স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের প্রার্থিতার বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। শিক্ষকদের রাজনৈতিকভাবে সম্পৃক্ততা এবং একই সঙ্গে নির্বাচনী দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠার আশঙ্কা থেকে তাদের প্রার্থিতার সুযোগ সীমিত করার সুপারিশ করেছে কমিশন। তবে এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। আইন সংশোধনের প্রক্রিয়া শেষে বিষয়টি চূড়ান্ত হবে।
একই সঙ্গে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন দিয়েই স্থানীয় সরকার নির্বাচনের কার্যক্রম শুরু করার পরিকল্পনা করছে নির্বাচন কমিশন। আগামী এক থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সময়সূচি ও সামগ্রিক কর্মপরিকল্পনা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানানো সম্ভব হবে বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার।
রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) দুপুরে রাজধানীর নির্বাচন ভবনে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন।
এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের প্রার্থিতার বিষয়ে আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, শিক্ষকরা সমাজে সম্মানিত ব্যক্তি। কিন্তু তাদের কেউ নির্বাচনে প্রার্থী হলে সহকর্মীরা তার পক্ষে নির্বাচনী কর্মকাণ্ডে যুক্ত হতে পারেন। আবার ভোটের সময় ওই শিক্ষকদেরই প্রিজাইডিং কর্মকর্তা, সহকারী প্রিজাইডিং কর্মকর্তা কিংবা পোলিং কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে হতে পারে। এতে তাদের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের প্রশ্ন তোলার সুযোগ তৈরি হবে।
এই বাস্তবতা বিবেচনায় এমপিওভুক্ত শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থিতার বাইরে রাখার বিষয়ে আইন সংশোধনের সুপারিশ করেছে কমিশন। নির্বাচন কমিশনের লক্ষ্য হচ্ছে একটি নিরপেক্ষ, সুষ্ঠু ও বিতর্কমুক্ত নির্বাচন আয়োজন করা এবং একই সঙ্গে শিক্ষাঙ্গনের স্বাভাবিক পরিবেশ বজায় রাখা।
তবে ইসির এই অবস্থান এখনো চূড়ান্ত কোনো আইন নয় বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনার। তিনি বলেন, কমিশনের সুপারিশ আইন মন্ত্রণালয়ে যাবে, এরপর মন্ত্রিসভা ও জাতীয় সংসদে আলোচনার মাধ্যমে তা চূড়ান্ত হবে। সেখানে আলোচনা, তর্ক-বিতর্কের পর সর্বসম্মতভাবে সিদ্ধান্ত হলে সেটিই আইন হিসেবে কার্যকর হবে।
এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ রাখার দাবি জানিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে দলটি নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠক করে নয় দফা দাবি জানিয়েছে। এসব দাবির মধ্যে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের প্রার্থিতার সুযোগ বহাল রাখার বিষয়টিও রয়েছে।
জামায়াতের পক্ষ থেকে নির্বাচন কমিশন সরকারের চাপে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে না বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। তবে এই অভিযোগকে রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে দেখছেন নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার। তিনি বলেন, কমিশন চাপের মধ্যে আছে—এমন বক্তব্য দিয়ে বরং কমিশনকে চাপে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।
এদিকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি দ্রুত এগিয়ে নিচ্ছে নির্বাচন কমিশন। কমিশনের পরিকল্পনা অনুযায়ী ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন দিয়েই ভোটের কার্যক্রম শুরু হতে পারে। এরপর পর্যায়ক্রমে সিটি করপোরেশন, পৌরসভাসহ অন্যান্য স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন আয়োজনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের তফসিল সম্পর্কে জানতে চাইলে আনোয়ারুল ইসলাম সরকার জানান, চলতি সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যেই বেশ কিছু বিষয় সুনির্দিষ্ট করা সম্ভব হবে। আগামী এক থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যে নির্বাচন কমিশনের সময়সূচি ও কর্মপরিকল্পনা সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা দেওয়া সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
তবে এখনই নির্বাচনের নির্দিষ্ট দিন-তারিখ জানাতে পারেনি কমিশন। নির্বাচনের সময় নির্ধারণের ক্ষেত্রে আগামী নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে অনুষ্ঠিতব্য বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হচ্ছে। কারণ দেশের অধিকাংশ ভোটকেন্দ্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্থাপন করা হয় এবং শিক্ষকরা নির্বাচনে বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেন।
পরীক্ষা ও নির্বাচন যাতে একই সময়ে না পড়ে, সে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে আইনগত বাধ্যবাধকতাকেই শেষ পর্যন্ত অগ্রাধিকার দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনার।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচনী আচরণবিধিও চূড়ান্ত করেছে কমিশন। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রয়োগ করা কিছু নতুন বিষয় স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আচরণবিধিতে যুক্ত করা হয়েছে। শিগগিরই এ বিষয়ে গেজেট প্রকাশ করা হবে বলে জানিয়েছে ইসি।
নির্বাচনকে আরও স্বচ্ছ ও নিরাপদ করতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে কমিশনের। ভোটকেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা স্থাপন, নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের বডি-ওর্ন ক্যামেরার সংখ্যা বাড়ানো এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ড্রোন প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।