আমরা হিরক রাজার কথা শুনেছি, এখন আবার শুনছি পাগল রাজার কথা। এই রাজা আবার কোনো সাধারণ দেশের রাজা নন। সেরা দেশের এই রাজাকে প্রেসিডেন্ট বলা হয়। কিন্তু তার কথাবার্তা, আচার-আচরণ অনেক সময়ই প্রেসিডেন্টসুলভ মনে হয় না, বরং মনে হয় অস্বাভাবিক ও উদ্ভট। ফলে তার ওপর বিশ্বের বহু মানুষ বিরক্ত, বিরক্ত স্বদেশের বিদগ্ধ বুদ্ধিজীবী এবং রাজনীতিবিদরাও। এঁদের একজন আমেরিকার আইনসভা কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ সিনেটের স্বতন্ত্র সদস্য বার্নি স্যান্ডার্স। সিনিয়র এই রাজনীতিবিদ প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ছেড়ে কথা বলেন না। সম্প্রতি বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালিকে ট্রাম্প নিজের নামে নামকরণের ইচ্ছা প্রকাশ করায় এক হাত নিয়েছেন তিনি। বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স ট্রাম্পকে বলেন, ‘আপনি পাগল রাজা নন, প্রেসিডেন্ট। সে অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করুন। স্যান্ডার্স বলেন, ‘আমেরিকার জনগণ চায় না আপনি হরমুজ প্রণালির নাম আপনার নামে বদলে ফেলুন। তারা চায় ইরানের সঙ্গে আপনার অবৈধ যুদ্ধের অবসান, যার ফলে ডিজেলের দাম গ্যালনপ্রতি ৫.৬৯ ডলার ও গ্যাসের দাম গ্যালনপ্রতি ৪.১২ ডলারে দাঁড়িয়েছে।
উল্লেখ্য, আমেরিকার ইতিহাসে ‘পাগল রাজা’ বলতে বৃটেনের তৃতীয় জর্জকে বোঝানো হয়। তার বিরুদ্ধে ১৮ শতকে আমেরিকার কলোনির বাসিন্দারা বিদ্রোহ করেছিল। ওই বিদ্রোহের পথ ধরেই বৃটিশ সাম্রাজ্য থেকে স্বাধীনতা লাভ করে আমেরিকা। সেই আমেরিকা ছয় মাসের বেশি সময় ধরে আগ্রাসন অব্যাহত রেখেছে ইরানে। সংঘাতে আমেরিকার বিপুল অর্থ ও গোলা-বারুদ খরচ হয়েছে। নিহত হয়েছে ১৮ সেনা। যুদ্ধের কারণে বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দামও ব্যাপকহারে বেড়ে গেছে। এতে মানুষ ক্ষুব্ধ ও বিরক্ত। তবে যুদ্ধের এই বিপুল ক্ষতিকে ‘খুব গুরুত্বপূর্ণ নয়’ (স্মল পটেটোস) বলে মন্তব্য করেছেন ট্রাম্প। শুক্রবার হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এমন মন্তব্য করেন তিনি। ট্রাম্প বলেন, ‘এটি বড় কোন বিষয় নয়। আমরা ভেনেজুয়েলায় যা করেছি, এখানেও তা করেছি। ভেনেজুয়েলায় আমরা কাউকে হারাইনি। এখানে আমরা ১৮ জনকে হারিয়েছে।’ সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প যা বললেন তাতে বিস্মিত হতে হয়। একজন প্রেসিডেন্ট কি করে এভাবে কথা বলেন? তার সামনে কি দেশের সংবিধান নেই, জাতিসংঘ নেই, মানবাধিকার নেই, অন্যদেশের কোনো মর্যাদা নেই, স্বাধীনতার কোনো মূল্য নেই? বৃটেনের পাগলা রাজা তৃতীয় জর্জের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেই তো আমেরিকাকে স্বাধীন হতে হয়েছিল। এ কথা একজন প্রেসিডেন্ট ভুলে যান কেমন করে? ট্রাম্প কোন বিবেচনায় বলেন যে— আমরা ভেনেজুয়েলায় যা করেছি, ইরানেও তা করছি। এটা কি অহংকার করার মত কোনো কাজ হলো, নাকি কাণ্ডজ্ঞানের অভাব লক্ষ্য করা গেল? এ কারণেই হয়তো সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স ট্রাম্পকে লক্ষ্য করে বললেন— ‘আপনি কোনো পাগল রাজা নন, প্রেসিডেন্ট। সেই অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করুন।’ যুদ্ধের কারণে জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি ও জনদুর্ভোগের প্রসঙ্গে এনে স্যান্ডার্স ট্রাম্পকে আরো বলেন, আমেরিকার জনগণ ইরানের সঙ্গে আপনার অবৈধ যুদ্ধের অবসান চায়। এখন প্রশ্ন হলো, এই যুদ্ধটা যে একটা অবৈধ ও অন্যায় যুদ্ধ তা বোঝার মতো বিবেচনাবোধ ট্রাম্পের মধ্যে অবশিষ্ট আছে কী? তিনি তো ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে তুলে নেওয়ার ঘটনা নিয়ে এখনো অহংকার করেন এবং উদাহরণ হিসেবে পেশ করেন। পাড়ার অশিক্ষিত ও বেকার যুবকরা যে কাজ করতে পারে, মাস্তানির সেই কাজটা আমেরিকার মত একটি দেশের প্রেসিডেন্ট কি করে করেন? এ কারণেই হয়তো সিনেটর স্যান্ডার্স বাধ্য হয়ে বললেন—আপনি তো কোনো পাগল রাজা নন, প্রেসিডেন্ট। প্রেসিডেন্ট হিসেবেই দায়িত্ব পালন করেুন। কাত সেই দায়িত্ব পালনে ট্রাম্প এগিয়ে আসেন কিনা, সেটাই এখন দেখার বিষয়।