পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে কুরবানির পশুর হাট বসাতে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে সরকার ও সংশ্লিষ্ট সিটি কর্পোরেশনগুলো। এসব হাটে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে গরু, মহিষ আসতে শুরু করেছে। তবে এখনও পশু বিক্রি জমে ওঠেনি বলে জানিয়েছেন বিক্রেতারা। মূলত হাটগুলোতে বাঁশ-খুঁটি বসানোর কাজই চলছে। গরু গুলোকে খাবার দেওয়া আর বিশ্রামেই সময় পার করছেন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা বিক্রেতারা। এ বছর সারাদেশে ৩ হাজার ৬০০টির বেশি অস্থায়ী ও স্থায়ী পশুর হাট বসানো হবে।

জানা গেছে, ঈদুল আজহা উপলক্ষে রাজধানী ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনের আওতাধীন এলাকায় এবার ২৭টি অস্থায়ী পশুর হাট বসবে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশ ডিএসসিসিনের আওতায় থাকছে ১১টি হাট। অপরদিকে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন ডিএনসিসির এলাকায় ১৬টি হাট বসবে। এদিকে প্রচলিত হাটের পাশাপাশি অনলাইন ও খামারভিত্তিক বিক্রয়েও ক্রেতাদের আগ্রহ আগের তুলনায় আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। অনেকে বাড়ি থেকে পশু বাছাই করতে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করছেন।

গাবতলীর হাটে কুষ্টিয়া থেকে গরু নিয়ে এসেছেন কফিল উদ্দিন। তিনি বলেন, আমি দুইটা গরু নিয়ে এসেছি। ১০ লাখ টাকা দাম চাচ্ছি। কেউ কেউ দাম বলছে। নেওয়ার মতো এখনেও ক্রেতা আসেনি। আরেক গরু বিক্রেতা আবুল হোসেন বলেন, গরু তো আসা শুরু হচ্ছে। কিন্তু এখনো সেই ভিড় শুরু হয়নি। গরু আসলে কাস্টমার আসবেই।

এদিকে কেরানীগঞ্জের লাকীচর এলাকা থেকে বিশাল আকারের এক মহিষ নিয়ে হাটে এসেছেন মজিবুর রহমান নামে এক বিক্রেতা। প্রায় এক টন ওজনের এই মহিষটি ক্রেতা ও দর্শনার্থীদের নজর কাড়ছে। মজিবুর রহমান জানান, শক্তিশালী গঠন ও বড় আকৃতির কারণে মহিষটির দাম হাঁকা হচ্ছে প্রায় ২৫ লাখ টাকা। তিনি বলেন, খামার থেকে হাট পর্যন্ত আনার খরচ ও যতেœর কারণে দাম কিছুটা বেশি চাওয়া হচ্ছে। সব মিলিয়ে লাকীচর থেকে আনা এই বিশাল মহিষকে ঘিরে হাটে বাড়তি আগ্রহ ও আলোচনা তৈরি হয়েছে। এই মহিষের সঙ্গে গরু ফ্রি দেওয়ার ঘোষণা দিয়ে তিনি বলেন, মহিষ যিনি নেবেন তাকে আলাদা করে গরু কিনতে হবে না। দুই মণ ওজনের সাদা রঙের গরুটি ক্রেতা আকর্ষণের জন্য ফ্রি দিচ্ছেন বলেও জানান এই বিক্রেতা।

এদিকে প্রতিবছর কুরবানির ঈদ এলেই ভারতীয় গরুর আধিপত্য দেখা যেত পশুর হাটে; এবারের দৃশ্যপট ভিন্ন। কুরবানির হাটে এবার ভারতীয় গরুর দেখা নেই বললেই চলে। এসব হাট ছোট-বড় দেশীয় গরুর দখলে। ভারতীয় গরু না আসায় গৃহস্থ ও খামারিদের মাঝে স্বস্তি দেখা গেছে। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে জেলায় পালন করা গরু চলে যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন জেলায়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন প্রতিবছর কুরবানির ঈদের আগে বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে অবাধে ভারতীয় গরু ঢুকে সয়লাব হয়ে যেত বিভিন্ন এলাকার কুরবানির পশুর হাট। কিন্তু এবার বদলে গেছে সেই চিত্র। কুরবানির পশুর হাট ভরে গেছে দেশীয় গরুতে।

ডিএসসিসি’র প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা মোহাম্মদ মোবাশ্বের হাসান জানান, ডিএসসিসি’র আওতাধীন অস্থায়ী হাটগুলো বসবে পোস্তগোলা শ্মশানঘাটের পশ্চিমাংশে নদীর পাড়ের খালি জায়গা, উত্তর শাহজাহানপুর রেলওয়ে কলোনী সংলগ্ন মৈত্রী সংঘের মাঠ, রহমতগঞ্জ ক্লাবের খালি স্থান, আমুলিয়া মডেল টাউনের খালি জায়গা ও শ্যামপুর কদমতলী ট্রাকস্ট্যান্ড এলাকায়। এছাড়া আফতাবনগরের বিভিন্ন ব্লক, শিকদার মেডিকেল সংলগ্ন এলাকা, কাজলা ব্রিজ থেকে মাতুয়াইল পর্যন্ত রাস্তার খালি জায়গা, দয়াগঞ্জ থেকে জুরাইন রেলক্রসিং পর্যন্ত রাস্তার স্থান, বনশ্রী হাউজিংয়ের খালি এলাকা, ব্রাদার্স ইউনিয়ন ক্লাবের পাশ্ববর্তী জমি ও গোলাপবাগ স্টাফ কোয়ার্টারের উত্তর দিকে অস্থায়ী হাট বসানো হবে।

অন্যদিকে, ডিএনসিসি’র অস্থায়ী হাটগুলো হবে মিরপুর সেকশন-৬ (ইস্টার্ন হাউজিং) এলাকায়, মিরপুর কালশী বালুর মাঠের ১৬ বিঘা খালি জায়গায়, ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট-সংলগ্ন এলাকায়, মেরুল বাড্ডা কাঁচাবাজার সংলগ্ন খালি জায়গায় ও পূর্ব হাজীপাড়ায় ইকরা মাদ্রাসার পাশের খালি জায়গায়। এ ছাড়া মোহাম্মদপুরের বছিলায় ৪০ ফুট রাস্তা-সংলগ্ন খালি জায়গায়, উত্তরা দিয়াবাড়ির ১৬ ও ১৮ নম্বর সেক্টরুসংলগ্ন বউবাজার এলাকায়, ভাটুলিয়া সাহেব আলী মাদ্রাসা থেকে ১০ নম্বর সেক্টর রানাভোলা অ্যাভিনিউ-সংলগ্ন উত্তরা রানাভোলা স্লুইসগেট পর্যন্ত এলাকায়, কাঁচকুড়া বাজারুসংলগ্ন রহমান নগর আবাসিক এলাকায়, মস্তুল চেকপোস্ট-সংলগ্ন পশ্চিম পাড়ায়, ভাটারা সুতিভোলা খাল-সংলগ্ন খালি জায়গায়, বনরূপা আবাসিক প্রকল্পের খালি জায়গা, মহাখালি টিএন্ডটি মাঠের জায়গা, বাড্ডা থানাধীন স্বদেশ প্রপার্টিও খালি জায়গা ও বড় বেরাইদ বসুন্ধরা গ্রুপের খালি জায়গায় পশুর হাট বসবে।

কোরবানির পশুর হাটে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করছে দুই সিটি কর্পোরেশন। সাদা পোশাকে পুলিশ মোতায়েন থাকবে এবং প্রতিটি বড় হাটে একাধিক ভেটেরিনারি মেডিকেল টিম থাকবে যারা প্রতিটি পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করবে। মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষার সনদ ছাড়া কোনো পশুকে হাটে তোলা যাবে না। নিরাপত্তার পাশাপাশি যানজট নিয়ন্ত্রণ, বর্জ্য অপসারণ ও পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে সিটি কর্পোরেশনগুলো আলাদা টাস্কফোর্স গঠন করতে যাচ্ছে।

প্রত্যেক হাটে আলো, পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা উন্নত করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে অস্থায়ী হাটগুলোতে দ্রুত বর্জ্য অপসারণ ও পরিবেশ দূষণ রোধে আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ব্যবহারের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে ট্রাফিক বিভাগ বিশেষ পরিকল্পনা নিয়েছে যাতে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি না হয়।

এদিকে কুরবানির পশুর হাটের পাশাপাশি অনলাইনে গরু-ছাগল কেনাবেচা এখন ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। খামার মালিকদের অনেকেই নিজস্ব ফেসবুক পেজ, ওয়েবসাইট ও ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করছেন। অনলাইনে পশু কেনাবেচার ক্ষেত্রে গ্রাহকদের কোনো অতিরিক্ত ‘হাসিল’ বা খাজনা দিতে হবে না বলে মন্ত্রণালয় জানিয়েছে। ক্রেতারা অনলাইনে পশুর ছবি, ভিডিও, ওজন, খাদ্যতালিকা ও খামারের অবস্থানকে দেখে সহজেই সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন। এতে সময় বাঁচছে, হাটের ভিড়ও এড়ানো যাচ্ছে। বিশেষত যেসব ক্রেতা নিরাপত্তা বা স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণে হাটে যেতে চান না, তাদের জন্য ডিজিটাল হাট একটি বড় সুবিধা হিসেবে কাজ করছে। রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকার খামারগুলোতে ইতোমধ্যে ক্রেতাদের ভিড় বাড়তে শুরু করেছে।