স্টাফ রিপোর্টার
বাংলাদেশে বর্তমানে হাম এবং ডেঙ্গুর প্রকোপ এক ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে এবং দুটি রোগেই আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা আশঙ্কাজনকহারে বাড়ছে। টিকা দেওয়ার পর বলা হচ্ছিল শিশু মৃত্যু কমে আসবে। কিন্তু না। প্রতিদিন শিশু মৃত্যুতে হাসপাতালের পরিবেশ ভারি হয়ে উঠছে। অন্যদিকে ডেঙ্গুতেও মৃত্যু বাড়ছে প্রতিদিন। মৌসুমি সংক্রমণ হিসেবে পরিচিত ডেঙ্গুতে এবার বিপুল প্রাণহানির আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। সরকারের পক্ষ থেকে নানা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও তা কমার কোন লক্ষণ নাই। উল্টো ঢাকার বাইরে সংক্রমণ বৃদ্ধি পাচ্ছে আশংকাজনক হারে।
দেশে হামের উপসর্গ নিয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় আরও সাতজনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে চলতি বছরে নিশ্চিত হামে ১০০ জন এবং হামের উপসর্গ নিয়ে ৯০৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে আরও ছয়জনের মৃত্যু এবং ১ হাজার ৪৯২ জনের হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার তথ্য জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত হেলথ বুলেটিনে বৃহস্পতিবার হামের সর্বশেষ পরিস্থিতির এসব তথ্য জানানো হয়।
এতে বলা হয়েছে, বুধবার সকাল ৮টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে নতুন করে ১ হাজার ১৬৫ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। এ সময়ে শুধু ঢাকাতেই মারা গেছেন তিন জন। গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের মধ্যে ঢাকা বিভাগে ৪৫০ জন, চট্টগ্রামে ২৬২, সিলেটে ১৫৩, বরিশালে ১১৬, খুলনায় ৮৯, ময়মনসিংহে ৮২, রাজশাহীতে ২৮ এবং রংপুরে ১৪ জন রয়েছেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ১ লাখ ৪৮ হাজার ৫০৫ জন ভর্তি হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে চিকিৎসা শেষে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন ১ লাখ ৪২ হাজার ৮৮৮ জন।
একই সময়ে দেশে সন্দেহজনক হামের রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৬৮ হাজার ৭৬৫ জনে। এর মধ্যে পরীক্ষায় নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়েছেন ১৯ হাজার ৯৩৩ জন। অন্যদিকে, গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে আরও ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। এ সময়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে নতুন করে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৪৯২ জন। বৃহস্পতিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোলরুমের পাঠানো বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
ডেঙ্গুতে নতুন ভর্তি রোগীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ২৮৪ জন খুলনা বিভাগে। এ ছাড়া বরিশালে ১৭৮, চট্টগ্রামে ২০২, ঢাকা বিভাগের সিটি করপোরেশনের বাইরের এলাকায় ২৪১, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ১৫১, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ৮১, ময়মনসিংহে ৮০, রাজশাহীতে ১২২, রংপুরে ৫৪ এবং সিলেটে ১৩ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
চলতি বছরের ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মোট ৪৮ হাজার ৪৩০ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ৪৪ হাজার ৮৫৭ জন চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন। এ বছর এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মোট ১৩৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। হাম ও ডেঙ্গুÑদুই রোগেই আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে থাকায় হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপও বাড়ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দৈনিক তথ্য অনুযায়ী, উভয় রোগের পরিস্থিতিই নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
খুলনা ব্যুরো
খুলনা বিভাগে গত ২৪ ঘণ্টায় হাম ও ডেঙ্গুর প্রকোপে আরও ৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ঝিনাইদহে সন্দেহজনক হামে আক্রান্ত হয়ে ২ জন এবং খুলনা জেলায় ডেঙ্গুতে ২ জন মারা গেছেন। একই সময়ে ১০ জেলায় হাম ও ডেঙ্গু মিলিয়ে নতুন করে আরও ৩৭৪ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। গতকাল বৃহস্পতিবার খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের দফতর থেকে প্রকাশিত পৃথক দুটি প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় বিভাগে নতুন করে ২৮৪ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে সরকারি হাসপাতালে ২৬০ জন এবং বেসরকারি হাসপাতালে ২৪ জন। সর্বোচ্চ ভর্তি দেখা গেছে খুলনা জেলায় ৯৫ জন এবং খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৪৮ জন। চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিভাগে মোট ৮ হাজার ১৯৯ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন এবং মারা গেছেন ২৭ জন। বর্তমানে ৯৩০ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন। অন্যদিকে, গত ২৪ ঘণ্টায় বিভাগে ৯০ জন নতুন সন্দেহজনক হামের রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে খুলনা জেলায় সর্বোচ্চ ২১ জন ভর্তি হন। এই সময়ে ঝিনাইদহে সন্দেহজনক হামে আক্রান্ত হয়ে ২ জনের মৃত্যু হয়।
স্বাস্থ্য দপ্তরের তথ্যমতে, ২০২৩ সালের ১৫ মার্চ থেকে অদ্যাবধি বিভাগে মোট ১০ হাজার ৯৮৮ জন সন্দেহজনক হামের রোগী শনাক্ত হয়েছেন এবং মোট ৪০ জন মারা গেছেন। একই দিনে ৪ জনের মৃত্যু ও ৩৭৪ জন নতুন আক্রান্তের ঘটনায় বিভাগের ১০ জেলায় ডেঙ্গু ও হাম প্রতিরোধে সতর্কতা এবং স্বাস্থ্যবিধি মানার পরামর্শ দিয়েছে বিভাগীয় স্বাস্থ্য দপ্তর।
এদিকে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগীকে তিন-চারদিন স্থানীয় সরকারি বা বেসরকারি হাসপাতালে থাকতে হচ্ছে। সাথে স্বজন ও রোগীর তিনবেলার খাবার, পথ্য, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ওষুধ ক্রয়ে জনপ্রতি প্রতিদিন পরিবারকে হাজার টাকারও বেশি খরচ বহন করতে হচ্ছে। পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য অপেক্ষায় থাকতে হয় চার-পাঁচ ঘণ্টা। সরকারি হাসপাতালের মেঝেতে শুয়ে চিকিৎসা নেওয়া একজন রোগীর জন্য চারদিনে ৫ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে। আর বেসরকারী হাসপাতালে ভর্তি অনেক রোগী ও তাদের পরিবারের ব্যয় সামাল দিতে হিমসিম খেতে হচ্ছে। মধ্য জুলাই থেকে সরকারি ও বেসরকারী হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে ৭০-৮০ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হচ্ছে। কোনো কোনো দিন সংখ্যা একশো’ ছাড়িয়ে যাচ্ছে। ফলে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ সরকারি হাসপাতালের মেঝে, সিড়ির সামনের বারান্দা, লিফটের সামনের ফাঁকা জায়গায়ও ঠাঁই মিলছে না। শয্যা সংকট থাকায় ভর্তি নিতে পারছে না অনেক বেসরকারি হাসপাতালও। ফলে সীমাহীন দুর্ভোগে পড়তে হচ্ছে ডেঙ্গু রোগীদের।