দেশে হু হু করে বাড়ছে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা। গতকাল প্রায় দুই হাজার রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। একদিনে আরও ৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। বিশ্লেষকরা আগামি দুই মাস ডেঙ্গু পরিস্থিতি অবনতির আশঙ্কা করছেন। যার পরিণতি ভয়াবহ আকার ধারণ করবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছেন। বাংলাদেশে সাধারণত বর্ষা পরবর্তী সময়কে, অর্থাৎ অগাস্ট থেকে অক্টোবরকে ডেঙ্গুর 'পিক সিজন' বা ডেঙ্গু সংক্রমণের ঝুঁকিপূর্ণ মৌসুম বলা হয়। অন্যান্য বছরের মতো এ বছরও এই সময়ে ডেঙ্গু পরিস্থিতি খারাপ হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছিলো। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরও বেশি খারাপ হবে।
পরিসংখ্যান বলছে, গত ২৪ ঘন্টায় হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এক হাজার ৭৩৩ জন; যা চলতি বছর একই দিনে সর্বোচ্চ হাসপাতালে ভর্তির রেকর্ড। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোলরুম থেকে পাঠানো ডেঙ্গু বিষয়ক এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর মধ্যে বরিশাল বিভাগে ১৯১ জন, চট্রগ্রাম বিভাগে ১৯১ জন, ঢাকা বিভাগে সিটি কর্পোরেশনের বাইরে ৩৮৮ জন, ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন ১৭০ জন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনে ১৪৩ জন, খুলনা বিভাগে ৩০২ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে ১১০ জন, রাজশাহী বিভাগে ১৪৫ জন, রংপুর বিভাগে ৮৬ জন এবং সিলেট বিভাগে সাতজন রয়েছেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, চলতি বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সারাদেশে মোট ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৫৩ হাজার ৫৭০ জন। চলতি বছরে এ যাবত মোট ৪৯ হাজার ৩৭৫ জন ডেঙ্গুরোগী হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র পেয়েছেন।
বর্তমানে হাসপাতালে এক হাজার ২৮২ জন চিকিৎসাধীন আছেন। ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছে এক লাখ দুই হাজার ৮৬১ জন এবং ডেঙ্গুতে মোট ৪১৩ জনের মৃত্যু হয়। ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছে এক লাখ এক হাজার ২১৪ জন এবং ডেঙ্গুতে মোট ৫৭৫ জনের মৃত্যু হয়।
এদিকে চলতি বছর জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মৃতের সংখ্যা ইতোমধ্যে একশো ছাড়িয়েছে। বাড়ছে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যাও। এর আগে অগাস্টের শুরু থেকেই দেশে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা দ্রুত বাড়তে দেখা যায়। এখন হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা আড়াই হাজার ছাড়িয়ে যাওয়ার পাশাপাশি শতাধিক মৃত্যুতে প্রশ্ন উঠছে, বাংলাদেশের ডেঙ্গু পরিস্থিতি আসলে কতটা উদ্বেগজনক ?
পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছর শুধু অগাস্টেই ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে সাড়ে ২০ হাজার মানুষ। আর সেপ্টেম্বর শুরু হতে না হতেই সংখ্যাটি প্রায় দেড় হাজার ছুঁই ছুঁই। সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছে ঢাকা বিভাগে। ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনসহ পুরো বিভাগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা দশ হাজারের কাছাকাছি।
চলতি বছরের মধ্যে ডেঙ্গুতে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে অগাস্টে ৪৩ জন, এর আগে জুলাইতে ৩৬ জন। কিন্তু সেপ্টেম্বরের শুরুর দিনেই ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন পাঁচজন। তাদের দু'জন-ই ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায়। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকা, ময়মনসিংহ ও চট্টগ্রাম বিভাগেও কয়েকজন মারা গেছেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ঢাকার বাইরের জেলাগুলোর মাঝে গাজীপুর জেলা ডেঙ্গুর উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে, এরপরেই নারায়ণগঞ্জ। এই দুই জেলায় আক্রান্তের সংখ্যা হাজারের আশেপাশে। এর বাইরে ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, খুলনা, বাগেরহাট, বরিশাল, ঝালকাঠী, পিরোজপুর জেলাগুলোতে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি। জেলাগুলোর কোথাও কোথাও আক্রান্তের সংখ্যা হাজারের কাছেকাছি, কোথাও আবার প্রায় দেড় বা দুই হাজার।
এবার এক মাসে, মানে শুধু সেপ্টেম্বরেই ৩০ হাজারের বেশি মানুষ হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হতে পারে" বলে ধারণা করছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক কবিরুল বাশার। আক্রান্তের সংখ্যা বাড়লে স্বাভাবিকভাবেই মৃত্যুর সংখ্যাও বাড়বে। শুধু তাই নয়, অক্টোবরেও আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার কাছাকাছি থাকবে বলেও জানান এই অধ্যাপক। তিনি বলেন, জানতে চাইলে অধ্যাপক বাশার বলেন, "জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রতিদিন মশা, লার্ভা ইত্যাদির ওপর একটি সার্ভেইল্যান্স করি আমরা। আমরা ট্র্যাপও ব্যবহার করি। এই সার্ভেইল্যান্সে আমরা দেখেছি, এডিস মশার ঘনত্ব ডেঙ্গু ছড়ানোর জন্য উপযোগী মাত্রায় আছে।
এদিকে, রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) পরিচালক ডা. কাজী আহমেদ জাকী বলেন, "ডেঙ্গু নিয়ে এখনই আমরা উদ্বেগজনক অবস্থায় আছি। দিনদিন আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে।
গবেষনা বলছে চলতি বছর এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীর ৬২ শতাংশ-ই পুরুষ, নারী ৩৮ শতাংশ। মৃত্যুর ক্ষেত্রে আবার পুরুষের তুলনায় নারীদের হার বেশি। গতকাল পর্যন্ত যারা মারা গেছেন, তাদের প্রায় ৫৭ শতাংশ নারী, পুরুষের মৃত্যুর হার ৪৩ শতাংশের মতো। এর আগেও দেখা গেছে যে ডেঙ্গুতে আক্রান্তের দিক থেকে পুরুষ এগিয়ে ছিল। বাংলাদেশের নারীদের চেয়ে পুরুষদের শরীরে অনাবৃত অংশ বেশি থাকায় মশা দংশন করার সুযোগ বেশি পায়। এর বাইরে আরেকটি কারণ হলো, এখনো বাংলাদেশে কর্মজীবী নারীর সংখ্যা পুরুষদের চেয়ে কম। সেক্ষেত্রে যেহেতু ঘরের কাজে পুরুষের তুলনায় নারীর অংশগ্রহণ বেশি, তাই নারীদের ঘরের বাইরে বের হতে হয় কম। কিন্তু ঘরে বেশি থাকলেও নারীরাও একইভাবে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হচ্ছেন। তবে তা হিসেবে আসছে না।
বিশেষজ্ঞরা এও মনে করেন, বাংলাদেশে সাধারণত সরকারি হিসেবে যে পরিমাণ রোগী পাওয়া যায়, তা মূলত মোট আক্রান্তদের খুব কম একটি অংশ। অধ্যাপক বাশার বলছেন, প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা সরকারি হিসাবের অন্তত ছয় গুণ বেশি। সাধারণত খুব বেশি জটিলতা দেখা না দিলে অনেকেই হাসপাতালে আসেন না। তাই, আমরা আসলে 'টিপ অব দ্য আইসবার্গ'টাই দেখতে পাই। এটাকে 'আইসবার্গ ফেনোমেনন' বলা হয়। পানির নিচে আইসবার্গের যে বড় অংশটি থাকে, সেটি আমাদের রিপোর্টের বাইরে থেকে যায়।"
কীটতত্ত্ববিদ কবিরুল বাশার মনে করেন, "আমরা সাধারণভাবে মশা নিয়ন্ত্রণ করছি, কিন্তু এডিস মশা অন্য মশার মতো নয়। এর আচরণ ও প্রজননের ধরন সম্পূর্ণ আলাদা। তাই, শুধু মশাকে লক্ষ্য করে নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম চালালে হবে না, এডিস মশাকে সুনির্দিষ্টভাবে লক্ষ্য করে ব্যবস্থা নিতে হবে। এখানেই আমাদের ভুল হচ্ছে।