জুলাইয়ের দেনা-পাওনা নিয়ে কথা বলেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নির্বাহী পরিষদ সদস্য মো. মোবারক হোসাইন। ২০২৪ ইং সালের জুলাই আন্দোলনের সময় জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে তিনি আন্দোলনে হতাহতদের চিকিৎসা দেওয়ার সমন্বয়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। আলাপকালে তিনি জানিয়েছেন, সেই কঠিন সময়ের দায়িত্ব পালনের কৌশলের কথা। তিনি দৈনিক সংগ্রামকে জানান, জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়ে জামায়াতে ইসলামী আন্দোলনের বিভিন্ন সেক্টরে শীর্ষ নেতাদের দায়িত্ব ভাগ করে দেয়। তিনি বলেন, জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল জানালেন চিকিৎসার দায়িত্ব পালন করতে হবে আমাকে। আমার সাথে ডাক্তারের টিম থাকবে। দায়িত্ব পালনকালে আমার সাথে ছিলেন ইসলামী ছাত্রশিবিরের ছাত্র কল্যাণ সম্পাদক। আমরা যোগাযোগ করে জুলাইয়ের ১৮ তারিখে ডাক্তারদের নিয়ে একটি টিম তৈরি করি। আর সেদিন থেকেই আমাদের চিকিৎসা কার্যক্রম শুরু হয়। দায়িত্ব পাওয়ার সাথে সাথেই আমরা বেশ কিছু হাসপাতালকে টার্গেট করি। সেই হাসপাতালগুলোতে আমরা রোগী ভর্তি করি। ১৯ জুলাই হাসপাতালগুলো পর্যবেক্ষণ করে আমরা লক্ষ্য করলাম, গুলীবিদ্ধ রোগী ট্রান্সফার হতে পারছিল না পুলিশের কড়া নজরদারির কারণে। আন্দোলনকারীদের মধ্যে বিপুলসংখ্যক মানুষ চোখে গুলীবিদ্ধ অবস্থায় এবং বিভিন্নভাবে চোখে আঘাতপ্রাপ্ত রোগী আসতে থাকে। আমরা প্রথমে দুই-তিনটি হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য পাঠাতে থাকি। আমি বিশেষভাবে ভিশন আই হাসপাতালকে ধন্যবাদ জানাই, সেখানকার ডাক্তাররা ওই সময় অনেক আন্তরিকতার সাথে সেবা দিয়েছেন। আমরা প্রতিদিন অনেকগুলো রোগীকে অপারেশনের জন্য সেখানে পাঠিয়েছি। তারা কোনরকম আপত্তি ছাড়াই রোগীদের সেবা দিয়েছেন।
জুলাইয়ের ১৯ তারিখ যখন ইন্টারনেট স্লো করে দেওয়া হলো তখন আমরা প্রথম প্রথম সমন্বয় করতে পারছিলাম না। এদিকে আমরা বিভিন্ন জায়গাতে যেসব রোগী ভর্তি করেছিলাম তাদের চিকিৎসার জন্য টাকার প্রয়োজন ছিল। কেন্দ্রীয় অফিসে খবর পাঠাই কিন্তু টাকা যে আমাদের কাছে পাঠাবে সেটা পারা যাচ্ছিল না। তখন আমরা বিভিন্নজনের কাছ থেকে ধারকর্জ করে ২০ জুলাই পর্যন্ত চালাই। এক্ষেত্রে বিশেষায়িত একটি হাসপাতাল রোগী ভর্তির ক্ষেত্রে প্রাধান্য দিয়েছিল। তারা পয়সার ক্ষেত্রে খুব বেশি চাহিদা দেখায়নি। ২১ এবং ২২ জুলাই, বিশেষ করে ২২ জুলাইয়ের অবস্থা ছিল খুবই ভয়াবহ। ৪/৫ হাসপাতালে আহত রোগী ভর্তি করে কুল কিনারা করা যাচ্ছিল না। ওই সময়টায় গুলীবিদ্ধ রোগী বেশি আসছিল। আমার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী যাত্রাবাড়ী এলাকা থেকে বেশি আসছিল। উত্তরা থেকেও রোগী আসছিল। মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ডে তখন রণক্ষেত্র। অবস্থা এমন পর্যায়ে চলে যায় যে হাসপাতালগুলো রোগী ভর্তি করতে অপারগতা প্রকাশ করে। হাত জোড় করে মাফ চাচ্ছিল। কারণ তখন ওই হাসপাতালগুলোতে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ব্যাপক নজরদারি করা শুরু হয়। আর আমরা যারা রোগী আনা-নেওয়া করছিলাম তারাও টার্গেটে পরে যাই।
২২ জুলাই মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ডে ধানমন্ডিতে হাসপাতালের সামনে বড় ধরণের ম্যাসাকার হয়। আমরা তখন এ্যাম্বুলেন্স ব্যবহার করে আহতদের সেবা দিয়েছিলাম। ওই সময়টাতে আমরা বেশি গুরুত্ব দিতাম যাদের চিকিৎসা দিচ্ছি তারা যেন কোনভাবেই গোয়েন্দা সংস্থা জানতে না পারে। সেই কঠিন সময়গুলোতে ভিশন আই হাসপাতালে বিপুল সংখ্যক রোগীকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। আমরা খবর পাই যে যাত্রাবাড়িতে সবচেয়ে বেশি মানুষ গুলীবিদ্ধ হয়েছে। কিন্তু সেখান থেকে রোগী আনাটা ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। এভাবেই ঝুঁকি নিয়ে আমরা কাজ করছিলাম। ২২ তারিখ রাত ১২টার দিকে আমি গ্রেফতার হই।
জুলাইয়ের দেনা-পাওনা নিয়ে এই প্রবীণ রাজনীতিক দৈনিক সংগ্রামকে বলেন, ফ্যাসিস্ট সরকারের কবল থেকে দেশকে মুক্ত করার জন্য কোনরকম প্রতিদান প্রাপ্তির আশা ছাড়াই শহীদেরা জীবন দিয়েছে; ছাত্র-জনতা আপামর জনগণ আন্দোলনে রাস্তায় নেমেছে। এটাই জুলাইয়ের প্রাপ্তি। বিপ্লব আর অভ্যুত্থান যা-ই বলেন, জুলাই কিন্তু কোন মাস না। জুলাই, জুলাই-ই। জুলাই একটি জাতিকে বাঁচতে শিখিয়েছে। জুলাই জাতিকে নতুন করে স্বাধীনতার স্বাদ দিয়েছে। কিন্তু পাওনার ক্ষেত্রে এসে বলতে হয় এই শহীদদের পরিবার আজও আমাদের সাথে যোগাযোগ করে। শহীদের মা এবং স্ত্রীরা কি যে আহাজারি তাদের। ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। যারা দুনিয়া থেকে চলে গেছেন তাদের একটা দিক। তার প্রতিদান আল্লাহর কাছে পাবেন। কিন্তু অসংখ্য তরুণ পঙ্গুত্ব নিয়ে বেঁচে আছে। আহতরা সবচেয়ে বেশি অসুবিধায়। অন্যদিকে জুলাইয়ের ওপর ভর করে ক্ষমতায় এসে বর্তমান সরকার জুলাইকে ভুলে গেছে বলে মনে হচ্ছে। জুলাইকে তারা কেয়ার করছে না। শহীদদের নিয়ে ঠাট্টা মশকরা করা হচ্ছে। আহতদের বলা হচ্ছে তারা শুধু চায় আর চায়। আরে তারা চাইবে না কেন ? তাদের চাওয়ার-ই তো কথা। যে মা তার সন্তান হারিয়েছে, যে স্ত্রী তার স্বামী হারিয়েছে, আমি একজন স্ত্রীর কথা বলবো- তাকে আমি সহযোগিতা করতে গিয়েছিলাম। তিনি কাঁদতে ছিলেন। বলতে ছিলেন তার পেটে বাচ্চা। বাচ্চার কি হবে। আমি শহীদের স্ত্রীকে আশ্বস্ত করলাম যে আমীরে জামায়াত বলেছেন যে শহীদের যেকোন দেনা পাওনা আমরা শোধ করার চেষ্টা করবো সাধ্য অনুযায়ী। আপনার বাচ্চার দায়িত্ব আমরা নিলাম এবং আলহামদুলিল্লাহ আমরা সেই দায়িত্ব পালন করছি। আমীরে জামায়াত থাইল্যান্ডে গিয়েও সেখানকার হাসপাতালে চিকিৎসার খোঁজ নিয়েছেন। তিনি বলেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আমরা জুলাই আহতদের বিদেশে চিকিৎসার জন্য চাপ দিয়েছি এবং অনেককে পাঠিয়েছে। এখন এই সরকারের সময় কাউকে পাঠানো হচ্ছে কি-না। জানানো হলো- এখন আর কাউকে পাঠানো হয়নি। তারা আজ মানবেতর জীবন যাপন করছে। আমি মনে করি তারা কেউ কোন পাওনার জন্য শহীদ হয়নি। আন্দোলনে যায়নি। তারা ফ্যাসিস্ট সরকারকে সরানোর জন্যই আন্দোলনে যোগ দিয়েছে। আজ তারা দেখছে যে আরেকটা ফ্যাসিস্ট মাথাচাড়া দিচ্ছে। এটাই তাদের কষ্ট। তাদের চাওয়া হচ্ছে আর কোন ফ্যাসিস্ট যেন বাংলাদেশে চেপে না বসে।
জুলাই থেকে কি শিক্ষা নেওয়া দরকার এমন প্রশ্নে মোবারক হোসাইন বলেন, জুলাইয়ের শিক্ষা হচ্ছে ফ্যাসিস্ট তো টিকে নেই। ১৫ বছরেও ফ্যাসিস্ট টিকেনি। কি ছিল না ফ্যাসিস্টদের ? পুরো প্রশাসন, সেনাবাহিনী থেকে সব তাদের ছিল। পেছনে একটা বৃহৎ শক্তি তাদের পেছনে ছিল। কিন্তু জুলাই কাউকে কেয়ার করেনি। আর কেয়ার না করার কারণে এতো বজ্র আঁটনি থাকার পরও ফসকা গেরোর মতো তাকে চলে যেতে হয়েছে। আবারো যদি এরকম কেউ হতে চায়; জুলাই ছাড় দিবে না ইনশা আল্লাহ। জুলাই আবারো আসবে।
জুলাইয়ের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর এই সিনিয়র নেতা বলেন, আমি ২২ জুলাই গ্রেফতার হই। ২৬ তারিখ আমাকে আদালতে প্রেরণ করা হয়। এই ৫দিন আমাকে আয়নাঘরে রাখা হয়। ২৬ জুলাই আমাকে কোর্টে তোলা হলে রিমান্ড দেয়। সকাল ৯টার সময় আমাকে জানানো হয় আপনার স্ত্রী এসেছেন। আমার মনে হলো এটা একটা ফাঁদ হতে পারে। আমাকে নিয়ে যাওয়া হলো। গিয়ে দেখি ঠিক আমার স্ত্রী এসেছেন। পরে জানতে পেরেছিলাম যে এটা একটা ফাঁদ-ই ছিল। তারা মনে করেছিল আমার স্ত্রী এলে ড্রাইভারকে সাথে করে নিয়ে আসবেন। তারপর ড্রাইভারকে আটক করে আমি কোথায় কোথায় যোগাযোগ রাখি সেটা বের করে ফেলবে। এমন চিন্তা ছিল। আমার স্ত্রী চলে যাওয়ার পর আমাকে একটি রুমে নিয়ে যাওয়া হলো। আমাকে বলা হলো-- এখন সকাল ১০টা বাজে। রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত আপনি এখানেই থাকবেন। এখানেই জিজ্ঞাসাবাদ হবে আপনার। ঠিক প্রশ্নের জবাব দিবেন। উল্টাপাল্টা করলে কিন্তু সমস্ত মেকানিজম এখানে করা আছে। এরমধ্যে যোহরের নামায আসর- মাগরিবের নামায যেখানে আপনি আছেন, পড়ে নিবেন। আমি তাদের দ্বারা এতোটাই নির্যাতিত ছিলাম যে, মাগরিবের সময় আমি জ্ঞান হারাই। তারপর তারা আমাকে পুলিশ হাসপাতালে নেয়। সেখানে আমাকে রাখেনি। এরপর হৃদরোগ হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানকার ডাক্তাররা আমাকে দেখে চমকে গেলেন। তারপর আমাকে সিসিইউতে রাখলেন। আসলে ওই সময়টাতে জীবনের আশা ছেড়েই দিয়েছিলাম। সে সময় আমার স্ত্রী এবং পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে রাখি। এভাবে ৫দিন যাওয়ার পর ১ আগস্ট যেদিন জামায়াত শিবিরকে নিষিদ্ধ করা হয় সেদিন কোর্টে না নিয়ে কোন রকমে গারদে নিয়ে আসে। এরপর আমাকে কারাগারে পাঠিয়ে দেয় একজন নিষিদ্ধ দলের সদস্য হিসেবে। কারাগারে কেটে যায় আরও ৪ দিন। ৫ আগস্ট বেলা ১২টা ৪০ মিনিট বা ৪৫ মিনিটের দিকে আমি একা একরুমে অবরুদ্ধ অবস্থায় আছি। একজন কারারক্ষী এসে বলছে যে, স্যার হাসিনা পালাইছে। আমি তাকে ধমক দিলাম। আমার কাছে অবিশ্বাস্য মনে হয়েছে। আমার ধমকে কারারক্ষী চলে গেল। এরপর আমি জোহরের নামায পড়লাম এবং খাওয়াদাওয়া করলাম। একটু রেস্ট করতে যাবো এমন সময় সেই কারারক্ষী আবার এসে বললো স্যার এবার কিন্তু দেখে আসছি। জানতে চাইলাম কি হয়েছে ? হাসিনা পালাইছে স্যার। তার কথা শুনে আল্লাহু আকবার বলে একটা চিৎকার দিলাম। এরপর আমি অজু করে দুই রাকাত নামায পড়লাম। খুব কাঁদলাম আল্লাহর কাছে। বললাম, তোমার ইচ্ছাতেই সব হয়েছে।