কোনো শাসক যদি ফ্যাসিবাদী হতে চান, তাহলে এই জাদুঘর মনে করিয়ে দেবে-- জনগণের প্রতিরোধের মুখে

বহু আলোচনা ও প্রতীক্ষার পর অবশেষে আগামীকাল বুধবার যাত্রা শুরু করতে যাচ্ছে ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রায় দেড় দশকের আবাসস্থল ছিল গণভবন। এখানেই তৈরি হয়েছে ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে এই জাদুঘরটির উদ্বোধন করবেন আগামিকাল। সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব দীপংকর বিশ্বাস গণমাধ্যমকে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর কাছে উদ্বোধনের সময় চেয়ে প্রস্তাব পাঠানো হলে তিনি ৫ আগস্ট সময় দিয়েছেন বলে জানা গেছে। উদ্বোধনের পর এটি জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হবে। উদ্বোধনের আগে দর্শনার্থীদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা, ভেতরে ঢোকার টিকিটের ব্যবস্থাসহ আনুষঙ্গিক কাজগুলো করা হচ্ছে। এদিকে জুলাইয়ের ইতিহাস সমুন্নত রাখতে জুলাই স্মৃতি জাদুঘরকে ট্রাস্টের আওতায় রাখার পরামর্শ দিয়েছেন সাবেক সংস্কৃতি উপদেষ্টা ও বিখ্যাত ”লচ্চিত্রকার মোস্তফা সারোয়ার ফারুকী। দৈনিক সংগ্রামের সাথে আলাপকালে তিনি পরামর্শ দিয়ে বলেন জুলাইকে লাখো বছর বাঁচিয়ে রাখতে জুলাই জাদুঘরকে ট্রাস্টের আওতায় রাখা দরকার।

জাদুঘর তৈরির উদ্দেশ্য নিেেয় বলা হচ্ছে, ভবিষ্যতে কেউ স্বৈরশাসক হতে চাইলে এই জাদুঘর তাদের জন্য শিক্ষণীয় হবে। কোনো শাসক আবার যদি ফ্যাসিবাদী হয়ে উঠতে চান, তাহলে এই জাদুঘর তাকে মনে করিয়ে দেবে যে জনগণই রাষ্ট্রের সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী এবং জনগণের প্রতিরোধের মুখে স্বৈরশাসনের পতন অনিবার্য।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার উত্তাল গণ-আন্দোলনের মুখে তৎকালীন ফ্যাসিবাদী শাসনের পতন ঘটে এবং ফ্যাসিজমের মূল নায়ক শেখ হাসিনার পলায়নের পর ছাত্র-জনতা-গণভবন দখল করে নেয়। জুলাই অভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক স্মৃতি বিজড়িত গণভবনকেই একটি পূর্ণাঙ্গ জাদুঘরে রূপান্তর করা হয়। জাদুঘরটি উদ্বোধন করতে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর ৫ মাস সময় লেগে যায়। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এই জাদুঘরের কাজ ৮০ ভাগ সম্পন্ন করে গেছে বলে দৈনিক সংগ্রামকে নিশ্চিত করেন সাবেক সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সারোয়ার ফারুকী। তিনি রোববার এই প্রতিবেদকের সাথে আলাপকালে জানান, অর্ন্তবর্তীকালীন সরকারে দায়িত্ব পালনকালে জুলাই জাদুঘরের ৮০ ভাগ কাজ শেষ করে গেছি। বাকীটা শেষ হয়েছে কি-না আমি জানি না। জুলাই জাদুঘরকে ট্রাস্টি বোর্ডের অধিনে দেওয়ার পরামর্শ দিয়ে তিনি জানান, জুলাইয়ের আরও লক্ষ লক্ষ গল্প আছে। সেটা আরও বিশ বছরেও বলে শেষ করা যাবে না।

বহু মানুষের চোখের পানির সাক্ষী সেই গণভবনকে জুলাই স্মৃতি জাদুঘরে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এই জাদুঘরে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে সংঘটিত গুম ও নির্যাতনের বিবরণ, ভুক্তভোগীদের স্মৃতি ও স্মারক, জুলাই শহীদদের ব্যবহৃত সামগ্রী, গণভবন থেকে উদ্ধার করা নথিপত্রসহ বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্মারক ও শিল্পকর্ম সংরক্ষণের বিষয়গুলো গুরুত্বসহকারে সংরক্ষণ করা হয়েছে। পাঁচটি নতুন ওয়াকওয়ে, তিন দিকে সম্প্রসারিত লেক, ফুডকোর্ট, প্রার্থনাকক্ষ, প্রক্ষালন কক্ষ, টিকিট হাউস, স্যুভেনির শপ, হেলিপ্যাডে জুলাই মঞ্চ এবং ২২টি সেল নিয়ে প্রতীকী আয়নাঘর বানানো হয়েছে। এ ছাড়া জুলাই আন্দোলন, শাপলা ট্র্যাজেডি, বিডিআর বিদ্রোহ ইত্যাদিসহ গুম খুনের শিকার প্রায় ৪ হাজার মানুষের নাম ও স্মৃতি সংরক্ষণে মেমোরিয়াল তৈরি করা হয়েছে। আড়াই হাজারের বেশি ডামি কবর বানানো হয়েছে। ১৯টি ভিন্ন ভিন্ন থিমে মোট ৬২টি প্রামাণ্যচিত্র বানানো হয়েছে। শেখ হাসিনার পালিয়ে যাওয়ার দৃশ্যও সংরক্ষিত রয়েছে। জাদুঘর নির্মাণে চীনের সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। এছাড়া জুলাই স্মৃতি জাদুঘরে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দুর্লভ আলোকচিত্র, ভিডিও ফুটেজ, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দলিল-দস্তাবেজ এবং শহীদ ও আহতদের ব্যবহৃত ব্যক্তিগত সামগ্রী সংরক্ষণ করা হয়েছে। এছাড়া আন্দোলনের সময় ব্যবহৃত ব্যানার, প্ল্যাকার্ড এবং গত ১৭ বছরের শাসনের বিভিন্ন নিদর্শনও এই জাদুঘরে স্থান পেয়েছে।

রোববার সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে জাদুঘরটি উদ্বোধনের জন্য শেষ সময়ের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। এজন্য সেখানকার কর্মকর্তা কর্মচারিরা ব্যস্ত সময় পার করছেন। বিভিন্ন বিভাগের কর্মকর্তা কর্মচারিদের আনাগোনা লক্ষ্য করা যায়। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এক টেলিফোন টেকনেশিয়ানের সাথে আলাপ করে জানা যায়, শেখ হাসিনা চলে যাওয়ার পর আর এখানকার টেলিফোনে কেউ কথা বলেনি। আমি দেখতে এসেছি টেলিফোনের তার গুলো ঠিক আছে কি-না।

সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী জানান, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রকৃত চেতনা এবং সংগ্রামের ইতিহাস ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়াই এই জাদুঘরের প্রধান লক্ষ্য। উদ্বোধনের পর এটি সাধারণ মানুষের দর্শনের জন্য উন্মুক্ত করা হবে। দর্শনার্থীদের সুবিধার্থে গাইডেড ট্যুর এবং অনলাইনে টিকিট সংগ্রহের আধুনিক ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে।

এদিকে জুলাইয়ের ইতিহাস সমুন্নত রাখতে জুলাই স্মৃতি জাদুঘরকে ট্রাস্টের আওতায় রাখার পরামর্শ দিয়েছেন অর্ন্তবর্তী কালীন সরকারের সাবেক সংস্কৃতি উপদেষ্টা ও বিখ্যাত ”লচ্চিত্রকার মোস্তফা সারোয়ার ফারুকী। দৈনিক সংগ্রামের সাথে আলাপকালে তিনি বলেন জুলাইকে লাখো বছর বাঁচিয়ে রাখতে এই উদ্যোগটি নেওয়া দরকার। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, মুক্তিয্দ্ধু জাদুঘর বানানোর জায়াগা দিয়েছে সরকার। নির্মাণের অর্ধেক টাকা দিয়েছে সরকার। বাকী টাকা এসেছে কর্পোরেট থেকে। প্রতিবছর পরিচালনার ব্যয় অর্ধেক সরকার বহন করে। কিন্তু সরকার এটার মালিক না। এটা ট্রাস্টিবোর্ডের আন্ডারে আছে।

জুলাই স্মৃতি জাদুঘরের মহাপরিচালক তানজিম ওয়াহাব জানান, এটি নির্মাণে গণপূর্ত বিভাগ ও জাতীয় জাদুঘর মোট বরাদ্দ পেয়েছে ১২৩ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। মোট খরচ হয়েছে ১১০ কোটি ৯২ লাখ টাকা। অব্যয়িত ১২ কোটি ৫৩ লাখ টাকা সরকারের কোষাগারে ফেরত দেওয়া হয়েছে। জাদুঘর পরিচালনায় ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা।

রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত গণভবনের আয়তন ১৭ দশমিক ৬৮ একর। ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ভবনটির ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নেয়। এরপর ৫ সেপ্টেম্বর জাদুঘর হিসেবে প্রতিষ্ঠার জন্য সিদ্ধান্ত নেয় সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার। ২৪ ডিসেম্বর অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের সভায় নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়।

১৯৭৩ সালে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন ও সচিবালয় হিসেবে শেরেবাংলা নগরে এই গণভবন নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। শেখ হাসিনার বাবা শেখ মুজিবুর রহমান প্রধানমন্ত্রী ও প্রেসিডেন্ট থাকাকালে গণভবনে বসবাস না করলেও ভবনটিকে অফিসের কাজে ব্যবহার করতেন। বিশাল কমপ্লেক্স, উন্মুক্ত মাঠসহ ২৯ হাজার বর্গফুটের দ্বিতল ভবনটিতে পরিবার নিয়ে থাকতেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গণভবনের খোলা জায়গায় নানা শাকসবজি, ফল এমনকি বিভিন্ন জাতের ধানের চাষও করতেন শেখ হাসিনা। বিশাল লেকে মাছ চাষ করতেন। গরু, মুরগি, কবুতরসহ নানা জাতের পশুপাখি পালন করতেন। এছাড়া বিনোদনের জন্য ছিল বিশাল টেনিস কোর্ট।

গত ৯ জুলাই সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় আইন অনুযায়ী জাদুঘরের পর্ষদ পুনর্গঠন করেছে। ১৫ সদস্যবিশিষ্ট এ পর্ষদের সভাপতি হয়েছেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। জাদুঘরটির মহাপরিচালক সদস্যসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।