- নতুন নাম এসআরএফ অথবা এসআরবি নিয়ে আলোচনা
র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) নামে কোনো বাহিনী আর থাকছে না। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় দীর্ঘ দিনের অভিজ্ঞ এই এলিট ফোর্সটির প্রয়োজন মনে করছে সরকার। সে কারণে নাম পরিবর্তন করে বাহিনীটিকে নতুন নাম দেয়া হচ্ছে। বাহিনীর কাঠামোতে কিছুটা পরিবর্তন করে কার্যক্রম পরিচালনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয়। তবে বাহিনীর নাম কি হবে সেবিষয়ে এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি। স্পেশাল রেসপন্স ফোর্স (এসআরএফ) অথবা স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) নামে পুলিশের অধীনে নতুন ইউনিট গঠনের প্রস্তাব দিয়ে পৃথক আইনের খসড়া তৈরি করছে মন্ত্রণালয়। দু‘টি নামের মধ্যে একটি রেখে বাহিনীটি নতুন করে যাত্রা শুরু করতে যাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (সংশোধনী) আইন, ২০০৩-এর মাধ্যমে র্যাব গঠন করা হয়েছিল। নতুন আইনের খসড়া নিয়ে গত রোববার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি বৈঠক হয়েছে। বৈঠকে উপস্থিত একাধিক কর্মকর্তা জানান, র্যাবকে নামমাত্র পুলিশের অধীনে না রেখে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৪ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসের প্যারেডে অংশগ্রহণের মাধ্যমে এই ইউনিটের আত্মপ্রকাশ ঘটে। প্রথম অপারেশনাল দায়িত্ব পালন শুরু হয় ওই বছরের ১৪ এপ্রিল রমনা বটমূলে পয়লা বৈশাখের অনুষ্ঠানে নিরাপত্তা দেয়ার মধ্য দিয়ে। এরপর ওই বছরের ২১ জুন থেকে র্যাব পূর্ণাঙ্গভাবে অপারেশনাল কার্যক্রম শুরু করে।
বাহিনী হিসেবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় একসময়ে সর্বমহলে বাপক প্রশংসিত ছিল র্যাব। পরবর্তীতে এই বাহিনীটির বিরুদ্ধে বিরোধী মত দমনে পতিত আওয়ামীী লীগ সরকারের প্রাইভেট বাহিনী হিসেবে ব্যবহার হওয়ার অভিযোগ ওঠে। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম, খুন এবং আয়নাঘরে চরম নির্যাতনের অভিযোগে দেশে-বিদেশে ব্যাপক সমালোচিত হয়। মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ এনে র্যাব বিলুপ্তির সুপারিশ করে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআর ডব্লিউ)। তারা র্যাবকে একটি “ডেথ স্কোয়াড” হিসেবে উল্লেখ করে এটি পুরোপুরি বন্ধ করার দাবি জানায়। এছাড়া মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে সংস্থাটির সাবেক ডিজিসহ সাতজন শীর্ষ কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় সম্পদ অবরুদ্ধ করণ এবং মার্কিন ব্যক্তিদের সাথে লেনদেন নিষিদ্ধ করা হয়, যা এখনো বহাল রয়েছে। পাঁচ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের পর গঠিত গুম কমিশনও র্যাব বিলুপ্তির সুপারিশ করে। এছাড়া সম্প্রতি র্যাব বিলুপ্তির আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে চিঠি লিখেছে ৯ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন।
নিউইয়র্কভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠনটি বাংলাদেশের সংস্কার নিয়ে একটি প্রতিবেদনে এ সুপারিশ করে। প্রতিবেদনটির শিরোনাম ছিল ‘আফটার দ্য মুনসুন রেভুলেশন: আ রোডম্যাপ টু লাস্টিং সিকিউরিটি সেক্টর রিফর্ম ইন বাংলাদেশ’। প্রকাশিত ৫০ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারের উচিত জাতীয় তদন্ত কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) বিলুপ্ত করার পদক্ষেপ নেওয়া। এই ইউনিট পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সদস্যদের সমন্বয়ে গঠিত এবং বহুবার তারা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, নির্যাতন এবং গুমের ঘটনায় অভিযুক্ত হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নতুন আইনের খসড়ায় র্যাবের কার্যক্রমের এলাকা কমানোর বিষয়েও আলোচনা হয়েছে বৈঠকে। এখন র্যাব সারা দেশে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। সেটি কেবল মহানগর এলাকায় সীমাবদ্ধ করা যায় কি না, এমন আলোচনাও এসেছে। তবে মহানগর এলাকায় পুলিশের আলাদা ইউনিট ও বাড়তি জনবল থাকার পরও সেখানে র্যাবের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ করার চিন্তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। বরং জেলা পুলিশে যেখানে জনবলের ঘাটতি, সেখানে র্যাবের কার্যক্রম বিস্তৃত করা জরুরি বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রটি জানিয়েছে, খসড়াটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আরেকটি সভায় সবার মতামত নিয়ে নতুন নামে আসা আইনের খসড়া চূড়ান্ত করা হতে পারে। খসড়ায় মোট ৯টি অধ্যায়ে ২৯টি ধারা রাখা হয়েছে। এর মধ্যে ইউনিটের গঠন, দায়িত্ব, তল্লাশি ও গ্রেপ্তার, ফৌজদারি অপরাধের তদন্ত, সদস্যদের অপরাধ ও শাস্তি, শৃঙ্খলা, অভিযোগ প্রতিকার, প্রশিক্ষণ এবং পুরোনো র্যাবের সম্পদ ও সদস্য স্থানান্তরের বিধান রয়েছে। প্রস্তাবিত কাঠামো কার্যকর হলে র্যাব নামটি বিলুপ্ত হলেও বাহিনীটির সদস্য, স্থাপনা, অস্ত্র, সরঞ্জাম, মামলা, চুক্তি, দায়দেনা ও কার্যক্রম নতুন ইউনিটের অধীনে চলে যাবে। ফলে এটি কার্যত র্যাবের বিলুপ্তি নয়; বরং নাম বদলে পৃথক আইনের অধীনে পুনর্গঠন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
সূত্র জানায়, রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপিও অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সাংবাদিক সম্মেলন করে র্যাব বিলুপ্ত করার সুপারিশ করেছিল। আইনের খসড়া অনুযায়ী, নতুন প্রস্তাবিত ইউনিটটি বাংলাদেশ পুলিশের অধীনে একটি বিশেষায়িত ইউনিট হিসেবে কাজ করবে। আগের মতোই এর মহাপরিচালক হবেন বাংলাদেশ পুলিশে কর্মরত অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা। সরকার তাকে নিয়োগ দেবে। মহাপরিচালক সরকারের অনুমোদন নিয়ে ইউনিটকে ব্যাটালিয়ন, কোম্পানি, প্লাটুন ও সেকশনে ভাগ করতে পারবেন।
র্যাব বিলুপ্তির প্রস্তাবনার বিষয়ে এক কর্মকর্তা জানান, ২০০৩ সালে বাংলাদেশ পুলিশ, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, বাংলাদেশ নৌবাহিনী, বাংলাদেশ বিমান বাহিনী, বাংলাদেশ আনসার ও ভিডিপি, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (তৎকালীন বিডিআর) ও বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড সদস্যদের নিয়ে র্যাব গঠিত হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় এ বাহিনীটি শুরুর দিকে অভাবনীয় সাফল্য দেখিয়ে দেশবাসীর নজর কাড়ে। তবে, শেখ হাসিনার সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে বাহিনীটি নিপীড়কের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। সেই সময়ে নারায়ণগঞ্জের সেভেন মার্ডার, কক্সবাজারের আলোচিত একরামুলসহ বিরোধী দল ও মতের নাগরিকদের ক্রস ফায়ারে হত্যা, গুম ও খুনের শত শত ঘটনা রেকর্ড করে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো। র্যাবের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত নিষেধাজ্ঞা এখনো বহাল রয়েছে। খুব শিগগির এ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের কোনো আশাও দেখছেন না বলে জানান ওই কর্মকর্তা। র্যাব গঠনের আইন রহিতের বিল তৈরির সময় এসব যুক্তিকে পর্যালোচনায় নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
কিছু দিন আগে র্যাব মহাপরিচালক আহসান হাবীব পলাশ সাংবাদিকদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় বলেছেন, র্যাব বিলুপ্তি বা পুনর্গঠনের দায়িত্ব সরকারের এবং এ ক্ষেত্রে এ সংস্থাটির নিজস্ব কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এক প্রশ্নের জবাবে র্যাব মহাপরিচালক বলেন, বিচার প্রক্রিয়ার সঙ্গে যেকোনো বিষয়ে আমাদের সহায়তা চাওয়া হলে আমরা সর্বোচ্চ সহায়তা করব। আমাদের কাছে যেটুকু তথ্য থাকবে তার ভিত্তিতে সহায়তা করব। আমি চাই ব্যক্তিগতভাবে র্যাব পেশাদার, মানবিক ও প্রযুক্তিনির্ভর একটা সংস্থা হিসেবে গড়ে উঠুক। র্যাব আগামীতে অত্যন্ত দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে পারবে বলে আমি বিশ্বাস করি।