- পাঁচ মাসে বিএসএফ’র গুলীতে ৬ বাংলাদেশী নিহত
- বেড়েছে ভারতীয় খাসিয়াদের তৎপরতা
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের বিদায়ী হাইকমিশনার প্রণয় কুমার ভার্মার সঙ্গে বৈঠকের পর বলেছিলেন, সীমান্তে আর যেন হত্যার ঘটনা না ঘটে। গত মার্চে সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রণয় কুমারের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলেন-ভারতীয় হাইকমিশনারকে সীমান্ত হত্যা বন্ধের বিষয়ে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয়া হয়েছে। বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকার গঠনের পর এমন বার্তা দেয়া হলেও সীমান্তে হত্যা বন্ধ হয়নি। বাংলাদেশি নাগরিকদের হত্যা ও নির্যাতনের ঘটনা অব্যাহত রয়েছে, যা গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। সীমান্তে শুধু হত্যাকান্ডই নয়- ঘটছে পুশ ইনের ঘটনাও। সর্বশেষ- গত শুক্রবার রাতে কসবা উপজেলার গোপীনাথপুর ইউনিয়নের ধজনগরের বাতেনবাড়ি গ্রামের এইচএসসি দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মো. মুরসালিন এবং একই ইউনিয়নের মধুপুর গ্রামের নবীর হোসেনকে গুলী করে হত্যা করে বিএসএফ।
এছাড়াও কয়েকটি সীমান্ত এলাকায় বেড়েছে খাসিয়াদের তৎপরতা। খাসিয়ারাও সীমান্ত এলাকা থেকে বাংলদেশিদের ধরে নিয়ে নির্যাতন চালাচ্ছে-গুলী করে হত্যা করছে। মানবাধিকার সংস্থা আসকের তথ্যমতে, চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে বিএসএফ’র গুলীতে অন্তত ৬ জন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। এরই মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের বিজেপির নেতৃত্বাধীন শুভেন্দু অধিকারীর সরকার ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের জন্য বিএসএফকে ৪৫ দিনের মধ্যে জমি বুঝিয়ে দেবে। এতে সীমান্তে উত্তেজনা আরও বৃদ্ধি পেতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন।
জানা গেছে, বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে কিছুদিন স্থিতিশীল থাকার পর ফের উত্তেজনা ছড়াচ্ছে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে। কোনো ধরনের উসকানি ছাড়াই আগ্রাসী আচরণ শুরু করেছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ। গত শনিবার পশ্চিমবঙ্গের নবনির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর শপথের কয়েক ঘণ্টা আগে বিএসএফের গুলীতে দুই বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। পাশাপাশি মৌলভীবাজারের কুলাউড়া সীমান্ত দিয়ে ১০ জনকে পুশইন করা হয়েছে। সীমান্তে বিএসএফের গুলীতে বাংলাদেশী নাগরিক নিহত হওয়ার ঘটনা যেন ধীরে ধীরে আমাদের জাতীয় জীবনের এক নির্মম স্বাভাবিকতায় পরিণত হচ্ছে। কদিন পরপরই একই ধরনের খবর আসে, কিছুদিন আলোচনা হয়, তারপর আবার নীরবতা। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত বিশ্বের দীর্ঘতম আন্তর্জাতিক সীমান্তগুলোর একটি। এই সীমান্ত ঘিরে দুই দেশের রয়েছে ইতিহাস, সংস্কৃতি, বাণিজ্য ও ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার গভীর সম্পর্ক। কিন্তুএই সম্পর্কের ওপর সবচেয়ে বড় কালিমার নাম সীমান্ত হত্যা। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্য বলছে, গত দুই দশকে শত শত বাংলাদেশি সীমান্তে প্রাণ হারিয়েছেন। কখনো তারা কৃষক, কখনো শ্রমজীবী মানুষ, কখনো কিশোর, আবার কখনো শুধুই সীমান্তবর্তী গ্রামের সাধারণ বাসিন্দা। আর এই বিএসএফ সীমান্তে কী ধরনের বর্বরতা চালায়, সেটার চিত্র পাওয়া গেছে মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) গত ১১ বছরের বার্ষিক সীমান্ত সংঘাতের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণসংক্রান্ত প্রতিবেদনগুলো ঘেঁটে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সীমান্তে হত্যা শূন্যে নামিয়ে আনতে প্রাণঘাতী অস্ত্রের ব্যবহার বন্ধের বিষয়ে বাংলাদেশ ও ভারত শুধু সম্মতই হয়, সহিংসতা থামোনি। বিএসএফ বন্ধ করেনি মারণাস্ত্রের ব্যবহার। তারা বলছেন, সীমান্তে চোরাচালান রোধ যেমন জরুরি, তেমনই মানবাধিকারও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বিচারবহির্ভূত হত্যা কোনো সভ্যদেশের কাম্য হতে পারে না। সীমান্তে হত্যা শূন্যে আনতে হলে ভারতকে আন্তর্জাতিক চাপে রাখতে হবে। বিএসএফ-এর গুলী, নির্যাতনের ঘটনা সীমান্ত এলাকার বাসিন্দাদের মাঝে ক্ষোভ ও হতাশা বাড়াচ্ছে। ভুক্তভোগীরা বলছেন, বাংলাদেশ ছাড়াও ভারতের সঙ্গে চীন, নেপাল, ভুটান, পাকিস্তান ও মিয়ানমারের সীমান্ত থাকলেও গত ১০ বছরে এসব সীমান্তে কোনো বেসামরিক ব্যক্তি নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটেনি। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা অহরহ ঘটে চলেছে।
সীমান্ত এলাকার মানুষ বলছে, নানা সন্দেহ থেকে নিরীহ মানুষের ওপর গুলী চালায় বিএসএফ। সীমান্ত এলাকার মানুষ নানা প্রয়োজনে জিরো-লাইনের আশপাশে যান। অথচ বিএসএফ ওপার থেকে বিনা উসকানিতেই চোরাচালানি কিংবা মাদক ব্যবসায়ী মনে করে গুলী চালায়। এমন ঘটনাও আছে, গোয়াল ঘর থেকে গরু ছুটে সীমান্তের দিকে চলে গেছে। সেই গরু আনতে গিয়েও বিএসএফ-এর গুলী-নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। চোরাচালান, গরু পাচার, ফেনসিডিল বা মাদকদ্রব্য পাচার, ভারতীয় পণ্য বাংলাদেশে আনা এবং বাংলাদেশের কিছু পণ্য ভারতে নেওয়া-এমন কার্যক্রমের সন্দেহে অনেক বাংলাদেশীকে গুলী করে বিএসএফ। সীমান্ত অতিক্রম করলে বা সন্দেহভাজন মনে হলে আটক করতে পারে; কিন্তু এভাবে গুলী চালানো মেনে নেওয়া যায় না। ভুক্তভোগী বাসিন্দারা জানিয়েছেন, সীমান্তে অনুপ্রবেশও এর অন্যতম একটি কারণ। অনেক সময় সীমান্ত পার হয়ে বাংলাদেশিরা ভারতের অভ্যন্তরে ঢুকে পড়ে তাদের আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা করতে। কখনো কখনো কৃষিকাজ বা মৌসুমি শ্রমিক হিসাবে তারা ওপারে যায় অবৈধভাবে কাজের সন্ধানে। এই অনুপ্রবেশ রোধ করতে গিয়ে বিএসএফ গুলী চালায়।
যদিও আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী এমন পরিস্থিতিতে গুলী না করে গ্রেফতার করার কথা। এছাড়া সন্দেহজনক চলাফেরাও অন্যতম কারণ। কখনো সীমান্তে হাঁটাহাঁটি বা জমি চাষের সময় সাধারণ মানুষকে চোরাচালানকারী বা অনুপ্রবেশকারী সন্দেহে গুলী করা হয়। এতে নিরীহ সাধারণ মানুষও প্রাণ হারায়। সীমান্ত এলাকার মানুষ রাতের অন্ধকারে চলাচল করেন। এ সময় সন্দেহে গুলী চালায় বিএসএফ। সীমান্ত এলাকা জটিল ও জনবহুল হওয়ার কারণে কখনো কখনো ভুল বোঝাবুঝি থেকেও গুলী চালানো হয়। সাধারণ চাষিকে বা পথচারীকেও ‘অনুপ্রবেশকারী’ মনে করে গুলী চালানোর ঘটনা ঘটেছে।
২০২৫ সালে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) ও ভারতের নাগরিকদের হাতে বাংলাদেশিদের হত্যার সংখ্যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চে পৌঁছেছে, যদিও সীমান্ত হত্যা শূন্যে নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল ভারত। মানবাধিকার সংস্থা আসকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে বিএসএফের হাতে ৩৪ জন বাংলাদেশি নিহত হন-এর মধ্যে ২৪ জন গুলীতে এবং ১০ জন নির্যাতনের ফলে মারা যান। আগের বছরগুলোতে নিহতের সংখ্যা ছিল ২০২৪ সালে ৩০, ২০২৩ সালে ৩১, ২০২২ সালে ২৩ এবং ২০২১ সালে ১৮। এ ছাড়া ২০২৫ সালে সিলেট সীমান্ত এলাকায় ভারতের নাগরিকদের, বিশেষ করে খাসি জনগোষ্ঠীর সদস্যদের হাতে অন্তত ১২ জন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন বলে গণমাধ্যমের খবরে জানা গেছে। আসকের তথ্য অনুযায়ী, একই বছরে আরও অন্তত ৩৮ জন বাংলাদেশি গুলীবিদ্ধ বা নির্যাতনের শিকার হন এবং ১৪ জনকে বিএসএফ অপহরণ করে, যাদের মধ্যে মাত্র চারজনকে ফেরত পাঠানো হয়েছে। আসকের পর্যবেক্ষণে আরও উঠে এসেছে বিগত ১১ বছরে সীমান্তবর্তী এলাকাগুলো থেকে ধান কাটা, গরু চরানো, মাছ মারা ও গৃহস্থালির কাজ করা অবস্থায় ৩১৯ বাংলাদেশিকে ধরে নিয়ে গেছে বিএসএফ। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ধরে নিয়ে যাওয়া এই নাগরিকদের ভাগ্যে কী ঘটে, তা জানা যায় না। ধরে নিয়ে যাওয়া এই নাগরিকদের কতজন ফিরে আসেন, সেটাও থেকে যায় অজানা।
এদিকে সীমান্তে বাংলাদেশি হত্যা ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গে মুসলমানদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগের প্রতিবাদে গতকাল রোবাবর রাজধানীতে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে জাতীয় ছাত্রশক্তির জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (জবি) শাখা। এ সময় তারা দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি নিয়েও উদ্বেগ জানায়। গত শুক্রবার ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) গুলীতে দুই বাংলাদেশিকে নিহতের ঘটনায় নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার শনিবার বিবৃতিতে বলেছেন, বাংলাদেশ সরকারের দুর্বল পররাষ্ট্র নীতির কারণেই ভারত বারবার বাংলাদেশ সীমান্তে হত্যাকাণ্ডে ঘটাচ্ছে। জামায়াতের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বিএসএফ বাংলাদেশ সীমান্তে প্রায়ই বিনা কারণে হত্যাকাণ্ড ঘটায়। সীমান্তে হত্যাকাণ্ড শূন্যে নিয়ে আসতে ভারত বারবার প্রতিশ্রুতি দিলেও হত্যা বাড়ছে। এসব অন্যায় হত্যাকাণ্ডের বিচার না হওয়া খুবই উদ্বেগজনক। বাংলাদেশ সরকারের দুর্বল পররাষ্ট্র নীতির কারণেই ভারত বারবার বাংলাদেশ সীমান্তে হত্যাকাণ্ডে ঘটাচ্ছে। গোলাম পরওয়ার বলেছেন, বাংলাদেশের জনগণ প্রতিবেশীদের কাছে বন্ধুসুলভ আচরণ কামনা করে। জামায়াত আশা করে, ভারত সরকার হত্যা বন্ধ করবে। সব হত্যার সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষ তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেবে।
বিজিবির টহল: গত ১০ মে বিজিবির ফেনী ব্যাটালিয়ন (৪ বিজিবি) থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয় ফেনীর সীমান্ত এলাকায় সম্ভাব্য অবৈধ অনুপ্রবেশ (পুশ ইন) ও চোরাচালান প্রতিরোধে সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থা জারি করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। ফেনীস্থ ৪ বিজিবির আওতাধীন প্রায় ১০২ কিলোমিটার সীমান্তজুড়ে দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা টহল ও নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। বিজিবি জানায়, ভারতের পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন-পরবর্তী পরিস্থিতি বিবেচনায় সীমান্তের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে অতিরিক্ত মোবাইল পেট্রোল, ফুট পেট্রোল ও বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। একইসঙ্গে সব বিওপি ও টহল দলকে বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।