• চামড়া সংরক্ষণে এতিমখানা ও লিল্লাহ বোর্ডিংয়ে বিনামূল্যে লবণ বিতরণ
  • ব্যবসায়ীদের জন্য বিশেষ ঋণ সুবিধা এবং বিসিকে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ
  • পাচার রোধ ও চামড়া সন্ত্রাসীদের রুখতে তৎপরতা

কুরবানির পশুর চামড়ার বাজারে অশুভ সিন্ডিকেট এবং কওমি মাদরাসার অর্থনৈতিক মেরুদন্ড ভেঙে দেওয়ার জন্য বিগত আওয়ামী লীগ সরকার গরীবের হক নিয়ে ছিনিমিনি খেলেছিল। মাদ্রাসা শিক্ষার প্রতি একধরনের বিদ্বেষ থেকে এটা করেছিল আওয়ামলীগ এমনটাই মনে করছে ভুক্তভোগীরা। তবে এবার গরীবের হক যথাযথভাবে বুঝিয়ে দেয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। কুরবানির পশুর চামড়ার যথাযথ ব্যবহার ও ন্যায্য দাম নিশ্চিতে কাজ করে যাচ্ছে সংশ্লিষ্টরা। এছাড়া কুরবানির পশুর চামড়া পাচার রোধে এবং চামড়া সন্ত্রাসীরা যাতে মাথাছাড়া দিয়ে না উঠতে পারে সেজন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা তৎপর থাকবে।

এরই ধারাবাহিকতায় পবিত্র ঈদুল আযহাকে সামনে রেখে কুরবানির পশুর চামড়া সংরক্ষণে সারাদেশে মাদ্রাসা, এতিমখানা ও লিল্লাহ বোর্ডিংয়ে বিনামূল্যে লবণ বিতরণ, চামড়া ব্যবসায়ীদের জন্য বিশেষ ঋণ সুবিধা এবং বিসিক চামড়া শিল্পনগরীতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে একাধিক উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চামড়া শিল্পের চলমান সংকট মোকাবিলা এবং মানসম্মত কাঁচা চামড়া সংরক্ষণের লক্ষ্যে গঠিত টাস্কফোর্স এসব তথ্য নিশ্চিত করেছে।

চামড়া শিল্পখাতের উন্নয়নে সুপারিশ প্রদান ও কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন সংক্রান্ত টাস্কফোর্স সূত্রে জানা গেছে, কুরবানির পশুর চামড়া যাতে নষ্ট না হয় সেজন্য সরকারি অর্থায়নে সারাদেশে মাদ্রাসা, এতিমখানা ও লিল্লাহ বোর্ডিংয়ে বিনামূল্যে লবণ পৌঁছে দেওয়া হবে। এ লক্ষ্যে ইতোমধ্যে ১৭ কোটি ৬০ লাখ টাকার লবণ ক্রয়ের কার্যক্রম শুরু হয়েছে।

একই সঙ্গে কুরবানির চামড়া সঠিকভাবে ছাড়ানো ও সংরক্ষণের ক্ষেত্রে শ্রমিকদের দক্ষতা বাড়াতে গোশত শ্রমিক ও মসজিদের ইমামদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও করা হয়েছে। সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত এ প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের লক্ষ্য-চামড়া নষ্ট হওয়া কমিয়ে মান উন্নয়ন নিশ্চিত করা।

গত বছর ৯ হাজার ৩৩০টি মাদ্রাসা, এতিমখানা ও লিল্লাহ বোর্ডিংয়ের জন্য বরাদ্দ ২০ কোটি টাকার মধ্যে ১১ হাজার ৫৭১ মেট্রিক টন লবণ ক্রয়ের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। জেলা পর্যায়ের প্রকৃত চাহিদা অনুযায়ী শেষ পর্যন্ত ৮ হাজার ৯৬ মেট্রিক টন লবণ বিতরণ করা হয়। ফলে প্রায় ১৩ লাখ ৭৯ হাজার ৯২৩টি চামড়া সফলভাবে সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এবার কুরবানিযোগ্য গবাদিপশুর সংখ্যা ১ কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজার ৮৪০টি। এর মধ্যে গরু ও মহিষ প্রায় ৫৭ লাখ, ছাগল ও ভেড়া ৬৬ লাখ এবং অন্যান্য পশু প্রায় সাড়ে ৫ হাজার। এ বছর কুরবানির চাহিদা এক কোটির কিছু বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

প্রাথমিক হিসাবে চামড়া সংরক্ষণে ৮০ থেকে ৮৫ হাজার মেট্রিক টন লবণের প্রয়োজন হতে পারে। গত বছর এ খাতে প্রায় ৭০ হাজার মেট্রিক টন লবণ ব্যবহৃত হয়েছিল।

টাস্কফোর্স জানিয়েছে, জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়সহ পশুর হাট এবং স্থানীয় দোকানগুলোতে পর্যাপ্ত লবণ সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি সারাদেশের লবণ ডিলার ও মিল মালিকদের তালিকাও সরবরাহ করা হবে।

এ ছাড়া চামড়া সংগ্রহ ও বাজার ব্যবস্থাপনা আরও শক্তিশালী করতে দেশব্যাপী চামড়া আড়তদার ও ব্যবসায়ীদের একটি খসড়া ডাটাবেজও প্রস্তুত করা হয়েছে। ভবিষ্যতে তাদের নিবন্ধনের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।

এদিকে, কুরবানির মৌসুমে চামড়া কেনা ও সংরক্ষণের জন্য ব্যবসায়ীদের আর্থিক সক্ষমতা বাড়াতে বিশেষ ঋণ সুবিধা ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

গত ৫ মে জারি করা প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, পুনঃতফসিল বা খেলাপি ঋণ থাকা চামড়া ব্যবসায়ীরাও আগামী ৩০ জুন পর্যন্ত খেলাপি অবস্থায় থেকেই নতুন মূলধনী ঋণ নিতে পারবেন। এ ছাড়া ব্যাংকগুলোকে চলতি বছর চামড়া খাতে ঋণ বিতরণের নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করতে বলা হয়েছে, যা কোনোভাবেই ২০২৫ সালের চেয়ে কম হতে পারবে না।

চামড়া শিল্পের উৎপাদন কার্যক্রম সচল রাখতে বিসিক চামড়া শিল্পনগরী, ঢাকায় ঈদের পরবর্তী তিন মাস নিরবচ্ছিন্ন ও নির্ধারিত ভোল্টেজে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিতের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে পবিস-৩, আরইবি এবং পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।

এ ছাড়া সিইটিপিতে ডেডিকেটেড এক্সপ্রেস ফিডার লাইনের মাধ্যমে সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎ সরবরাহ চালু রাখা, শিল্পনগরী ও সিইটিপিতে জরুরি নিয়ন্ত্রণ কক্ষ চালু রাখা এবং সাভার গ্রিড থেকে বিশেষ লোড বরাদ্দের বিষয়েও গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

এক পরিসংখ্যানে জানা গেছে , ২০১৩ সালের পর থেকে চামড়ার বাজারে যে ধস নেমেছে, তার মূল লক্ষ্য ছিল কওমি মাদরাসা। ২০১৩ সালে প্রতি বর্গফুট গরুর চামড়ার দাম ছিল ৮০-৯০ টাকা। এটি বর্তমানে মাত্র ৫০-৬০ টাকায় নামিয়ে আনা হয়েছে। গত এক দশকে সবকিছুর দাম বাড়লেও চামড়ার দাম কেন অর্ধেক হলো, সেই প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, মাদরাসাগুলোকে অর্থাভাবে মুখ থুবড়ে ফেলাই ছিল এই সিন্ডিকেটের মূল লক্ষ্য।

সূত্র জানায় , বর্তমানে চামড়া শিল্প গুটিকয়েক ট্যানারি মালিকের হাতে জিম্মি। এর ফলে প্রতি বছর কওমি মাদরাসাগুলো অন্তত ৩০০ থেকে ৩৫০ কোটি টাকা কম আয় করছে। ২০১৩ সালের হিসাবে যেখানে আয় হওয়ার কথা ছিল ৭৮০ কোটি টাকা, সেখানে বর্তমানে তা মাত্র ৪৭০ কোটি টাকায় ঠেকেছে।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ গতকাল বৃহস্পতিবার ‘কুরবানি বিষয়ক প্রশিক্ষণ কর্মশালায় বলেছেন, কুরবানির পশুর মাংসের পাশাপাশি চামড়া ও অন্যান্য উপজাত সঠিকভাবে সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা করা গেলে জাতীয় অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখা সম্ভব।

আমিন উর রশিদ বলেন, কুরবানিকে কেন্দ্র করে বিপুলসংখ্যক মানুষ পশু জবাই, চামড়া ছাড়ানো, গোশত প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বণ্টনের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকে। এ বাস্তবতায় দক্ষ জনবল তৈরির বিকল্প নেই। বিশেষ করে চামড়া ছাড়ানোর মতো সংবেদনশীল কাজে প্রশিক্ষিত জনবল না থাকলে চামড়ার গুণগত মান ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং এর বাজারমূল্য কমে যায়।

তিনি বলেন, দেশের মাদ্রাসার শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্ট তরুণদের প্রশিক্ষণের আওতায় এনে কুরবানির সময় দক্ষ জনবল তৈরি করা যেতে পারে। এতে একদিকে চামড়ার গুণগত মান উন্নত হবে, অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের কর্মদক্ষতা ও স্বল্পমেয়াদি আয়ের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

মন্ত্রী বলেন, সরকার প্রয়োজনে সারা বছরব্যাপী প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনার বিষয়টি বিবেচনা করবে, যাতে কুরবানির সময় দক্ষতার অভাব না থাকে।

তিনি বলেন, কুরবানির চামড়া অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মাদ্রাসায় দান করা হয়। এ বাস্তবতায় চামড়া সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় লবণ সরবরাহসহ সরকারি সহায়তা অব্যাহত রয়েছে। সঠিকভাবে চর্বি পরিষ্কার, লবণ প্রয়োগ ও সংরক্ষণ নিশ্চিত করা গেলে চামড়ার গুণগত মান বৃদ্ধি পাবে এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের ক্ষেত্র আরও সম্প্রসারিত হবে।

কৃষিমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ বর্তমানে কুরবানিযোগ্য পশু উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং দেশীয় উৎপাদন দেশের চাহিদা পূরণে সক্ষম।

দেশীয় খামারিদের সুরক্ষা ও জাতীয় স্বার্থে অবৈধভাবে পাচার বা চোরাই পথে আসা পশু ক্রয়ের বিষয়ে সচেতনতা প্রয়োজন উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশের খামারিদের স্বার্থ রক্ষায় সবাইকে দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে।

আমিন উর রশিদ আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন- জনগণের সচেতনতা, প্রশিক্ষণ ও সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে কুরবানির ব্যবস্থাপনা আরও উন্নত হবে এবং জাতীয় অর্থনীতিতে প্রাণিসম্পদ খাতের অবদান আরও বাড়বে।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেন, অবৈধভাবে আসা পশু ক্রয় করে কুরবানি দেওয়া কতটা সমীচীন-এ বিষয়ে ধর্মীয় ও সামাজিকভাবে সচেতনতা তৈরি প্রয়োজন।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, কুরবানির পশু ক্রয় ও ব্যবস্থাপনায় সচেতনতা বৃদ্ধি, দেশীয় খামারিদের সুরক্ষা এবং চামড়া সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি।