জটিলতা সৃষ্টির আশঙ্কা

সম্পত্তি হস্তান্তর আইন সংশোধন করে দু’টি ধারা সংযুক্ত করা হয়েছে। এর মাধ্যমে সম্পত্তি হেবা বা দান করার পর আমৃত্যু তা ভোগদখল করার অধিকার থাকবে দাতার। এটি একটি স্বতন্ত্র বিধান হিসেবে কার্যকর হবে। সকল সম্পত্তি দান করার পর সন্তানরা পিতা-মাতার দেখভাল না করার কারণে তাদের সম্পত্তি ভোগের সুযোগ দেয়া হয়েছে। তবে এ আইনটি কুরআন-সুন্নাহর শরীয়াহ আইনের সাথে সাংঘর্ষিক বলে তা বাতিল করার দাবি জানিয়েছে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন বিরোধী দলসহ দেশের ইসলামী সংগঠনগুলো। এটি বাস্তবায়নে জটিলতার আশঙ্কা করছেন অনেকে। তবে আইনের এ সংশোধনী শরিয়াহ আইনের সাথে সাংঘর্ষিক নয় বলে দাবি করছে সরকার।

সদ্য সমাপ্ত হওয়া তৃতীয় সংসদ অধিবেশনে ১৮৮২ সালের সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের সংশোধনী পাস করা হয়েছে। তাতে দু’টি ধারা সংযুক্ত করা হয়েছে। ধারা: ১২২এ ও ১২২বি। এতে বলা হয়েছে। ভোগাধিকারের অধিকার সংরক্ষণপূর্বক দান।—(১) এই আইন বা আপাতত বলবৎ অন্য কোনো আইনে যা কিছুই থাকুক না কেন, দাতা কর্তৃক সম্পদের জীবনকালীন ভোগাধিকার সংরক্ষণপূর্বক দান হিসেবে স্থাবর বা অস্থাবর সম্পত্তি হস্তান্তর বৈধ হবে। (২) উপ-ধারা (১)-এর অধীন দান এই শর্ত সাপেক্ষে বৈধ হবে যে, উক্ত দান কোনো পিতা-মাতা বা পিতামহ-পিতামহী/মাতামহ-মাতামহী কর্তৃক তাঁর সন্তান বা সন্তানাদি অথবা নাতি-নাতনিকে অথবা বিপরীতক্রমে, অথবা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে হতে হবে; এবং স্থাবর সম্পত্তির ক্ষেত্রে এরূপ দান, রেজিস্ট্রেশন এ্যাক্ট ১৯০৮ এর ১৭(১)(এ)-এর অধীনে নিবন্ধিত একটি দলিল সম্পাদনের মাধ্যমে এই ধারার অধীনে ঘোষণার দ্বারা সম্পন্ন করতে হবে। (৩) দাতার জীবদ্দশায় গ্রহীতার ( donee) মৃত্যু হলে, আইন অনুযায়ী সম্পত্তি গ্রহীতার উত্তরাধিকারীদের নিকট হস্তান্তরিত হবে, তবে দাতার ভোগাধিকার অব্যাহত থাকবে এবং তা সম্পত্তির সাথে সংযুক্ত থাকবে। (৪) এই ধারার অধীন কোনো হস্তান্তর এই আইনের অধীন একটি স্বতন্ত্র হস্তান্তর পদ্ধতি হিসেবে গণ্য হবে এবং তা এই আইন বা আপাতত বলবৎ অন্য কোনো আইনের অধীনে স্বীকৃত কোনো দান বা হেবা বা হস্তান্তরের অন্য কোনো পদ্ধতির বৈধতাকে সীমিত, খর্ব বা অন্য কোনোভাবে প্রভাবিত করছে বলে গণ্য হবে না।

১২২বি। ভোগাধিকারের অধিকার সংরক্ষণপূর্বক দানের রদবদল বা রহিতকরণ। (১) ধারা ১২২এ-এর অধীনে কোনো দান নিবন্ধনের পর তা আর রহিত করা যাবে না, কেবল নিম্নলিখিত ক্ষেত্রগুলো ব্যতীত—

(ক) কোনো আর্থিক, চিকিৎসা, শিক্ষাগত, পারিবারিক বা অন্য কোনো প্রকৃত প্রয়োজনীয়তা মেটাতে ধারা ১২২এ-এর অধীনে সৃষ্ট অধিকারগুলোর রদবদল, রহিতকরণ বা অন্য কোনো ব্যবস্থা গ্রহণের প্রয়োজন হলে, নিবন্ধিত দলিলের মাধ্যমে দাতা ও গ্রহীতার পারস্পরিক সম্মতিতে; অথবা

(খ) নাবালকতা, নিখোঁজ হওয়া, মানসিক অসুস্থতা, আইনি অক্ষমতা বা অন্য কোনো উপযুক্ত কারণে যেকোনো এক পক্ষের সম্মতি পাওয়া না গেলে, জেলা জজ অপর পক্ষের আবেদনক্রমে, দফা (ক)-তে উল্লেখিত কারণসমূহের ভিত্তিতে ধারা ১২২এ-এর অধীনে সৃষ্ট অধিকারের এরূপ রদবদল, রহিতকরণ বা ব্যবস্থার অনুমতি দিতে পারবেন।

(২) উপ-ধারা (১)-এর দফা (খ)-এর অধীনে কোনো আদেশ প্রদানের পূর্বে জেলা জজ— (ক) সকল স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে নোটিশ প্রদান করবেন; (খ) তিনি যেরূপ প্রয়োজনীয় মনে করেন সেরূপ তদন্ত পরিচালনা করবেন; এবং (গ) আবেদনটি সরল বিশ্বাসে করা হয়েছে মর্মে নিশ্চিত হবেন।”

বিশ্লেষক ও ইসলামী আইনজ্ঞগণ মনে করছেন, আইনের এ সংশোধনীর মাধ্যমে সাময়িক কিছুটা সুবিধা দেখা গেলেও মূলত এটি বাস্তবায়ন করতে গেলে কুরআনের বিধান লংঘন হবে। দু’একজন উত্তরাধিকার বঞ্চিত হবে। আর আইনটি বাস্তবায়নেও জটিলতার আশঙ্কা রয়েছে। যে সন্তানরা বৃদ্ধ মা-বাবাকে স্বেচ্ছায় সেবাযত্ন করবে না, আইন করে তাদেরকে বাধ্য করে সেবা আদায় করা যাবে না। উল্টো সম্পত্তির লোভে তাদের জীবন হুমকির মুখে পড়তে পারে বলেও আশ্কংা করছেন বিশ্লেষকরা। ইতোমধ্যে এ আইন নিয়ে বিভিন্ন মহলের প্রতিবাদ অব্যাহত রয়েছে। আইনটি বাস্তবায়নের আগে আলেমদের মতামত গ্রহণ করা প্রয়োজনে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মতামত নিয়ে আইনটি বাতিল করার জন্য দাবি জানিয়েছেন তারা।

এ বিষয়ে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ১২২ ধারায় ইসলামীভাবে যে আইন আছে, সেটাকে সংরক্ষণ করা হয়েছে। এইটা হলো প্রথম কথা। দ্বিতীয় হচ্ছে—১২২-এর চার ধারায় ইসলামীভাবে যে হেবা, গিফট বা অন্য কোনও মোড অব ট্রান্সফার, সেইটা এখানে সংরক্ষণ করা হয়েছে। ইসলামিক ল’-এ এখানে কোনওভাবেই শরিয়া ল’কে টাচ করা হয় নি। এটা সম্পত্তি হস্তান্তরের বিকল্প একটা পথ হিসেবে বাবা-মাকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য। যাতে সন্তানরা বাবা-মাকে শেষ জীবনে কষ্ট দিতে না পারে, সেই কারণে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য করা হয়েছে। যেটা ইসলামিক আইনে বাবা-মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা দেখানোর কথা বলা হয়েছে, সেটাই এখানে করা হয়েছে।

বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান ‘সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিল, ২০২৬’-এর বিরোধিতা করে বলেন, এই আইনটি কুরআন-সুন্নাহবিরোধী। সরকার ও বিএনপির পক্ষ থেকে কুরআন-সুন্নাহর বাইরে কোনও আইন না করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে এই বিল পাস করা হচ্ছে। দেশের প্রখ্যাত ওলামায়ে কেরামও বলেছেন, আজীবন ভোগদখলের অধিকার রেখে দানের এই বিধান ইসলামী আইনের পরিপন্থী। এতে আল্লাহর দেওয়া মিরাসি বিধানকে পাশ কাটানোর সুযোগ তৈরি হবে।

সকল সম্পত্তি হেবা বা দান করা

ইসলামী আইনে সকল সম্পত্তি হেবা বা দান করার বিধান নেই। এতে করে উত্তরাধিকার বঞ্চিত করা হয়ে থাকে। কিন্তু এ আইনের মাধ্যমে সকল সম্পত্তি দান করার একটি সুযোগ সৃষ্টি হলো। এর মাধ্যমে দু’একজন উত্তরাধিকার বিশেষ সুবিধা পাবে আবার দু’একজন উত্তরাধিকার তাদের প্রাপ্য সম্পত্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে বলে মনে করছেন আলেম সমাজ। তারা মনে করেন, হেবার বিধান হলো সম্পত্তি লিখে দেয়ার পর তার দখলও দিতে হবে। দখল হস্তান্তর ছাড়া হেবা কার্যকর হয় না। আর হেবা করার পরও দখল হস্তান্তর না করলে এটি হেবা হয় না বরং ওসিয়ত হয়।

হেফাজতে ইসলামের প্রতিবাদ

ইসলামি শরিয়া বিশেষজ্ঞদের মতামত না নিয়ে তড়িঘড়ি করে জাতীয় সংসদে ‘সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিল-২০২৬’ পাস করায় তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। সংগঠনের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী বলেন, এই বিল কুরআন ও সুন্নাহর সঙ্গে সাংঘর্ষিক। মুসলমান প্রধান আলেম-ওলামাদের এ দেশে ইসলামি শরিয়াহবিরোধী কোনো আইন গ্রহণযোগ্য হবে না। এই বিল সংশোধন করতে হবে।’ তিনি রাষ্ট্রপতিকে বিলে স্বাক্ষর না করার আহ্বান জানান।

মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী বলেন, ‘জীবনকালীন ভোগাধিকার সংরক্ষণপূর্বক দান’ নামে পিতা-মাতার কাছ থেকে সন্তানদের সম্পত্তি হস্তান্তরের নতুন এ পদ্ধতিতে দাতা মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ওই সম্পত্তি ব্যবহার ও ভোগ করতে পারবেন। দাতার মৃত্যুর আগে গ্রহীতা মারা গেলে সম্পত্তি তার ওয়ারিশদের কাছে চলে যাবে।

তিনি বলেন, নতুন এ আইনটি বাহ্যিকভাবে সুন্দর মনে হলেও এর মাধ্যমে একজন বা কয়েকজন উত্তরাধিকারীকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া এবং অন্যদের বঞ্চিত করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এর ফলে শরিয়াহসম্মত সম্পদ বণ্টন নীতি (ফারায়েজের বিধান) লঙ্ঘিত হবে।

সম্পত্তি হস্তান্তরের নতুন আইন শরিয়াহর আলোকে পুনর্বিবেচনার দাবি মামুনুল হকের

জীবনকালীন ভোগাধিকার রেখে সম্পত্তি হস্তান্তরের নতুন বিধান শরিয়াহর (ইসলামি আইন) আলোকে পুনর্বিবেচনা করা জরুরি বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক। ‘দ্য ট্রান্সফার অব প্রপার্টি (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল, ২০২৬’ সংসদে তড়িঘড়ি করে পাস করায় উদ্বেগ প্রকাশ করে এক বিবৃতিতে মাওলানা মামুনুল হক বলেন, বৃদ্ধ মা-বাবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু সেই নিরাপত্তার নামে এমন কোনো বিধান করা যাবে না, যা আল্লাহতাআলা নির্ধারিত হেবা (দান), অসিয়ত (ইচ্ছাপত্র) ও ফারায়েজের (উত্তরাধিকার বণ্টনবিধি) শরয়ি (শরিয়তসম্মত) বিধানকে পাশ কাটানোর সুযোগ সৃষ্টি করে। জীবিত অবস্থায় হেবা এবং মৃত্যুর পর ফারায়েজ অনুযায়ী উত্তরাধিকার—দুটি পৃথক বিষয়। নতুন আইন যেন কোনো ওয়ারিশকে (উত্তরাধিকারীকে) তার শরিয়াহ নির্ধারিত অধিকার থেকে বঞ্চিত করার হাতিয়ার না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।

বাস্তবায়নে জটিলতা হওয়ার আশঙ্কা

বিশ্লেষকরা বলছেন, দাতার ভোগাধিকার শুধু দাতা ও গ্রহীতার মধ্যকার বিষয় নয়। ভবিষ্যৎ ক্রেতা, ব্যাংক, ভাড়াটে, বিমা কোম্পানি এবং ভূমি প্রশাসনও এর সঙ্গে জড়িত। দাতার ভোগাধিকারের তথ্য নামজারি ও খতিয়ানে উল্লেখ করার বাধ্যবাধকতা না থাকলে একজন সম্ভাব্য ক্রেতা তা জানতে পারবেন না। গ্রহীতা তথ্য গোপন করে সম্পত্তি বিক্রি করে দিতে পারেন। তখন ক্রেতা ও দাতা পরস্পরের প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়াবেন। ক্রেতা হয়তো জানতেনই না যে সম্পত্তিতে অন্য একজনের ভোগাধিকার রয়েছে। একটি ঘটনা তখন একাধিক মামলার জন্ম দিতে পারে।

ঋণ, নিলাম ও অধিগ্রহণের জটিলতা

গ্রহীতা সম্পত্তি বন্ধক রেখে ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে চাইতে পারেন। সে ক্ষেত্রে দাতার সম্মতি লাগবে কি না, তা বলা হয় নি। ঋণ পরিশোধ না করলে ব্যাংক সম্পত্তিটি নিলামে তুলতে পারে। তখন দাতার জীবনকালীন ভোগাধিকার টিকে থাকবে কি না, সেটিও স্পষ্ট নয়। এই ফাঁকের অপব্যবহারও হতে পারে। সাজানো ঋণ ও নিলামের মাধ্যমে দাতাকে সম্পত্তি থেকে সরিয়ে দেওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। অপরদিকে সরকার সম্পত্তি অধিগ্রহণ করলে ক্ষতিপূরণ কে পাবেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। শুধু রেকর্ডে থাকা মালিক ক্ষতিপূরণ পেলে দাতা তার জীবনকালীন নিরাপত্তা হারাতে পারেন। সম্পত্তি চলে গেলেও তার বদলে পাওয়া অর্থ থাকবে। সেই অর্থে দাতার অধিকার কী হবে, তা ঠিক করা হয় নি। একই প্রশ্ন উঠবে বিমার ক্ষেত্রেও। আগুন বা প্রাকৃতিক দুর্যোগে বাড়ি নষ্ট হলে বিমার টাকা কে পাবেন? ওই অর্থ দিয়ে আবার বাড়ি তৈরি করা হবে, নাকি গ্রহীতা তা নিজের মতো ব্যবহার করতে পারবেন? আইনে এ বিষয়ে কিছু বলা হয় নি।

অধিকার আছে, কিন্তু দ্রুত প্রতিকার নেই

সংশোধনীর আরেকটি অস্পষ্ট দিক হলো, দাতার অধিকার লঙ্ঘিত হলে দ্রুত প্রতিকারের ব্যবস্থা নেই। সন্তান দাতা অর্থাৎ তারা বাবা বা মাকে বাড়ি থেকে বের করে দিলে তারা কোথায় যাবেন? কোন আদালতে মামলা করবেন? কত দিনের মধ্যে মামলার নিষ্পত্তি হবে? দ্রুত দখল ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য আদালত কোনো অন্তর্বর্তী আদেশ দিতে পারবেন কি না—এসবের কিছুই স্পষ্ট নয়। সাধারণ দেওয়ানি মামলা শেষ হতে অনেক বছর লাগতে পারে। এরপর আপিলের সুযোগ থাকলে বিরোধ আরও দীর্ঘ হবে। জীবনকালীন অধিকার রক্ষার মামলা যদি দাতার মৃত্যুর পর নিষ্পত্তি হয়, তাহলে সেই অধিকার বাস্তবে কোনো কাজে আসবে না বরং উল্টো জটিলতা সৃষ্টি হবে।