আজ ১৫ই সেপ্টেম্বর। আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবস। ফ্যাসিবাদী শাসনের কবল থেকে মুক্ত হয়ে বাংলাদেশে এখন গণতন্ত্রের স্বাদ ভোগ করছে। সংসদে ও রাজপথে বিরোধীদল অবাধে কথা বলতে এবং রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করতে পারছে। এতদিন পর তাদের মালিকানা ফিরে পেয়েছে। বছরের পর বছর গণতন্ত্র থেকে বঞ্চিত থাকার পর জনগণ এখন গণতন্ত্রের প্রকৃত মূল্য অনুধাবন করতে পারছে।

তবে বাংলাদেশের বর্তমান গণতান্ত্রিক পথচলার ইতিহাস সহজ ছিল না। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে শেখ হাসিনার প্রায় ১৬ বছরের স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটে। তার শাসনামলে দীর্ঘ সময় ধরে দমন-পীড়ন ও রক্তক্ষয়ী রাজনৈতিক ইতিহাসের সাক্ষী ছিল এই দেশ। শেখ হাসিনার শাসনামলে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো ক্রমান্বয়ে দুর্বল হয়ে পড়েছিল; তলানিতে ঠেকেছিল রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও জনআস্থা। নির্বাচনগুলো বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছিল। বিরোধী রাজনীতি ছিল প্রচণ্ড চাপের মুখে। তার ওপর গণমাধ্যমের ওপর ছিল কঠোর নিষেধাজ্ঞা। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো জনগণের বদলে রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলে ব্যবহৃত হচ্ছিল।

হাসিনার আমলে বিরোধী দলগুলোর নেতাকর্মীরা গ্রেফতার, মিথ্যা মামলা, সভা-সমাবেশে বাধা ও রাজনৈতিক সহিংসতার শিকার হয়েছে। বিএনপির দাবি অনুযায়ী, প্রায় দেড় লাখ নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে ৬০ লাখের কাছাকাছি মামলা দায়ের করা হয়। রাজনৈতিকভাবে প্রভাব খাটিয়ে অনেক বিরোধী নেতাকে দীর্ঘমেয়াদী কারাদণ্ড ও মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস)-এর গবেষণা অনুযায়ী, ২০১৯ সাল থেকে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অন্তত ৪ হাজার ৫২০ জনকে এই আইনের আওতায় অভিযুক্ত করা হয় এবং অন্তত ৯৭ জন সাংবাদিককে গ্রেফতার করা হয়েছে।

ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার শাসনামলে গণমাধ্যমের ওপরও অব্যাহত চাপ ছিল। আমার দেশ, দৈনিক দিনকাল, দিগন্ত টিভি, ইসলামিক টিভি ও চ্যানেল ১-এর মতো বেশ কিছু গণমাধ্যম বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকারও কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও নিরাপত্তা বাহিনীর নির্যাতন ছিল নিত্যনৈমিত্তিক। সরকারি তদন্ত কমিশন ২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ১ হাজার ৫৬৯টি গুমের অভিযোগ পেয়েছে; যার মধ্যে ২৫১ জন এখনও নিখোঁজ রয়েছেন। মৃতদেহ উদ্ধার হয়েছে ৩৬ জনের। ‘আয়নাঘর’ ছিল তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে আতঙ্কের নাম। চব্বিশের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে ভারতে পালিয়ে যান। কোটি কোটি বাংলাদেশির জন্য দিনটি ছিল একদিকে স্বৈরাচারের পতন এবং নতুন বাংলাদেশের সূচনার।

দেশ এখন রাজনৈতিক ভয়ের সংস্কৃতি থেকে গণতান্ত্রিক আশার আলোয় ফিরছে। তবে যাত্রা এখনও শেষ হয়নি, সামনে চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তবে লক্ষ্য স্পষ্ট, তাই নির্বাচন এখন অর্থবহ। বিরোধী রাজনীতির দাবি-দাওয়া জানানোর অধিকার ফিরে এসেছে। রাজনৈতিক ক্ষমতার বদল হচ্ছে ভোটের মাধ্যমে। আর দায়িত্ব নেওয়া নতুন নেতৃত্ব সরলতা, সহনশীলতা ও সংযমকে শাসনের গুণ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে।

গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান বিরোধীদলীয় নেতার : আজ ১৫ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবস উপলক্ষে জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান এক বিবৃতিতে দেশবাসীর প্রতি গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়েছেন।

গতকাল সোমবার দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, গণতন্ত্র কেবল সরকার গঠনের সাময়িক কোনো প্রক্রিয়া নয়; এটি মানুষের মৌলিক অধিকার, সামাজিক ন্যায়বিচার, বাকস্বাধীনতা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার প্রধান ভিত্তি। গণতন্ত্র সুরক্ষিত থাকলে একটি সমাজ স্বৈরাচার, শোষণ ও বৈষম্য থেকে মুক্ত হয়ে অগ্রগতির পথে এগিয়ে যেতে পারে।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকার গণতন্ত্রের কবর রচনা করেছে। জনগণ ভোটাধিকার, ন্যায়বিচার, সামাজিক সুরক্ষা ও মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছে। তবে ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার একটি ঐতিহাসিক সুযোগ তৈরি করেছে। নির্বাচনের আগে বিএনপি গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও ক্ষমতায় এসে তারা সে প্রতিশ্রুতি ভুলে গেছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ দীর্ঘ ত্যাগ ও সংগ্রামের ইতিহাস বহন করছে। এ দেশের মানুষ বারবার রক্ত দিয়ে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার পুনরুদ্ধার করেছে। কিন্তু স্বৈরাচারী মনোভাব ও ক্ষমতার অপব্যবহারের কারণে বিভিন্ন সময়ে জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করা হয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটেই দেশের ছাত্র-জনতা বুকের তাজা রক্ত দিয়ে জুলাই বিপ্লব সংঘটিত করেছে। এ বিপ্লব ব্যর্থ হতে দেওয়া যাবে না। যে কোনো মূল্যে বৈষম্যমুক্ত ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে।

বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ইনসাফ, সততা ও মানবিক মূল্যবোধনির্ভর বৈষম্যমুক্ত সমাজ গঠনে গণতন্ত্রের কোনো বিকল্প নেই। আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবসে গণতন্ত্রকে সুসংহত ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে জামায়াতে ইসলামী দেশবাসীর কাছে অঙ্গীকার ব্যক্ত করছে। সমতা, আইনের শাসন, নাগরিক অধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠায় দলটি কাজ করে যাচ্ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

তিনি আরও বলেন, জাতিকে আর কোনোভাবেই গুম, খুন ও ক্রসফায়ারের মতো অভিশাপের দিকে ঠেলে দেওয়া যাবে না। গণভোটের রায় বাস্তবায়নের মাধ্যমে প্রশাসনকে সংকীর্ণ দলীয়করণ থেকে মুক্ত করতে হবে। ঘুষ-দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্বমুক্ত দেশ গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে শাসনব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও সত্যিকারের গণমুখী করার অঙ্গীকার করতে হবে।

বৈষম্যমুক্ত মানবিক বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া, ন্যায্য নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করা এবং যেকোনো ধরনের অন্যায়ের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ ভূমিকা পালনের জন্য দেশের সর্বস্তরের মানুষের প্রতি আহ্বান জানান ডা. শফিকুর রহমান।