয়ে টেস্টে এই নিয়ে তৃতীয়বার পাকিস্তানকে হারালো বাংলাদেশ।
মিরপুর স্টেডিয়ামে গতকাল প্রথম টেস্টের চতুর্থ দিন শেষে দ্বিতীয় ইনিংসে বাংলাদেশ ৩ উইকেটে করেছিল ১৫২ রান। ফলে ৭ উইকেট হাতে নিয়ে ১৭৯ রানে এগিয়ে ছিল টাইগাররা। অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত ৫৮ ও মুশফিকুর রহিম ১৬ রানে অপরাজিত ছিলেন। পঞ্চম দিনের ১১তম বলে সাজঘরে ফেরেন মুশফিক। ২২ রান করে পাকিস্তান পেসার হাসান আলির শিকার হন তিনি। দলের রান ২শ পার হওয়ার আগে সাজঘরে ফেরেন লিটন দাসও। ব্যক্তিগত ১১ রানে শাহিন শাহ আফ্রিদির বলে আউট হন তিনি। ১৯০ রানে পঞ্চম উইকেট পতনের পর শান্ত ও মেহেদি হাসান মিরাজের ২৬ রানের জুটিতে ২শ স্পর্শ করে বাংলাদেশ। দলীয় ২১৬ রানে স্পিনার নোমান আলির বলে লেগ বিফোর আউট হন শান্ত। সেঞ্চুরির সম্ভাবনা জাগিয়ে ৮৭ রানে আউট হওয়ার আগে ১৫০ বল খেলে ৭টি চার মারেন টাইগার দলনেতা। শান্ত ফেরার পর বেশিক্ষণ টিকতে পারেননি ওয়ানডে মেজাজে খেলা মিরাজ। ৩টি চার ও ১টি ছক্কায় ২৭ বলে ২৪ রান করেন তিনি। দলীয় ২২৫ রানে সপ্তম ব্যাটার হিসেবে মিরাজ ফেরার পর বেশি দূর যায়নি বাংলাদেশ। ৯ উইকেটে ২৪০ রানে ইনিংস ঘোষণা করে টাইগাররা। এতে জয়ের জন্য ৭৫ ওভারে ২৬৮ রানের টার্গেট পায় পাকিস্তান। লোয়ার অর্ডারে তাইজুল ইসলাম ৩ ও তাসকিন আহমেদ ১১ রানে আউট হলেও ৪ রানে অপরাজিত থাকেন এবাদত হোসেন। পাকিস্তানের হাসান ও নোমান ৩টি করে উইকেট নেন। জয়ের জন্য ২৬৮ রানের টার্গেটে নেমে প্রথম ওভারের শেষ বলে উইকেট হারায় পাকিস্তান। বাংলাদেশ পেসার তাসকিন আহমেদের বলে উইকেটরক্ষক লিটন দাসকে ক্যাচ দেন ২ রান করা ওপেনার ইমাম উল হক। এরপর ৫৪ রানের জুটি গড়েন আজান আওয়াইস ও আব্দুল্লাহ ফজল। ১৩তম ওভারের প্রথম বলে আজানকে ১৫ রানে বোল্ড করে বাংলাদেশকে ব্রেক-থ্রু এনে দেন স্পিনার মিরাজ। ক্রিজে আসা নতুন ব্যাটার পাকিস্তান অধিনায়ক শান মাসুদকে ২ রানে শিকার করেন টাইগার পেসার নাহিদ রানা। এতে ৬৮ রানে ৩ উইকেটে পরিণত হয় পাকিস্তান। এ অবস্থায় চতুর্থ উইকেটে ৫৪ রানে জুটি গড়েন ফজল ও সালমান আগা। চা-বিরতির পর পাকিস্তানের দুই সেট ব্যাটারের বিদায় নিশ্চিত করে বাংলাদেশ। ১১টি চারে ৬৬ রান করা ফজলকে আউট করেন বাংলাদেশ স্পিনার তাইজুল ইসলাম। আরেক সেট ব্যাটার সালমানকে ২৬ রানে শিকার করেন তাসকিন। ১২১ রানে পঞ্চম উইকেট হারিয়ে চাপে পড়ে সফরকারীরা। ষষ্ঠ উইকেটে জুটি গড়ার চেষ্টা করেন সৌদ শাকিল ও মোহাম্মদ রিজওয়ান। জুটিতে ৩১ রান যোগ করে বাংলাদেশকে চিন্তায় ফেলে দিয়েছিলেন তারা। দলীয় ১৫২ রানে শাকিলকে(১৫) থামিয়ে জুটি ভাঙেন নাহিদ। শাকিলের আউটের পর নাহিদের পেস তোপে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে পাকিস্তান। ১৬৩ রানে অলআউট হয় তারা। ১১ রানে শেষ ৫ উইকেট হারায় পাকিস্তান। এরমধ্যে ৪ উইকেট নেন নাহিদ। এই ইনিংসে ৯.৫ ওভার বল করে ৪০ রানে ৫ উইকেট নেন নাহিদ। এটিই তার ক্যারিয়ার সেরা বোলিং ফিগার। এর আগে একবার ইনিংসে ৫ উইকেট নিয়েছিলেন তিনি। ২০২৪ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের মাটিতে। এছাড়া তাসকিন ও তাইজুল ২টি করে এবং মিরাজ ১ উইকেট নেন। প্রথম ইনিংসে ১০১ ও দ্বিতীয় ইনিংসে ৮৭ রান করে ম্যাচ সেরার স্বীকৃতি পান অধিনায়ক শান্ত। আগামী ১৬ মে থেকে সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে সিরিজের দ্বিতীয় ও শেষ টেস্ট খেলতে নামবে বাংলাদেশ-পাকিস্তান।
সংক্ষিপ্ত স্কোর :
বাংলাদেশ : ৪১৩/১০, ১১৭.১ ওভার (শান্ত ১০১, মোমিনুল ৯১, মুশফিক ৭১, আব্বাস ৫/৯২)।
পাকিস্তান : ৩৮৬/১০, ১০০.৩ ওভার (আজান ১০৩, ফজল ৬০, রিজওয়ান ৫৯, সালমান ৫৮, মিরাজ ৫/১০২)।
বাংলাদেশ : ২৪০/৯ ডি, ৭০.৩ ওভার (শান্ত ৮৭, মোমিনুল ৫৬, হাসান ৩/৫২)।
পাকিস্তান : ১৬৩/১০, ৫২.৫.৩ ওভার (ফজল ৬৬, সালমান ২৬, নাহিদ ৫/৪০)।
ফল : বাংলাদেশ ১০৪ রানে জয়ী।
ম্যাচ সেরা : নাজমুল হোসেন শান্ত (বাংলাদেশ)।
সিরিজ : দুই ম্যাচের সিরিজে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে গেল বাংলাদেশ।
প্রধানমন্ত্রীর অভিনন্দন
দেশের মাটিতে প্রথমবারের মতো পাকিস্তানের বিপক্ষে টেস্ট ম্যাচ জেতায় বাংলাদেশ ক্রিকেট দলকে অভিনন্দন জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। মঙ্গলবার (১২ মে ২০২৬) ঢাকার মিরপুর শের-ই-বাংলা স্টেডিয়ামে দুই ম্যাচ সিরিজের প্রথম টেস্টে ১০৪ রানের জয় পায় টাইগাররা। এর আগে পাকিস্তানের বিপক্ষে সবশেষ দুটি টেস্ট তাদের দেশেই জিতেছিল বাংলাদেশ; এবার জয় দেশের মাটিতে। দলটির বিপক্ষে টানা তৃতীয় টেস্ট জয় টাইগারদের। মিরপুর টেস্টে ২৬৮ রানের টার্গেট দিয়েছিল বাংলাদেশ। কিন্তু পাকিস্তান গুটিয়ে যায় ১৬৩ রানে।
মিয়া গোলাম পরওয়ারের অভিনন্দন
দেশের মাটিতে প্রথমবারের মতো টেস্ট ক্রিকেটে পাকিস্তানের বিপক্ষে বিজয় অর্জন করায় বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলকে আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানিয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার গতকাল মঙ্গলবার প্রদত্ত এক শুভেচ্ছা বার্তায় বলেন, দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে যাওয়ায় বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলকে আমি, আমার দল এবং দেশবাসীর পক্ষ থেকে আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানাচ্ছি।
তিনি আরও বলেন, পাকিস্তানের বিপক্ষে অনুষ্ঠিত রুদ্ধশ্বাস ম্যাচে বাংলাদেশের সাহসী ও মেধাবী ক্রিকেটাররা অসাধারণ দক্ষতা, আত্মবিশ্বাস ও দলগত ঐক্যের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। শেষ পর্যন্ত ১০৪ রানের এই গৌরবময় বিজয় সমগ্র জাতির জন্য অত্যন্ত আনন্দ ও গর্বের বিষয়। আমি আশা প্রকাশ করছি বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দল ২-০ ব্যবধানে বিজয়ী হয়ে টেস্ট সিরিজ জয় করবে ইনশাআল্লাহ।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের এই অনবদ্য পারফরম্যান্স দেশবাসীকে আনন্দিত ও গর্বিত করেছে। খেলাধুলার এ ধরনের সাফল্য দেশের তরুণ প্রজন্মকে ইতিবাচকভাবে অনুপ্রাণিত করবে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের মর্যাদা আরও সুদৃঢ় করবে।
আমি আশা প্রকাশ করছি বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দল ভবিষ্যতেও তাদের সাফল্যের এ ধারা অব্যাহত রেখে দেশের জন্য আরও গৌরব ও সুনাম বয়ে আনবে।