২০২৪ সালের উত্তাল জুলাইতে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি জেনারেল ছিলেন জাহিদুল ইসলাম। পরবর্তীতে তিনি কেন্দ্রীয় সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। জুলাইয়ের দেনা-পাওনা নিয়ে কথা বলেছেন দৈনিক সংগ্রামের সাথে। তিনি বলেছেন, জুলাই আন্দোলন এবং বিপ্লবের মধ্য দিয়ে একটি প্রজন্ম তৈরি হয়েছে। তারাই জুলাইকে ধারণ করবে এবং বহুকাল জুলাইকে বাঁচিয়ে রাখবে।
তিনি বলেন, জুলাই সবশ্রেনি পেশার মানুষের সমন্বয়ের মধ্য দিয়ে হয়েছে। শিশু থেকে শুরু করে সব বয়সের এবং যত পেশা আছে সব মানুষ বাংলাদেশের আপামর মানুষের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে হয়েছে। অর্থাৎ যারা বাংলাদেশপন্থী, বাংলাদেশের অগ্রগতি চায়। ৫ আগস্টের পর আমাদের যে প্রত্যাশাটা ছিল যে বিপ্লবের পর একটি বিপ্লবী মানসিকতার মধ্যে দিয়ে দেশটাকে পরিচালনা করবে। এই জায়গাটাতে আমরা কিছুটা আশাহত হয়েছি। আমরা স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার সরকারের চেয়ে ধীরগতি লক্ষ্য করছি। যেমন কিছু কিছু ক্ষেত্রে পিছুটান- যেমন বিচার নিয়ে। প্রায় দুবছর হতে চলেছে, কিন্তু একটি বিচারেরও রায় বাস্তবায়ন হয়নি। বিপ্লবের সময় বিপ্লবী মানসিকতার মধ্য দিয়ে এটা করতে হয়। কারণ চাক্ষুস সবগুলো প্রমাণ আমাদের কাছে আছে। কারা হত্যা করেছে এবং হত্যাকাণ্ডের ভিডিও ফুটেজ আমাদের কাছে আছে। এই জায়গা থেকে অর্ন্তবর্তী সরকারের কিছু ধীরগতি ছিল। এরপর বর্তমান আসার পর উল্লেখযোগ্য কোন পরিবর্তন দেখিনি। বরং আমরা দেখেছি ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর থেকে শুরু করে ব্যাপক একটা রদবদল তারা করেছে। জুলাইয়ের স্পিড যেভাবে আমরা চেয়েছিলাম; ছাত্রজনতা প্রত্যাশা করেছিল, সেই জায়গাতে ধীরগতি পরিলক্ষিত হচ্ছে আমাদের কাছে।
আগামির জুলাইটাকে কেমন দেখতে চান? জবাবে জুলাই আন্দোলনের শীর্ষ এই নেতা বলেন, জুলাইতো ২৬/২৭ দিয়ে হবে না। বাংলাদেশের আগামির ভবিষৎ মূলত জুলাই করে দিবে। এক্ষেত্রে কিছু কিছু ব্যক্তি আওয়ামী লীগ অথবা তারে দোসর অথবা চৌদ্দ দল হিসেবে আওয়ামী লীগের জোটে ছিল, এরাই আসলে চাচ্ছে জুলাই বিতর্কিত হউক। অথবা যারা বাংলাদেশে ন্যায় এবং ইনসাফপন্থীদের উত্থানকে সহ্য করতে পারে না, ওই গোষ্ঠিগুলো মূলত: জুলাইকে অবজ্ঞা করার চেষ্টা করছে। আরেকটা শ্রেণি আছে যারা জুলাইতে যাদের খুব বেশি অবদান ছিল না; ওই মানুষগুলো যখন দেখবে তাদের পলিটিক্যাল অবস্থান বেকফুটে যাচ্ছে তখন তারা এই জুলাইকে ম্লান করে দেওয়ার কার্যক্রম চালাচ্ছে। আমি মনে করি যারা প্রকৃত অর্থে জুলাইয়ের পক্ষে ছিল; ফ্যাসিবাদের বিপক্ষে ছিল তারা সবাই জুলাইকে ধারণ করে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো একটি প্রজন্ম তৈরি হয়েছে। ছোট্ট একটা শিশু থেকে শুরু করে কিশোর- যুবক যারা আছে, তাদের মধ্যে ২০২৭ কিংবা ২০৫০ বলুন, এরাই বাংলাদেশের গুরুত্বপূণৃ জায়গাগুলোতে নেতৃত্ব দিবে। এবং এরা যেভাবে চিন্তা করবে, বাংলাদেশটা সেই গতি প্রকিৃতির দিকে যেতে বাধ্য হবে।
১ আগস্ট থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত ছাত্র-জনতার আন্দোলনের ডিজাইন নিয়ে কথা বলেন, ছাত্র শিবিরের সেই সময়ের সেক্রেটারি জেনারেল। জানালেন, ১লা আগস্ট ২০২৪ তারিখে ছাত্রশিবিরকে নিষিদ্ধ করে গেজেট প্রকাশ হয়েছিল। কাজটি করে সরকার মনে করেছিল যে, আন্দোলন স্থিমিত করে দিবে। জামায়াত বা শিবির তাদের পক্ষ থেকে প্রতিক্রিয়া দেখাবে। সেদিন আমরা বিবৃতি ছাড়া মাঠে তেমন কোন কর্মসূচি দেইনি। ৫জুন থেকে শুরু করে ১৫ জুলাই আক্রমণ, ১৬ জুলাই শাহাদাত বরণের পর এই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে খুনি হাসিনার পতন হবে সেটা আমরা তখনই উপলব্দি করছিলাম। এজন্য ১লা আগস্ট শুক্রবার কর্মসূচি হিসেবে গণ মিছিল দেওয়া হয়েছিল। ৩রা আগস্ট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে এক দফার ঘোষনা এসেছিল। ৪ঠা আগস্ট অসযোগ আন্দোলনের কর্মসূচি ছিল। আর ৫ আগস্টতো ফাইনালি ঢাকায় লংমার্চ কর্মসূচি দিয়েছিলাম। কর্মসূচি দেওয়ার ক্ষেত্রে আমরা ফাইনাললি যেটা করেছিলাম; তাহলো- শিবিরের কেন্দ্রের একটা টিমি ছল। টিমকে আমরা নিয়মিত সমন্বয় করতাম। কোন পলিসি নিতে হবে। আমাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগঠন এবং সাদিক কায়িম তখন সেখানকার সভাপতি ছিলেন, তখন তার নেতৃত্বে একটা টিম ছিল। সমন্বয়কদের সমন্বয় করার জন্য সাদিক কায়িম সহ কয়েকজনের দায়িত্ব ছিল। তারা মধ্যস্থতাগুলো করতেন। এছাড়া ছাত্রশিবিরের সাবেক যারা ছিল দেশে এবং দেশের বাইরে, তাদের সাথেও ধারাবাহিকভাবে আলাপ আলোচনা করতাম। বলতে গেলে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রতিটি ইস্যূ নিয়ে প্রত্যেকটা স্টেপসের সাথে আলাপ আলোচনা করে পলিসিগুলো নির্ধরণ করতাম। আন্দোলনের কর্মসূচি গ্রহণ করতাম, সিদ্ধান্ত নিতাম এবং কিভাবে বাস্তবায়ন হবে তার জন্য ঢাকায় একটা রিজন ছিল, ঢাকার বাইরে প্রত্যেকটা বিভাগকে আলাদা করে ভাগ করে দায়িত্ব দেওয়া ছিল কেন্দ্র থেকে। তারা আবার স্থানীয় এবং বিভিন্ন শিক্ষার্থীদের সাথে এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে যারা সমন্বয়ক ছিল, এভাবে করে মূলত এক থেকে ৫ তারিখ পর্যন্ত কর্মসূচীগুলো বাস্তবায়ন করা হয়েছে। আর ৫ তারিখেতো কারফিউ ছিল। সেখানে গণভবনকে কেন্দ্র করে আমাদের মূল প্ল্যানটা ছিল। সবাই যাতে গণভবনের দিকে যাত্রা শুরু করবেন। এক্ষেত্রে শাহবাগে আমাদের একটা পয়েন্ট ছিল। শাহবাগ থেকে সায়েন্স ল্যাব হয়ে ধানমন্ডি দিয়ে গণভবনের দিকে যাবে। এদিকে উত্তরা থেকে মহাখালী হয়ে একটা টিম ছিল আমাদের। বসুন্ধরা এবং রামপুরায় যারা ছিল ঐদিক থেকে ছিল আরেকটা টিম। অর্থাৎ ঢাকাকে বিভিন্ন সেকশনে ভাগ করে প্রত্যেকে একযোগে গণভবনের দিকে অভিযাত্রা। এই প্ল্যানটা ছাত্র শিবির ৩ আগস্ট থেকে ই করেছিলাম। ৪ তারিখ এবং ৫ তারিখ চুড়ান্তভাবে শেষ করেছি।