* মোদির বার্তা নিয়ে ঢাকায় ফিরছেন ত্রিবেদী

* হাসিনা বাদে হাদীর হত্যাকারী ও অন্যান্য অপরাধীদের ফিরত দিতে পারে ভারত

* অন্যান্য অমীমাংসিত বিষয়ে অগ্রগতি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে

মুহাম্মদ নূরে আলম

বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের সমীকরণ বর্তমানে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে। ভারতে পলাতক ক্ষমতাচ্যুত ও জুলাই গণহত্যার অভিযোগে দণ্ডপ্রাপ্ত ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ, শহীদ শরিফ ওসমান হাদী হত্যার আসামীদের হস্তান্তর এবং দুই দেশের মধ্যকার সংবেদনশীল সীমান্ত ও নিরাপত্তা ইস্যুকে কেন্দ্র করে ঢাকা-দিল্লির কূটনৈতিক আলোচনা এখন তীব্র গতি পেয়েছে। এই পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটেই ১১ আগস্ট ২০২৬ মঙ্গলবার নয়াদিল্লির পার্লামেন্ট ভবনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র দামোদর মোদির সঙ্গে প্রায় এক ঘণ্টার এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে মিলিত হন ঢাকায় নিযুক্ত দেশটির হাইকমিশনার শ্রী দীনেশ ত্রিবেদী। ঢাকায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান এবং স্বরাষ্ট্র ও সামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনার পর প্রাপ্ত ‘ঢাকার বার্তা’ তিনি সরাসরি মোদির কাছে তুলে ধরতে জরুরি সফরে এখন দিল্লিতে রয়েছেন। নরেন্দ্র মোদির তরফ থেকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক পুনর্গঠনের নতুন দিকনির্দেশনা ও বার্তা নিয়ে খুব দ্রুতই ঢাকায় ফিরছেন দীনেশ ত্রিবেদী; ঢাকা ও নয়া দিল্লির কূটনৈতিক সূত্রের বরাতে এমন তথ্য আসছে। সব ঠিক থাকলে দীনেশ ত্রিবেদী আগামী ১৪ আগস্ট ঢাকায় ফিরতে পারেন বলে জানাচ্ছে কূটনৈতিক সূত্রগুলো। সূত্রগুলো বলছেন, ভারত সরকার আপ্রাণ চেষ্টা করছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ভারত সফরে নেওয়ার জন্য। এরই অংশ হিসেবে সবকিছু ঠিক থাকলে উপযুক্ত সময়ে দিল্লি সফরে যেতে পারেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ঢাকার পক্ষ থেকে দিল্লিকে দেওয়া বার্তার শর্ত অনুযায়ী ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা বাদে শহীদ ওসমান হাদীর হত্যাকারী ও অন্যান্য অপরাধীদের ফিরত দিতে পারে ভারত। এছাড়াও ঢাকার কড়াবার্তা অনুযায়ী পলাতক ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনাকে আর দিল্লিতে বাংলাদেশ বিরোধী বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ ভারত দিবে না বলে এমন মৌখিক প্রতিশ্রুতি দিতে পারে নয়া দিল্লি। আরও অন্যান্য অমীমাংসিত বিষযগুলো অগ্রগতি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা।

নয়াদিল্লির কূটনৈতিক সূত্রগুলোর তথ্যমতে, ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী ঢাকায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও অন্যান্য শীর্ষ কর্মকর্তাদের সাথে অনুষ্ঠিত বৈঠকের সারসংক্ষেপ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কাছে উপস্থাপন করেন। ঢাকায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান সাংবাদিক ব্রিফিংয়ে জোর দিয়ে বলেছিলেন, দুই দেশের বহুমাত্রিক সম্পর্ককে এগিয়ে নিতে হলে সর্বাগ্রে একটি ‘সহায়ক পরিবেশ’ তৈরি করা জরুরি। হাইকমিশনার ত্রিবেদী প্রধানমন্ত্রী মোদির কাছে দুই দেশের ঐতিহাসিক ও দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্ককে ‘গঠনমূলক ও জনগণকেন্দ্রিক’ ধারায় বিকশিত করার বিষয়ে ভারতের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকনির্দেশনা চান। মোদির সঙ্গে আলোচনা শেষে তিনি ভারতের অভ্যন্তরীণ অবস্থান ও রূপরেখা নিয়ে ঢাকায় ফিরছেন, যা পরবর্তী কূটনৈতিক পদক্ষেপে প্রভাব ফেলবে।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ব্রিফিং: গত মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) নয়াদিল্লিতে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল বাংলাদেশের সঙ্গে চলমান বিভিন্ন সংবেদনশীল বিষয়ে দিল্লির অবস্থান স্পষ্ট করেন। জয়সোয়াল জানান, দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই গত ফেব্রুয়ারি মাসে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ভারতে দ্বিপক্ষীয় সফরের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। এছাড়া, বিমসটেক-এর বর্তমান চেয়ারপারসন হিসেবে আগামী ১২-১৩ সেপ্টেম্বর দিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের ‘আউটরিচ পর্বে’ যোগ দেওয়ার জন্য তাঁকে নতুন করে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। ঢাকায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শেখ হাসিনাকে ফেরত দেওয়ার যে দাবি তুলেছেন, সে প্রসঙ্গে জয়সোয়াল বলেন, “আমাদের অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্ট। ভারতের প্রচলিত আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক পদ্ধতি এবং প্রতিষ্ঠিত কার্যপ্রণালি অনুযায়ী পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।” ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদী হত্যা মামলায় ভারতীয় হেফাজতে থাকা আসামীদের হস্তান্তর প্রসঙ্গে তিনি জানান, এটি একটি আইনি বিষয় এবং বিষয়টির তদন্ত কার্যক্রম বর্তমানে অব্যাহত রয়েছে। ৯ ও ১০ আগস্ট ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইং’ (RAW)-এর প্রধান পরাগ জৈন ও অন্য কর্মকর্তাদের ঢাকায় ডিজিএফআই-এর আমন্ত্রণে আগমন এবং প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এ কে এম শামছুল ইসলামের সঙ্গে বৈঠকের খবর নিয়ে দিল্লিতে সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখ পড়েন জয়সোয়াল। সংবাদ সম্মেলনে এক সাংবাদিক ‘র’ প্রধানের সফর ও বৈঠকের উদ্দেশ্য জানতে চাইলে মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে বলেন, “এ বিষয়ে আমার কিছু জানা নেই। হয়তো সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে আলোকপাত করতে পারবে।”

তবে ঢাকার সূত্র নিশ্চিত করেছে, বদলে যাওয়া রাজনৈতিক বাস্তবতায় অবৈধভাবে অবস্থানরত পলাতকদের বিচারিক মুখোমুখি করতে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে ভারতীয় গোয়েন্দা দলকে সরাসরি মনস্তাত্ত্বিক চাপের মুখে পড়তে হয়।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, সার্বভৌম সমতা ও শ্রদ্ধার ভিত্তিতে পরিবেশ নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত দুই দেশের সম্পর্কে স্থায়িত্ব আসবে না। সীমান্তে পুশইন বন্ধ, সীমান্ত হত্যা রোধ এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের আসামীদের ফেরত দেওয়াই সম্পর্ক স্বাভাবিকের মূল চাবিকাঠি।

তবে কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দিল্লি তাদের বার্তা বা আইনি পর্যালোচনার মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে ইতিবাচক যোগাযোগ বজায় রাখতে চায়। তারা শীর্ষ পর্যায়ে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক এবং ব্রিকস সম্মেলনের মাধ্যমেই সম্পর্কের নতুন অধ্যায় শুরু করতে আগ্রহী ভারত। নরেন্দ্র মোদির বার্তা নিয়ে দীনেশ ত্রিবেদীর ঢাকায় প্রত্যাবর্তন এবং বাংলাদেশের উত্থাপিত দাবির বিপরীতে দিল্লির চূড়ান্ত সাড়া দুই দেশের সম্পর্কের বরফ গলার গতিপথ নির্ধারণ করবে। একদিকে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে যখন টানাপোড়েন ও আমন্ত্রণের রাজনীতি চলছে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিও দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। ভারতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত সার্জিও গর সম্প্রতি দিল্লীর জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক করে নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক কৌশল নিয়ে আলোচনা করেছেন। একই সময়ে পাকিস্তান, তুরস্ক ও সৌদি আরবের নতুন অক্ষ আঞ্চলিক রাজনীতিতে প্রভাব ফেলছে।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, দিল্লী সফর বা ব্রিকস সম্মেলনে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সিদ্ধান্ত অত্যন্ত ভেবেচিন্তে নিতে হবে। শুধু মৌখিক প্রতিশ্রুতি নয়, বরং ভারত ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনাকে হস্তান্তরের বিষয়ে আইনি কাঠামোর আওতায় কী ধরনের বাস্তব পদক্ষেপ নিচ্ছে, তার ওপর ভিত্তি করেই ঢাকার ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক অবস্থান নির্ধারিত হওয়া উচিত।

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. নজরুল ইসলাম বলেন, ঢাকায় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী ফিরে এসে কী বার্তা বা নিশ্চয়তা পেশ করেন, তার ওপরই নির্ভর করছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দিল্লি বা ব্রিকস সফরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত। ভারত কেবল আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণে সীমাবদ্ধ থাকে নাকি প্রত্যর্পণ ও নিরাপত্তার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেয়, সেটিই এখন পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টির কেন্দ্রে। তাছাড়া আমরা গণমাধ্যমের বরাতে জেনেছি যে, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জনাব তারেক রহমানকে দাওয়াত দেওয়া হয়নি, বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে দাওয়াত দিয়েছে। এমনকি তাকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে চিঠিতে উল্লেখও করেনি। এতে প্রশ্ন থেকে যায় যে, ভারত কি এখনও জুলাই গণঅভ্যুত্থানে পালিয়ে যাওয়া ফ্যাসিস্ট সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে প্রধানমন্ত্রী মনে করে? এ বিষয়টিও দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের জন্য প্রাসঙ্গিক ও গুরুত্বপূর্ণ। বাকী সব ঠিক আছে।

এই আন্তর্জাতিক কূটনীতি বিশ্লেষকের মতে, দিল্লী সম্পূর্ণ নতিস্বীকার করেছে বলাটা হয়তো এই মুহূর্তে কিছুটা তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত হবে, তবে “দিল্লীর পুরোনো একপেশে ফর্মুলা যে ভেঙে পড়েছে” এই সত্যে কোনো সন্দেহ নেই। এটিকে ঢাকার বড় এক মনস্তাত্ত্বিক ও কূটনৈতিক সাফল্য বলা চলে, তবে আসল বিজয়ের পথ তৈরি হবে তখনই, যখন এই চাপের মুখে ভারত বাংলাদেশকে দেওয়া শর্তগুলো বাস্তবে রূপ দিতে বাধ্য হবে।

সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফাযেজ আহমেদ বলেন, ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধি পেয়েছে, আলাপ আলোচনা হচ্ছে, বৈঠক হচ্ছে এটা একটা ভালো দিক। দীর্ঘ সময় দুদেশের সম্পর্ক স্থবির ছিল এখন আশা করা যায় সচল হবে এবং দ্বিপাক্ষীক সম্পর্কের উন্নয়ন হবে। ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে বৈঠকের পর ‘ঢাকার বার্তা’ নিয়ে দিল্লি গেছেন এতে বুঝা যাচ্ছে দুদেশের সম্পর্ক ভালো দিকে যাচ্ছে। ব্রিকস এর সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভারত গেলে ভালো হবে; আমি মনে করি যাওয়ার দরকার। এতে করে সরাসরি দু’পক্ষে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে অনেক অমীমাংসিত বিষয়ের অগ্রগতি হবে।