তেইশ বছর পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট খেলতে নেমে ইতিহাস গড়েছে বাংলাদেশ। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে প্রথমবারের মত টেস্ট জিতেছে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল। দুই ম্যাচ টেস্ট সিরিজের প্রথম টেস্টে একদিন হাতে রেখেই বাংলাদেশ ৯ উইকেটে হারিয়েছে অস্ট্রেলিয়াকে। টেস্ট ইতিহাসে অসিদের বিপক্ষে এটি দ্বিতীয় জয় বাংলাদেশের। ২০১৭ সালে ঘরের মাঠ মিরপুরে অস্ট্রেলিয়াকে প্রথম হারিয়েছিল টাইগাররা। এ নিয়ে ছয়টি টেস্ট খেলুড়ে দেশের মাটিতে টেস্ট জিতল বাংলাদেশ, সবমিলিয়ে বিদেশে এটি দশম জয়। এই জয়ে সিরিজে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে টাইগাররা। হাসান মাহমুদ ম্যান অব দা ম্যাচ নির্বাচিত হন।
যে ডারউইনে ২৩ বছর আগে অস্ট্রেলিয়ার কাছে ইনিংস ও ১৩২ রানে বিধ্বস্ত হয়েছিল বাংলাদেশ, সেই মাঠেই এবার দেখা গেছে একেবারে ভিন্ন চিত্র। ৯ উইকেটের দাপুটে জয়ে সেই ডারউইনেই এবার অস্ট্রেলিয়াকে নাস্তানাবুদ করেছে টাইগাররা। নিজেদের নিরাপদ ডেরায় এবার বাঘের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত ক্যাঙ্গারুরা। এর আগে যে দল অস্ট্রেলিয়ার বোলিংয়ের সামনে এক ইনিংসও টিকে থাকতে পারেনি, সেই বাংলাদেশ এবার শুরু থেকেই স্বাগতিকদের ওপর চড়াও হয়েছে। টেস্টের চার দিনে প্রতিটি সেশনেই নিজেদের আধিপত্য বজায় রেখে অস্ট্রেলিয়াকে চাপে রেখে জয় পেয়েছে বাংলাদেশ। প্রথম দিন হাসান মাহমুদের আগুনে বোলিংয়ে অস্ট্রেলিয়াকে ১৯৮ রানে গুটিয়ে দেয় টাইগাররা। ছয় উইকেট নিয়ে একাই স্বাগতিক ব্যাটিংয়ের মেরুদণ্ড ভেঙে দেন হাসান। দ্বিতীয় ও তৃতীয় দিনে তানজিদ হাসান তামিমের সেঞ্চুরির পর নাজমুল হোসেন শান্ত ও মেহেদী হাসান মিরাজের দায়িত্বশীল ব্যাটিং অস্ট্রেলিয়াকে চাপে ফেলে। আর চতুর্থ দিনে মিরাজের ঘূর্ণিতে অস্ট্রেলিয়ার শেষ প্রতিরোধও গুঁড়িয়ে যায়। এই টেস্টে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ছিল বাংলাদেশের হাতেই। ফলে একদিন হাতে রেখেই বড় জয় পেয়েছে বাংলাদেশ। ম্যাচ শেষে বাংলাদেশ অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তও বলেছেন, এটাই বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের সেরা জয়।
অস্টেলিয়ার বিপক্ষে এই টেস্ট বাংলাদেশের শুরুটাও ছিল দুর্দান্ত। টস জিতে ব্যাট করতে নামা অস্ট্রেলিয়াকে মাত্র ১৯৮ রানে গুটিয়ে দেয় বাংলাদেশের পেস বোলাররা। একাই ছয় উইকেট নিয়ে স্বাগতিক ব্যাটিংয়ে বড় ধস নামান হাসান মাহমুদ। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের বোলাররা যে শুধু প্রতিরোধ গড়তেই আসেনি, ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার সামর্থ্যও রাখে, প্রথম ইনিংসেই তার পরিষ্কার ইঙ্গিত মিলেছিল। অস্ট্রেলিয়াকে অল্প রানে বেঁধে ফেলার পর ব্যাটিংয়েও ঝলক দেখায় বাংলাদেশ। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরি করেন তানজিদ হাসান তামিম। ১৯৭ বলে ১০১ রানের ইনিংসের সঙ্গে নাজমুল হোসেন শান্তর ৮৪, মুমিনুল হকের ৪৯ এবং মেহেদী হাসান মিরাজের ৬৫ রানের অবদানে বাংলাদেশ তুলে নেয় ৪২৬ রান। ফলে প্রথম ইনিংসেই ২২৮ রানের লিড নিয়ে অস্ট্রেলিয়াকে বড় ধাক্কা দেয় সফরকারীরা। চতুর্থ দিনের শুরুতেই তাই বোঝা যাচ্ছিল, এই ম্যাচের পাল্লা কোন দিকে ভারী। এদিকে প্রথম ইনিংসে দারুণ বোলিংয়ের পর অস্ট্রেলিয়া দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করতে নামতেই আবার টপ অর্ডারে আঘাত করেন হাসান মাহমুদ। প্রথম ইনিংসের মতো এবারও জেইক ওয়েদারল্ড ও ট্রাভিস হেডকে ফিরিয়ে স্বাগতিকদের চাপে রাখেন এই পেসার। পরে সেই চাপ আরও বাড়ান স্পিনাররা। তাইজুল ইসলাম ও মিরাজের ঘূর্ণিতে একের পর এক উইকেট হারাতে থাকে অস্ট্রেলিয়া। স্টিভেন স্মিথ, অ্যালেক্স ক্যারি, বউ ওয়েবস্টার ও প্যাট কামিন্সের মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যাটারদের ফিরিয়ে অস্ট্রেলিয়ার প্রতিরোধ ভেঙে দেন মিরাজ। শেষ পর্যন্ত নাথান লায়নকে ফিরিয়ে টেস্ট ক্যারিয়ারের ১৫তম ফাইফার পূর্ণ করেন তিনি। তবে চতুর্থ দিনে ক্যামেরন গ্রিনের ১০৪ রানের লড়াই অস্ট্রেলিয়াকে কিছুটা আশা দেখিয়েছিল। মিচেল স্টার্কের সঙ্গে জুটি গড়ে বাংলাদেশের লিডও পেরিয়ে যায় তারা। কিন্তু তাসকিন আহমেদ স্টার্ককে ফিরিয়ে সেই প্রতিরোধ ভাঙেন। এরপর গ্রিনকেও হাসান মাহমুদ ফিরিয়ে দিলে অস্ট্রেলিয়ার শেষ আশাটুকুও শেষ হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত অস্ট্রে লিয়ার ইনিংস গুটিয়ে যায় ২৮৪ রানে। ফলে বাংলাদেশের সামনে জয়ের লক্ষ্য দাঁড়ায় মাত্র ৫৭ রান।
জয়ের জন্য ৫৭ রানের লক্ষ্যে খেলতে নেমে দ্বিতীয় ওভারে অস্ট্রেলিয়ার পেসার হ্যাজেলউডের শিকার হয়ে খালি হাতে সাজঘরে ফিরেন প্রথম ইনিংসের সেঞ্চুরিয়ান বাংলাদেশের ওপেনার তানজিদ হাসান। এরপর দ্বিতীয় উইকেটে ৫৩ রানের অবিচ্ছিন্ন জুটিতে ১৪.২ ওভারে বাংলাদেশকে ঐতিহাসিক টেস্ট জয়ের স্বাদ দেন ওপেনার সাদমান ইসলাম ও মোমিনুল হক। ফলে ৯ উইকেট হাতে রেখেই জয়ের বন্দরে পৌঁছে যায় সফরকারীরা। সাদমান ৪টি চারে ২৫ এবং ২ বাউন্ডারিতে মোমিনুল ৩০ রানে অপরাজিত থাকেন। অস্ট্রেলিয়ার হ্যাজেলউড ১ উইকেট নেন। এই জয়ে টেস্ট চ্যাম্পিয়নশীপের পয়েন্ট তালিকায় বাংলাদেশ তালিকার চার নম্বরে উঠেছে। টাইগারদের শতকরা পয়েন্ট হার (পিসিটি) ৫৮.৩৩ থেকে বেড়ে ৬৬.৬৭ হয়েছে। ২০২৫-২৭ চক্রে দ্বিতীয় হারের পরও অস্ট্রেলিয়া শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে। কিন্তু দ্বিতীয় স্থানে থাকা দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে ব্যবধান কমে গেছে। অস্ট্রেলিয়ার পিসিটি ৭৭.৭৭, দক্ষিণ আফ্রিকার ৭৫.০০। নিউজিল্যান্ড ৭২.২২ পিসিটি নিয়ে তিনে। বাংলাদেশ তাদের পরে অবস্থান করছে। ভারত ৪৮.১৫ পিসিটি নিয়ে পঞ্চম স্থানে। বাংলাদেশের সামনে দ্বিতীয় টেস্ট ম্যাচ। সেই ম্যাচ জিতলে শতকরা পয়েন্ট হার বাড়ানোর সুযোগ থাকছে। প্রথম ইনিংসে অস্ট্রেলিয়া ১৯৮ ও বাংলাদেশ ৪২৬ রান করেছিল। ২২ আগস্ট থেকে ম্যাকাইয়ে সিরিজের দ্বিতীয় ও শেষ টেস্ট খেলতে নামবে বাংলাদেশ ও অস্ট্রেলিয়া।
সংক্ষিপ্ত স্কোর
অস্ট্রেলিয়া ১ম ইনিংস: ১৯৮
বাংলাদেশ ১ম ইনিংস: ৪২৬
অস্ট্রেলিয়া ২য় ইনিংস: ৯৫.১ ওভারে ২৮৪ (আগের দিন ১৬১/৪) (গ্রিন ১০৪, কেয়ারি ৩০, ওয়েবস্টার ৫, কামিন্স ৮, স্টার্ক ১৮, লায়ন ১৫, হেইজেলউড ০*; তাসকিন ১৮-৩-৬৬-১, হাসান ১৯-৩-৫৬-৩, ইবাদত ৮-০-৩৮-০, তাইজুল ১৭-১-৫১-১, মিরাজ ৩৩.১-৬-৬৬-৫)।
বাংলাদেশ ২য় ইনিংস: ১৪.২ ওভারে ৫৭/১ (সাদমান ২৫*, তানজিদ ০, মুমিনুল ৩০*; স্টার্ক ৪-০-১৫-০, হেইজেলউড ৩-১-৫-১, লায়ন ৫-০-২৩-০, ওয়েবস্টার ২.২-০-১২-০)
ফল: বাংলাদেশ ৯ উইকেটে জয়ী।
সিরিজ: দুই ম্যাচ সিরিজে বাংলাদেশ ১-০তে এগিয়ে
ম্যান অব দা ম্যাচ: হাসান মাহমুদ।
প্রধানমন্ত্রীর অভিনন্দন : অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে তাদেরই মাটিতে প্রথমবারের মতো টেস্ট ম্যাচ জয়ের ঐতিহাসিক সাফল্যে বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলকে আন্তরিক অভিনন্দন জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গতকাল রোববার ডারউইনে সিরিজের প্রথম টেস্টে স্বাগতিক অস্ট্রেলিয়াকে ৯ উইকেটে হারিয়ে স্মরণীয় এই জয় তুলে নেয় টাইগাররা। দীর্ঘ ২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট খেলতে নেমেই এই সাফল্য অর্জন করল বাংলাদেশ।
টাইগার দল যখন এই ঐতিহাসিক জয় নিশ্চিত করে, তখন কিশোরগঞ্জের পথে ছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ম্যাচ শেষ হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ দলের খেলোয়াড়দের সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলেন এবং ঐতিহাসিক জয়ের জন্য তাদের অভিনন্দন জানান। এ সময় প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের মানুষের পক্ষ থেকেও দলের খেলোয়াড়দের শুভেচ্ছা পৌঁছে দেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, অস্ট্রেলিয়ার মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে তাদের মাটিতে বাংলাদেশের এই ঐতিহাসিক জয় দেশের ক্রিকেটের জন্য অত্যন্ত গৌরবের। দলের খেলোয়াড়দের দৃঢ় মনোবল, আত্মবিশ্বাস, দক্ষতা ও দলগত প্রচেষ্টার ফলেই এই অসাধারণ সাফল্য অর্জিত হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ দলের খেলোয়াড়, কোচিং স্টাফ ও সংশ্লিষ্ট সবাইকে অভিনন্দন জানান। একই সঙ্গে তিনি আশা প্রকাশ করেন, পরের টেস্টেও বাংলাদেশ ভালো খেলবে এবং সিরিজ জয়ের এই সম্ভাবনাকে সাফল্যে রূপ দেবে। উল্লেখ্য, এর আগে ২০১৭ সালে মিরপুরে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে একটি টেস্ট ম্যাচে জয় পেয়েছিল বাংলাদেশ। এবার টেস্ট র্যাংকিংয়ের এক নম্বর দল অস্ট্রেলিয়াকে তাদেরই মাটিতে হারিয়ে নতুন ইতিহাস গড়ল বাংলাদেশ।
বিরোধীদলীয় নেতার অভিনন্দন : অস্ট্রেলিয়ার ডারউইনে অনুষ্ঠিত টেস্ট ম্যাচে শক্তিশালী অস্ট্রেলিয়াকে পরাজিত করে বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের ঐতিহাসিক বিজয়ে ক্রিকেটারদের অভিনন্দন জানিয়েছে জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান।
গতকাল রোববার এক বিবৃতিতে তিনি বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের খেলোয়াড়, কোচিং স্টাফ, ক্রিকেট বোর্ডের কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট সবাইকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানান।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “ওয়েল ডান! বাংলাদেশ ক্রিকেট টিম। ডারউইন টেস্টে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের এই লাল-সবুজ বিজয় সমগ্র জাতির জন্য অত্যন্ত আনন্দ, গৌরব ও মর্যাদার।”
তিনি বলেন, খেলোয়াড়দের চ্যালেঞ্জিং মানসিক দৃঢ়তা, অসাধারণ টিম স্পিরিট, সহনশীলতা এবং দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের মাধ্যমেই এই অবিস্মরণীয় জয় সম্ভব হয়েছে। কঠিন পরিস্থিতিতেও বাংলাদেশি ক্রিকেটাররা মাঠে যে ধৈর্য ও লড়াইয়ের মানসিকতা প্রদর্শন করেছেন, তা সত্যিই প্রশংসনীয়।
বিরোধীদলীয় নেতা বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের সব খেলোয়াড়, কোচিং স্টাফ, ক্রিকেট বোর্ডের কর্মকর্তা এবং দেশ-বিদেশের কোটি ক্রিকেটপ্রেমীকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানান।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, এই ধারাবাহিকতা বজায় রেখে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের সুনাম ও মর্যাদাকে আরও উচ্চতায় তুলে ধরবেন এবং দেশের জন্য আরও বড় অর্জন বয়ে আনবেন।
ডা. শফিকুর রহমান বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের খেলোয়াড়দের সাফল্য, সুস্বাস্থ্য ও উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ কামনা করেন।