সংগ্রাম ডেস্ক

ভারতের কলকাতায় একটি হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নয় বাংলাদেশী নিহত হয়েছে। এ ঘটনায় আরও ছয়জন আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ছয়জন পুরুষ, দু’জন নারী ও একটি শিশু রয়েছে বলে জানিয়েছে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ।

গতকাল বুধবার ভোররাতের দিকে কলকাতার নিউ মার্কেট এলাকার ফ্রি স্কুল স্ট্রিটে এ অগ্নিকাণ্ড ঘটে। স্থানীয় সময় রাত প্রায় ২টার দিকে হোটেলটিতে আগুনের সূত্রপাত হয়। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে উদ্ধার ও আগুন নিয়ন্ত্রণের কাজ শুরু করেন। এনডিটিভি, এএনআই, আনন্দবাজার, ডটকম ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস।

ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, নিহত বাংলাদেশীরা চিকিৎসার জন্য কলকাতায় গিয়েছিলেন। আগুন লাগার পর ঘন ধোঁয়ায় হোটেলের ভেতরে অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং কয়েকজন অচেতন হয়ে যান। পরে তাদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হয়।

অগ্নিকা-ের সময় হোটেল ও আশপাশের ভবন থেকে প্রায় ৬০ জনকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়। আহত ছয়জনকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং অন্যদের ছেড়ে দেওয়া হয়। তাদের শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায় নি।

প্রাথমিকভাবে আগুনের কারণ হিসেবে এয়ার কন্ডিশনারে বিস্ফোরণের সম্ভাবনার কথা বলা হলেও, বিষয়টি এখনো নিশ্চিত নয়। আগুনের প্রকৃত কারণ জানতে তদন্ত শুরু করেছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ। এ ঘটনায় হোটেলের দুই কর্মীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করেছে পুলিশ।

ঘটনাস্থলটি কলকাতার ঘনবসতিপূর্ণ নিউ মার্কেট এলাকার কাছে হওয়ায় উদ্ধারকাজে নানা ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয় ফায়ার সার্ভিসকে। ভবনটির বিভিন্ন অংশে ঘন ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ায় ভেতরে আটকে পড়াদের উদ্ধারে বেগ পেতে হয়।

একই সময়ে পশ্চিমবঙ্গে হোটেলে অগ্নিকাণ্ডের আরেকটি ঘটনা ঘটে। এর মাত্র দুই দিন আগে রাজ্যের তারাপীঠের একটি হোটেলে আগুনে কয়েকজনের মৃত্যু হয়েছিল। পরপর এসব ঘটনায় হোটেলগুলোর অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

গতকাল বুধবার সকালে অগ্নিকাণ্ডের পর ঘটনাস্থলে গিয়ে বহুতলটির ভেতরে ছত্রে ছত্রে অনিয়ম ও অব্যবস্থার চিত্র দেখা গেছে। পাঁচতলা ভবনটির প্রায় প্রতিটি তলাতেই ছিল সংকীর্ণ ঘর, সরু চলাচলের পথ এবং পর্যাপ্ত অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকার অভিযোগ।

অভিযোগ উঠেছে, ওই ভবনের বিভিন্ন তলায় একাধিক হোটেল চলছিল। প্রতিটি তলাতেই ছোট ছোট কক্ষ তৈরি করে আবাসিকদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। স্থানীয়দের দাবি, ঘরগুলো ছিল অনেকটা পায়রার খোপের মতো। বড় কোনো কক্ষ ছিল না। প্রতিটি তলায় একাধিক শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র চলত বলেও জানা গেছে। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে ভবনটির অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা নেই।

অভিযোগ, সেখানে আগুন নেভানোর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা ছিল না। আগুন লাগার পর ভবন থেকে বের হওয়ার জন্য বিকল্প পথও পাওয়া যায়নি। মূল প্রবেশ ও বের হওয়ার পথটি ছিল অত্যন্ত সংকীর্ণ। ফলে মধ্যরাতে আগুন লাগার পর ঘুমন্ত আবাসিকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ধোঁয়ায় পুরো ভবন ঢেকে যাওয়ায় অনেকে বের হতে পারেননি। স্থানীয় বাসিন্দারাই প্রথমে উদ্ধারকাজে এগিয়ে আসেন। পরে ফায়ারসার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার পাশাপাশি উদ্ধারকাজ শুরু করেন। আগুনের তীব্রতা খুব বেশি না হলেও ধোঁয়া দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে। প্রাণ বাঁচাতে কয়েকজন শৌচাগারে আশ্রয় নিয়েছিলেন। একজন ওপর থেকে ঝাঁপ দিয়ে প্রাণে বাঁচার চেষ্টা করেন। পরে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

স্থানীয় সূত্রে বলা হয়েছে, নিউমার্কেট এলাকায় এ ধরনের একাধিক আবাসিক হোটেল রয়েছে। ভিনরাজ্য থেকে আসা মানুষ ছাড়াও বাংলাদেশ থেকে চিকিৎসার জন্য কলকাতায় আসা অনেকে এসব হোটেলে থাকেন। মির্জা গালিব স্ট্রিটের ওই হোটেলেও বাংলাদেশ থেকে আসা বেশ কয়েকজন ছিলেন।

স্থানীয় সূত্রের খবর, নিহত ৯ জনের মধ্যে আটজন বাংলাদেশী নাগরিক। অগ্নিকাণ্ডের পর ভবনটির অনুমোদন, নির্মাণ পরিকল্পনা এবং ব্যবসা পরিচালনার অনুমতি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

বুধবার সকালে ঘটনাস্থলে যান পুর ও নগরোন্নয়নমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল, শিল্পমন্ত্রী তাপস রায় এবং দমকল প্রতিমন্ত্রী কৌশিক চৌধুরী। তিনি বলেন, কীভাবে ওই ভবনে হোটেল চালানোর অনুমতি দেওয়া হয়েছিল এবং কীভাবে ব্যবসার অনুমতি মিলেছিল, তা তদন্ত করে দেখা হবে।

নিহত বাংলাদেশীদের ৪ জন একই পরিবারের

কলকাতায় আবাসিক হোটেলে অগ্নিকাণ্ডে নিহত ৯ জনের মধ্যে একই পরিবারের রয়েছেন চারজন। নিহতদের মধ্যে ৬ জনের পরিচয় জানা গেছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন কুষ্টিয়ার দেবাশিস দত্ত (৩৯), তার আড়াই বছর বয়সি শিশু শর্ণশিষ দত্ত, স্ত্রী আফসানা শিম্মিন (২৭) ও শ্বশুর আকরাম আলী (৬৪)।

দেবাশিস দত্ত পেশায় একজন সাংবাদিক। তিনি একটি বেসরকারি টেলিভিশনের কুষ্টিয়া প্রতিনিধি। তাদের কলকাতা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে রাখা হয়েছে।

দেবাশিস দত্তের বাড়ি কুষ্টিয়া মডেল থানার মোহিনী মিল এলাকার আরুয়াপাড়ায়। তার বাবার নাম দিলীপ কুমার দত্ত। আকরাম আলীর বাড়ি কুষ্টিয়া হেড পোস্ট অফিস এলাকার বদরুদ্দোজা রোডে।

নিহত আহামেদ বাবুর বাড়ি ঢাকার সাভারের আমিনবাজারের বেগুনবাড়িতে। তার বাবার নাম আদম আলী। এছাড়া ১৯ বছর বয়সি সন্দীপ পাসওয়ান নামে আরেকজনের পরিচয় মিলেছে। তিনি ভারতের ঝাড়খণ্ডের গিরিডি জেলার বাসিন্দা। অপর তিনজনের পরিচয় এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। আগুনের সময় ওই হোটেলে ২৫ জন বাংলাদেশী ছিলেন। কলকাতায় অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস ৮ জন বাংলাদেশীর মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করেছে। সংবাদ সংস্থা এএনআই জানিয়েছে, নিহতরা চিকিৎসার জন্য কলকাতায় এসেছিলেন।

জানালা বেয়ে কার্নিসে দাঁড়িয়ে প্রাণ বাঁচালেন বাংলাদেশী দম্পতি

কলকাতার নিউ মার্কেট এলাকার একটি হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড থেকে অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে ফিরলেন বাংলাদেশী দম্পতি সোমাইয়া আখতার ও রেজাউল ইসলাম। মঙ্গলবার গভীর রাতে ঘটে যাওয়া এই ঘটনায় তাদের অভিজ্ঞতা রীতিমতো শিউরে ওঠার মতো।

জানা যায়, সপ্তাহখানেক আগে ঘুরতে কলকাতায় আসেন ওই দম্পতি। নিউ মার্কেটের মির্জা গালিব স্ট্রিটের ‘শিখা ইন’ হোটেলে উঠেছিলেন তারা। মঙ্গলবার রাত প্রায় ১টা ৫০ মিনিটের দিকে হঠাৎ ঘরের দরজায় জোরে ধাক্কার শব্দে ঘুম ভাঙে তাদের। দরজা খুলতেই দেখেন করিডর ও বারান্দা ঘন ধোঁয়ায় ঢেকে গেছে।

পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেন রেজাউল ইসলাম। দরজা দিয়ে বের না হয়ে স্ত্রীকে নিয়ে জানলা খুলে তিনতলার কার্নিসে নেমে যান। জীবন বাঁচাতে তখন একমাত্র ভরসা ছিল সেই সরু কার্নিস।

সোমাইয়া আখতার জানান, “আমরা ‘হেল্প, হেল্প’ বলে চিৎকার করছিলাম। নিচে কেউ যেন আমাদের দেখতে পায়, সে জন্য মোবাইলের ফ্ল্যাশলাইট জ্বালিয়ে সংকেত দিচ্ছিলাম।” প্রায় আধ ঘণ্টা তারা ওই অবস্থায় কার্নিসে দাঁড়িয়ে ছিলেন।

পরে খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছায় দমকল বাহিনী। মইয়ের সাহায্যে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থান থেকে দম্পতিকে নিরাপদে নামিয়ে আনা হয়।

কলকাতা এমন ঘটনা আগেও দেখেছে

কলকাতার পুরোনো বাণিজ্যিক এলাকাগুলো এমন সব ভবনে ভরপুর, যেখানে ঘন ও জীর্ণ কাঠামোর ভেতরেই হোটেল, রেস্তোরাঁ, দোকান ও অফিস পরিচালিত হয়।

সরু গলি ও জনবহুল এসব ভবনে মানুষের বের হওয়া এবং আগুন নেভানোর কাজ করা উভয়ই অত্যন্ত কঠিন। এলাকাটির এমন একটি ইতিহাসও রয়েছে।

মির্জা গালিব স্ট্রিট, ফ্রি স্কুল স্ট্রিট ও মার্কুইস স্ট্রিট এলাকা মধ্য কলকাতার অন্যতম প্রধান কম খরচের বা বাজেট হোটেলের চত্বর হিসেবে পরিচিত। বাংলাদেশ থেকে আসা দর্শনার্থীদের থাকার জন্য এ এলাকা বেশ জনপ্রিয়। বিশেষ করে চিকিৎসাজনিত কারণে যারা কলকাতা আসেন, তাদের বড় অংশ এখানেই ওঠেন।

নিহতদের লাশ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনা হবে: শামা ওবায়েদ

কলকাতার নিউমার্কেট এলাকায় অগ্নিকা-ের ঘটনায় নিহত বাংলাদেশিদের লাশ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনা হবে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম।

গতকাল বুধবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আলাপকালে তিনি এ কথা বলেন। প্রতিমন্ত্রী জানান, পরিবার চাইলে নিহতদের মরদেহ আনার খরচ সরকার বহন করবে।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, কলকাতার হোটেল অগ্নিকাণ্ডে ৫ বাংলাদেশী নাগরিকের লাশ শনাক্ত করা গেছে। এদের মধ্যে ৪ জন একই পরিবারের সদস্য। অগ্নিকাণ্ডে নিহতদের লাশ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনা হবে।