বাংলাদেশে আইন নিয়ে বিতর্ক নতুন কোনো বিষয় নয়। কোনো আইন মানুষের অধিকার রক্ষার নামে আসে, কোনো আইন আসে প্রশাসনিক সংস্কারের কথা বলে, আবার কোনো আইনকে সামনে আনা হয় সামাজিক বাস্তবতার পরিবর্তনের যুক্তিতে। কিন্তু কিছু কিছু আইন ও নীতিগত উদ্যোগ এমন জায়গায় গিয়ে স্পর্শ করে, যেখানে বিষয়টি আর নিছক প্রশাসনিক বা আইনি থাকে না; সেটি মানুষের বিশ্বাস, পারিবারিক কাঠামো, উত্তরাধিকারব্যবস্থা এবং দীর্ঘদিনের সামাজিক মূল্যবোধের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়ে যায়। সম্প্রতি সম্পত্তি হস্তান্তর আইন নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, সেটিকে সে বৃহত্তর বাস্তবতার বাইরে দেখলে বিষয়টির গভীরতা বোঝা কঠিন।

গত ৬ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে সম্পত্তি হস্তান্তর আইন, ২০২৬ পাস হয়েছে। সংশোধনীর মাধ্যমে সম্পত্তি দানের পরও দাতার আজীবন ভোগদখলের অধিকার সংরক্ষণের একটি নতুন আইনি ব্যবস্থা যুক্ত করা হয়েছে। সরকার বলছে, এর উদ্দেশ্য হলো বিশেষ করে বাবা-মা বা অন্যান্য দাতাকে সম্পত্তি হস্তান্তরের পরও জীবদ্দশায় সম্পত্তি ভোগের অধিকার নিশ্চিত করা। কিন্তু বিরোধী দলের অভিযোগ—এ নতুন ব্যবস্থা মুসলিম উত্তরাধিকার, হেবা ও মিরাসের নির্ধারিত কাঠামোর সঙ্গে কীভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে। ইসলামী শরিয়াহ বিশেষজ্ঞ ও ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মতামত নেওয়ার দাবিও উঠেছে; যদিও এরই মধ্যে এ আইনের ব্যাপারে তারা তাদের নেতিবাচক অবস্থান স্পষ্ট করেছেন।

এখানে মূল প্রশ্নটি কেবল একটি আইনের কোনো একটি ধারা নিয়ে নয় বরং প্রশ্ন হচ্ছে, রাষ্ট্র যখন এমন কোনো আইন প্রণয়ন করে যা সরাসরি সম্পত্তি, পরিবার এবং উত্তরাধিকারব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত, তখন সে আইনের সামাজিক ও ধর্মীয় অভিঘাত কতটা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে? বাংলাদেশের বাস্তবতায় এ প্রশ্ন আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সংবিধান একদিকে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে, অন্যদিকে সব ধর্মের সমান মর্যাদা ও ধর্ম পালনের অধিকার নিশ্চিত করেছে। একই সঙ্গে সম্পত্তি অর্জন, ধারণ ও হস্তান্তরের অধিকারও সংবিধান স্বীকৃত করেছে। ফলে সম্পত্তি ও পারিবারিক আইন নিয়ে যেকোনো বড় পরিবর্তন স্বাভাবিকভাবেই কেবল আইনের বইয়ের বিষয় থাকে না; বরং তা সমাজের গভীরে গিয়ে প্রভাব ফেলে। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাটিকে বিচ্ছিন্ন একটি ঘটনা হিসেবে দেখলে সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি আড়ালে থেকে যায়। কারণ বাংলাদেশে সরকার বদলেছে বহুবার। রাজনৈতিক সরকার এসেছে, অন্তর্বর্তী সরকার এসেছে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারও এসেছে; কিন্তু পরিবার, উত্তরাধিকার, নারী-পুরুষের সম্পর্ক, লিঙ্গ পরিচয় এবং সামাজিক মূল্যবোধকে ঘিরে বিতর্কিত নীতিগত উদ্যোগের ধারা একেবারে থেমে থাকে নি। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসব উদ্যোগের ভাষা বদলেছে, ক্ষেত্র বদলেছে, উপস্থাপনার ধরন বদলেছে— কিন্তু বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু প্রায় একই থেকেছে।

এর একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হলো মিরাস তথা উত্তরাধিকারব্যবস্থা। বাংলাদেশের মুসলিম নাগরিকদের উত্তরাধিকার প্রশ্ন ঐতিহাসিকভাবে ধর্মীয় ব্যক্তিগত আইনের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নারী-পুরুষের উত্তরাধিকার অধিকারের সমতা এবং ধর্মভিত্তিক ব্যক্তিগত আইনের পরিবর্তে একটি ‘ইউনিফর্ম ফ্যামিলি কোড’ প্রবর্তনের প্রস্তাব নিয়ে যে আলোচনা হয়েছে, তা এ প্রশ্নকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। ২০২৫ সালে গঠিত নারী সংস্কার কমিশন তাদের প্রতিবেদনে বিয়ে, তালাক, ভরণপোষণ, অভিভাবকত্ব ও উত্তরাধিকারসহ পারিবারিক বিষয়ে সমঅধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ‘ইউনিফর্ম ফ্যামিলি কোড’ -এর সুপারিশ করেছিল। এ জায়গাটিই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ উত্তরাধিকার কোনো সাধারণ সম্পত্তি বণ্টনের বিষয় নয়। মুসলমানদের কাছে মিরাস একটি ধর্মীয় বিধান, যার নির্দিষ্ট কাঠামো কুরআন ও সুন্নাহর সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে রাষ্ট্রীয় আইনের মাধ্যমে উত্তরাধিকার কাঠামোতে পরিবর্তনের প্রশ্ন উঠলে সেটি স্বাভাবিকভাবেই ধর্মীয় অনুভূতি ও বিশ্বাসের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। এ কারণেই ‘ইউনিফর্ম ফ্যামিলি কোড’-এর প্রস্তাব নিয়ে বাংলাদেশে তীব্র বিতর্ক হয়েছে এবং প্রস্তাবগুলোর কিছু অংশকে ইসলামী শরিয়াহবিরোধী আখ্যা দিয়ে আইনি চ্যালেঞ্জও করা হয়েছে।

এখন যদি এ ঘটনাকে বিচ্ছিন্নভাবে না দেখে গত কয়েক বছরের বিশেষ করে আওয়ামী ফ্যাসিবাদী আমলের শিক্ষানীতি ও সামাজিক নীতির দিকে তাকানো হয়, তাহলে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারাবাহিকতা চোখে পড়ে। ২০২৪ সালে সপ্তম শ্রেণির ইতিহাস ও সামাজিক বিজ্ঞান বইয়ে ‘শরীফার গল্প’ নামে একটি বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। গল্পটিতে জন্মগতভাবে পুরুষ হিসেবে বেড়ে ওঠা একজন ব্যক্তি পরবর্তীতে নিজেকে নারী হিসেবে উপলব্ধি করার কথা বলা হয় এবং হিজড়া সম্প্রদায়ের সঙ্গে তার যুক্ত হওয়ার বিষয়টি তুলে ধরা হয়। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয় এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয় তা পর্যালোচনার জন্য তদন্ত কমিটি গঠন করে। পরবর্তীতে গল্পটি পরিবর্তনের সিদ্ধান্তের কথাও জানানো হয়। এখানে বিতর্কের জায়গাটি কেবল একটি পাঠ্যবইয়ের গল্প ছিল না। আসল প্রশ্ন ছিল—শিশু-কিশোরদের সামনে লিঙ্গ পরিচয়কে কীভাবে উপস্থাপন করা হবে? শিক্ষাব্যবস্থা কি প্রচলিত সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের কাঠামোর মধ্যে বিষয়গুলো উপস্থাপন করবে, নাকি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও লিঙ্গ সংক্রান্ত বয়াণকে সামনে রেখে নতুন সামাজিক ধারণার সঙ্গে শিক্ষার্থীদের পরিচিত করবে?

এর পরপরই লিঙ্গ সমতা, লিঙ্গ পরিচয় এবং এলজিবিটির মতো বিতর্কিত বিষয়গুলো বাংলাদেশের সামাজিক ও নীতিগত আলোচনায় ক্রমশ দৃশ্যমান হয়েছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এসব ধারণা বহুদিন ধরেই মানবাধিকার ও বৈষম্যবিরোধী নীতির অংশ হিসেবে আলোচিত। বাংলাদেশেও বিভিন্ন নাগরিক সংগঠন লিঙ্গ পরিচয় ইস্যুতে জনগোষ্ঠীর অধিকার, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি ও বৈষম্যহীনতার দাবি নিয়ে কাজ করছে। সংস্থাগুলো আবার বিদেশি বিভিন্ন সংস্থা থেকে বড়ো ধরনের অর্থায়নও পেয়েছে। প্রশ্ন হলো, বিদেশি অর্থায়নে পরিচালিত বিভিন্ন বেসরকারী সংস্থা যখন লিঙ্গ পরিচয়, যৌনতা সম্পর্কে আলোচনা বা সমাজে বিভিন্ন বিতর্কিত ইস্যুগুলোকে ঢুকিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে তখন এসব উদ্যোগের দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক প্রভাব নিয়ে বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে খোলামেলা আলোচনা হচ্ছে কি না।

সমস্যা আরও গভীর হয় যখন একই ধরনের ধারণা একাধিক প্রতিষ্ঠান ও নীতিক্ষেত্রে প্রায় একই সময়ে দৃশ্যমান হতে থাকে। একটি জায়গায় হয়তো লিঙ্গ স্পর্শকাতরতা নিয়ে আলাপ হচ্ছে, আরেকটি সংস্থা হয়তো লিঙ্গ পরিচয় নিয়ে সরব হয়েছে। কেউ হয়তো কোথাও সমঅধিকারের নামে পারিবারিক আইনে সংস্কার চাইছে কেউ বা পারসোনাল ল’ এর পরিবর্তে ‘ইউনিফর্ম ফ্যামিলি কোড’ প্রতিষ্ঠা করছে আবার কেউ হয়তো পশ্চিমা ট্রান্সজেন্ডার বয়ানকে পাঠ্যপুস্তকে ঢুকিয়ে দিতে চাইছে। প্রতিটি উদ্যোগকে আলাদাভাবে দেখলে এগুলো হয়তো বিচ্ছিন্ন ও স্বতন্ত্র মনে হতে পারে। কিন্তু সবগুলোকে পাশাপাশি রাখলে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে: বাংলাদেশের সামাজিক কাঠামোকে বদলে দেয়ার জন্য কি বড়ো কোনো ষড়যন্ত্র চলছে?

প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে যখন দেখা যায়, সরকার পরিবর্তনের পরও কিছু নীতিগত ভাষা ও ধারণা অদৃশ্য হয়ে যায় না। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় পাঠ্যপুস্তকে ট্রান্সজেন্ডার ইস্যুতে বিতর্ক হয়েছিল। পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও জেন্ডার সেনসিটিভ পলিসি বা এলজিবিটি ইস্যুতে বিভিন্ন সিভিল ফোরাম সরব ছিল। অর্থাৎ সমস্যাটি শুধু কোনো একটি সরকারের নয়—এমন একটি রাজনৈতিক উপলব্ধি তৈরি হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে। একটি সরকার কোনো একটি উদ্যোগ নেয়, পরবর্তী সরকার সেটি অন্য ভাষায় এগিয়ে নেয়, আর তার পরের সরকার হয়তো একই বিষয়কে আরও ভিন্ন প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসে। ফলে সরকার বদলালেও নীতিগত প্রবণতার কিছু অংশ থেকে যায়। তখন প্রশ্ন ওঠে— এসব উদ্যোগ কি কেবল বিচ্ছিন্ন সরকারি সিদ্ধান্ত, নাকি রাষ্ট্রের বিভিন্ন স্তরে সক্রিয় একটি বৃহত্তর নীতিগত ও সামাজিক নেটওয়ার্কের প্রভাব এখানে কাজ করছে?

এ জায়গায় তথাকথিত সুশীল সমাজের ভূমিকাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করা যায়। বাংলাদেশে অবশ্যই অসংখ্য নাগরিক সংগঠন রয়েছে, যাদের কাজের সঙ্গে কোনো বিতর্কের সম্পর্ক নেই। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দারিদ্র‍্য, মানবাধিকার, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা—অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে এনজিও ও সুশীল সমাজের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে কিছু সংগঠন এমন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক এজেন্ডা নিয়ে কাজ করে- যা বাংলাদেশের প্রচলিত ধর্মীয় ও পারিবারিক মূল্যবোধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ফলে এই তথাকথিত সুশীল কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন উঠলে সেটিকে কেবল ‘মানবাধিকারবিরোধিতা’ বলে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই; বরং তাদের অর্থায়ন, কর্মসূচি, নীতিগত লক্ষ্য এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে তাদের সম্পর্ক নিয়েও আলোচনা করা প্রয়োজন।

আর এখানেই মূল প্রশ্নটি এসে দাঁড়ায় প্রশাসনের ভেতরের প্রভাবের জায়গায়। কোনো সামাজিক সংগঠন একা একটি রাষ্ট্রের আইন বদলে দিতে পারে না। তার জন্য প্রয়োজন নীতিনির্ধারক, প্রশাসন, বিশেষজ্ঞ, কমিশন, রাজনৈতিক নেতৃত্ব কিংবা আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অংশীদারদের কোনো না কোনো পর্যায়ের সংযোগ। এ কারণেই সাম্প্রতিক সময়ে আলোচিত সম্পত্তি হস্তান্তর আইন নিয়ে বর্তমান বিতর্ককে শুধুমাত্র সম্পত্তি আইনের একটি কারিগরি সংশোধনী হিসেবে দেখলে বিষয়টির রাজনৈতিক ও সামাজিক তাৎপর্য হয়তো ধরা পড়বে না। কারণ সম্পত্তি হলো পরিবারের অন্যতম ভিত্তি; উত্তরাধিকার হলো পরিবারের ভেতরে সম্পদ বণ্টনের কাঠামো; বিবাহ ও পরিবার আইন হলো সামাজিক সম্পর্কের আইনি ভিত্তি; আর শিক্ষা হলো নতুন প্রজন্মের মূল্যবোধ নির্মাণের প্রধান মাধ্যম। এ চারটি জায়গায় একই সময়ে পরিবর্তনের চাপ তৈরি হলে সেটিকে বৃহত্তর সামাজিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে দেখা অস্বাভাবিক নয়।

এখানেই ‘দুষ্টুচক্র’-এর প্রশ্নটি আসে। এ চক্র বলতে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা একটি মাত্র সংগঠনকে বোঝানো হচ্ছে না; বরং এমন একটি নীতিগত বলয়কে বোঝানো হচ্ছে, যেখানে কিছু ধারণা এক প্রতিষ্ঠান থেকে অন্য প্রতিষ্ঠানে, এক সরকার থেকে অন্য সরকারে, এক কমিশন থেকে আরেক নীতিনির্ধারণী পরিসরে প্রবাহিত হয়। এর সঙ্গে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অর্থায়ন, সুশীল সমাজের কর্মকাণ্ড, মানবাধিকার সংক্রান্ত জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বয়াণ এবং প্রশাসনিক নীতির যোগসূত্র থাকতে পারে। এ পুরো প্রক্রিয়াকে অনুসন্ধানের বাইরে রেখে শুধু প্রতিটি ঘটনাকে আলাদা আলাদা হিসেবে দেখলে বড় ছবিটি কখনোই সামনে আসবে না। সাধারণ মানুষ সাধারণত প্রতিটি ঘটনাকে আলাদা করে দেখে। একটি আইন হলে মানুষ সেই আইন নিয়ে প্রতিবাদ করে। পাঠ্যবইয়ে কোনো বিতর্কিত বিষয় এলে মানুষ কয়েক দিন আলোচনা করে। কোনো কমিশন উত্তরাধিকার সংস্কারের সুপারিশ করলে সংশ্লিষ্ট ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠনগুলো আপত্তি জানায়। কোনো এনজিও নতুন কোনো জেন্ডার প্রোগ্রাম চালু করলে সেটি হয়তো খুব অল্পসংখ্যক মানুষ জানতে পারে। তারপর সময় চলে যায়। সরকার পরিবর্তন হয়। নতুন রাজনৈতিক ইস্যু সামনে আসে। কিন্তু এর মধ্যেই আগের উদ্যোগের কিছু অংশ নীতির ভেতরে থেকে যায়, কোনো অংশ নতুন প্রস্তাবের রূপ নেয়, আর কোনো অংশ নতুন প্রজন্মের কাছে স্বাভাবিক ধারণা হিসেবে উপস্থাপিত হতে থাকে।

সুতরাং আজ প্রয়োজন শুধু কোনো একটি বিলের বিরোধিতা করা নয়; প্রয়োজন এ ধারাবাহিকতাকে বোঝা। রাষ্ট্রের আইন, শিক্ষাব্যবস্থা, পরিবারনীতি, উত্তরাধিকারব্যবস্থা, লিঙ্গ সংক্রান্ত নীতিমালা এবং সুশীল সমাজের কার্যক্রমকে আলাদা আলাদা দ্বীপ হিসেবে দেখলে চলবে না। এগুলো পরস্পর সম্পর্কিত সামাজিক প্রতিষ্ঠান। একটি জায়গায় পরিবর্তন অন্য জায়গায় তার প্রভাব ফেলবেই। বাংলাদেশের মানুষ কোন ধরনের পরিবার চায়, উত্তরাধিকার কীভাবে পরিচালিত হবে, নারী ও পুরুষের পারিবারিক অধিকার কী হবে, সন্তানদের সামনে লিঙ্গ পরিচিতিকে কীভাবে তুলে ধরা হবে কিংবা ধর্মীয় মূল্যবোধের সঙ্গে আধুনিক নানা বয়াণের সম্পর্ক কী হচ্ছে। এসব সিদ্ধান্ত কেবল কয়েকজন কর্মকর্তা, কমিশন বা বিদেশি অর্থায়নে পরিচালিত কোনো প্রকল্পের হাতে ছেড়ে দেওয়া যায় না। এসব প্রশ্নে জনগণের মতামত, ধর্মীয় আলেমদের জ্ঞান, আইনজ্ঞদের বিশ্লেষণ এবং সামাজিক বাস্তবতার যথাযথ মূল্যায়ন প্রয়োজন।

কারণ শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি কোনো একটি সরকারের বিরুদ্ধে নয়। বরং প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্রকে টেনে কোন্ দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, কারা সেই দিক নির্ধারণ করছে এবং কোন্ মূল্যবোধের ভিত্তিতে করছে তা নিরূপণ করা। যদি প্রতিটি সরকার পরিবর্তনের পরও একই ধরনের বিতর্কিত নীতিগত প্রবণতা নতুন নামে, নতুন ভাষায় এবং নতুন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ফিরে আসে, তাহলে শুধু সরকার পরিবর্তন করে সমস্যার সমাধান হবে না। তখন তাকাতে হবে সেই কাঠামোর দিকে, যে কাঠামো সরকার বদলালেও নিজের প্রভাব ধরে রাখে। আজকের সম্পত্তি হস্তান্তর আইন নিয়ে বিতর্ক তাই একটি সতর্ক সংকেত হিসেবে দেখা যেতে পারে। এর মধ্য দিয়ে অন্তত একটি প্রশ্ন নতুন করে সামনে এসেছে—রাষ্ট্রের আইন কি কেবল আইনের ভাষায় বিচার হবে, নাকি সে আইনের সঙ্গে মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাস ও মূল্যবোধ, পারিবারিক কাঠামো, উত্তরাধিকার এবং সামাজিক মূল্যবোধের সম্পর্কও বিবেচনায় নিতে হবে? এ প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে গেলে আগামী দিনে একই ধরনের বিতর্ক আরও বড়ো আকারে ফিরে আসতে পারে।