গতকাল মঙ্গলবার ভোর ৬টায় মিরপুর-১ শাহ আলী কাঁচা বাজার পরিদর্শন করেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান এমপি।

বাজার পরিদর্শনকালে তিনি নিত্যপণ্যের বাজার মূল্য যাচাই করেন এবং কাঁচামাল ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলেন ও তাদের খোঁজখবর নেন। এ সময় ব্যবসায়ীরা বিরোধীদলীয় নেতার নিকট তাদের নানা সমস্যা তুলে ধরেন এবং সমস্যা সমাধানের আহ্বান জানান। জামায়াত আমীর তাদের সঙ্গে নিয়ে এসব সমস্যা সমাধানের প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন।

বাজার পরিদর্শনকালে উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য মোঃ মোবারক হোসাইন, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমীর মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন, ঢাকা-১৪ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার মীর আহমদ বিন কাসেম আরমান এমপি, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী উত্তরের সহকারী সেক্রেটারি মো. মাহফুজুর রহমানসহ বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মী।

পরিদর্শনকালে ব্যবসায়ীরা বিরোধীদলীয় নেতার কাছে অভিযোগ তুলে বলেন, সরকারিভাবে পাঁচ হাজার টাকায় ভাড়া দেওয়া রাজধানীর মিরপুর শাহআলী কাঁচা বাজারে দোকান দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত ভাড়া দিচ্ছে বরাদ্দ পাওয়া মালিকরা। যেটা ব্যবসায়ীদের জন্য বাড়তি চাপ, সঙ্গে চলছে নীরব চাঁদাবাজি। কারা করছে চাঁদাবাজি তা বলতেও ভয় পাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা।

এ প্রসঙ্গে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, প্রতিরোধ করতে হবে সম্মিলিতভাবে। ব্যবসায়ীরা চাইলে প্রতিরোধের জন্য আমরা প্রস্তুত আছি।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আমরা এদেশের নাগরিক। এদেশে বর্তমানে একটা সরকার প্রতিষ্ঠিত আছে। একটা সংসদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আমরা বিরোধী দলে, সরকারে বিএনপি। আগের থেকে বাজার অস্থির। ইদানিং মনে হচ্ছে আরও একটু বেশি অস্থির। কেন অস্থির? এই যে একটা বিশাল মার্কেট রয়েছে। এখানে দোকানদার বলছেন, নীরব চাঁদাবাজি আছে। কথা বলতে চায়, তাদের চেপে রাখা হয়েছে।

তিনি প্রশ্ন তুলে বলেন, এখানে তো আফ্রিকার জঙ্গল থেকে এসে কেউ চাঁদাবাজি করে না। এখানেই আমাদের সঙ্গে চলাফেরা করে, উঠাবসা বসবাস করা লোকেরাই চাঁদাবাজি করে। তাদের পরিচয় আমরা সবাই জানি।

তিনি সংসদের শেষ অধিবেশনের শেষ দিবসে নিজের বক্তব্য তুলে ধরে বলেন, আমি বলেছিলাম, সংসদ সদস্যরা যদি সিদ্ধান্ত নেয় যে বাংলাদেশের চাঁদাবাজি হবে না, তাহলে কেউ করার সাহস করবে না। আমরা চাই, চাঁদাবাজিটা বন্ধ হোক।

তিনি বলেন, ভোক্তা বা সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমাদের বাজারে আসতে হয় পণ্য কেনার জন্য। আপনি না হয় একটা পণ্যের ব্যবসা করেন, কিন্তু আরও ১০০টা পণ্য যে আমাদের কেনা লাগে। সেখানে কেনাকাটা করতে গিয়ে আমাকে বিড়ম্বনা স্বীকার হতে হবে কেন?

মানুষের নাভিঃশ্বাস উঠে গেছে উল্লেখ করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বিশেষ করে যারা স্বল্প আয়ের মানুষ, তাদের অবস্থা এখন বেঁচে থাকাই কঠিন হয়ে গেছে। আমাদের নাগরিক দায়িত্ব, জনগণ আমাদের ভোট দিয়েছে। আমরা আজকে মহড়া দিতে আসিনি, বাজারটাকে বুঝতে এসেছি।

তিনি বলেন, আজকে আড়ত বাজারে এসেছি। খুচরা বাজারেও যাবো। মোকামেও আমরা যাবো, খবর নেবো। জায়গায় জায়গায় মধ্যস্বত্বভোগী, সিন্ডিকেট এবং চাঁদাবাজির কারণে এখানে যারা ব্যবসায়ী রয়েছে তারাও কিন্তু ভালো ব্যবসা করতে পারে না। আমরা যারা ভোক্তা আছি, আমরা ন্যায্য মূল্যে আমাদের পণ্যগুলো পাই না। কৃষক তার মূল্যের, তার মানে উৎপাদিত মূল্যের ন্যায্য মূল্য পায় না। মাঝখানে অন্যদের পেটে ঢুকে যায়। আমরা ওটা ভাঙতে চাই। কোন দিন ভাঙতে পারবো আল্লাহ ভালো জানে। কিন্তু আমাদের লড়াই শুরু হয়েছে। এই লড়াই চলবে, আমরা থামবো না। আমাদের আওয়াজ, আমাদের প্রতিবাদ, আমাদের দাবি সংসদের ভেতরে এবং বাইরে সব জায়গায় অব্যাহত থাকবে।

তিনি বলেন, দেশটা আমরা সবাই মিলেই ভালো করতে পারবো। একা কেউ পারবে না। একা কোনো দলও পারবে না। জনগণের সহযোগিতা দরকার। দেশ জনগণের। দেশের মালিকও জনগণ।

এসময় তিনি ব্যবসায়ীদের কাছে বাজারের সমস্যা জানতে চাইলে এক ব্যবসায়ী বলেন, আমাদের এখানে অনেক সমস্যা। যেমন এই ঘরগুলো সরকারিভাবে ভাড়া দেওয়া হয়েছে। সরকারি ভাড়া হলো ৫ হাজার টাকা। প্রতি স্কয়ার ফিটের ভাড়া ১৩ টাকা। ঘরগুলো ভাড়া দেয়া হয়েছে বিগত সরকারের আমলে। ঘরগুলো বরাদ্দ হয়েছে বিভিন্ন জনের নামে। বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতারা পেয়েছে। ঘর যারা পেয়েছে তারা ব্যবসা করে না, ব্যবসা করি আমরা সাধারণ ব্যবসায়ীরা। আগের সরকার নাই, কিন্তু ওই নিয়মই বহাল আছে। ঘরগুলো যারা পেয়েছে অর্থাৎ মালিকরা ভাড়া দিচ্ছে ১ লাখ থেকে দেড় লাখ টাকা। এক লাখ, ৯০ হাজার, ৬০ হাজার টাকাতেও ভাড়া দেওয়া আছে।

ওই ব্যবসায়ী বলেন, এক বছর আগে আমরা টাকা দিয়ে রাখছি, সেই ঘর আমাদের দেওয়া হয় নাই। খালিও আছে কিন্তু দেয় না। আমরা ডিসি অফিসে ঘুরতেছি, আজ না কালকে দেবে বলে ঘুরানো হচ্ছে, দেয় না।

তিনি বলেন, আরও কিছু আছে যেমন মাদকের একটা সমস্যা আছে। নীরব চাঁদাবাজি চলছে। আমরা এখানে ব্যবসা করেও চাঁদা দিতে হয়।

ওই ব্যবসায়ীর কথা শুনে জামায়াত আমীর বলেন, ব্যবসায়ীদের কথা অনুযায়ী এখানে যে জিনিসটার দাম আজকে ১০ টাকা হওয়ার কথা, ব্যবসায়ীদের চাঁদা দেওয়ার কারণে তা বাড়তি দামে বিক্রি করতে হয়। যেটার ভার, বোঝা গিয়ে পড়ছে জনগণের ঘাড়ে।

জামায়াত আমীর ব্যবসায়ীদের উদ্দেশ্যে বলেন, এখন জায়গায় জায়গায় কি নীরবে চাঁদা দিয়েই যাবেন, সহ্য করবেন, নাকি বন্ধ করতে প্রতিরোধ করা লাগবে?

জামায়াত আমীর বলেন, ব্যবসায়ীরা চাইলে প্রতিরোধের জন্য আমরা প্রস্তুত আছি। সবাই প্রস্তুত হবেন, প্রস্তুত আমরা। সবাই মিলে প্রতিরোধ করবো।

তিনি বলেন, আমরা সংসদের ভেতরে বলেছি, এখানেও বলেছি। জনগণের দুঃখ কষ্টের কথা বলেছি। সামগ্রিকভাবে আমার বেশিরভাগ কথা ছিল জাতীয় জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত। এগুলো নিয়ে মাঠে নামবো, আওয়াজ তুলবো, জনগণকে সংগঠিত করবো এবং একটা সময়ের ব্যবধানে এই যন্ত্রণা থেকে আমরা জনগণকে মুক্ত করবো ইনশাল্লাহ। তাহলে জনগণ কিছুটা হলেও স্বস্তি পেয়ে যেতে পারে। সামাজিক সচেতনতা যখন বাড়বে তখন আমরা সবাই মিলে দুষ্কৃতিকারী, দুর্নীতিবাজ, চাঁদাবাজদের রুখে দিতে পারবো।