সুন্দরবনের পরিবেশ এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি নিরাপদ। নিয়মিত টহল ও কড়া নজরদারির কারণে মানুষের চলাচল কমেছে, ফলে বাঘগুলো তাদের স্বাভাবিক আচরণে আরও স্বচ্ছন্দ হয়ে উঠছে। এটি ঠিক যে, আগের তুলনায় সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা কিছুটা বেড়েছে এবং অতীতে বাঘ পিটিয়ে হত্যার যে বর্বর সংস্কৃতি ছিল, তাও অনেকটা কমে এসেছে। কিন্তু বন বিভাগের এই স্বস্তিদায়ক দাবির আড়ালেই লুকিয়ে আছে এক গভীর ও অস্বস্তিকর বাস্তবতা। জঙ্গলের গভীরে বাঘের প্রধান খাদ্য সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। আর সেই খাদ্যসংকটের কারণেই পেটের টানে বাঘ বাধ্য হয়ে লোকালয় বা বনের কিনারে চলে আসছে। একদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের নীরব ও ধ্বংসাত্মক আঘাত, অন্যদিকে বেপরোয়া চোরাশিকারÑএই দুই প্রধান হুমকি সুন্দরবনকে বাঘের জন্য নিরাপদ আবাসস্থল হিসেবে টিকিয়ে রাখার পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবেশবিদ ও বিশেষজ্ঞরা পরিষ্কার ভাষায় বলছেন, বন ব্যবস্থাপনায় অবিলম্বে কঠোর সুশাসন নিশ্চিত করা না গেলে এই বহুমুখী সংকট মোকাবিলা করা আগামী দিনে অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে।

শুমারির বিবর্তন ও বর্তমান চিত্র : অতীতে সুন্দরবনে বাঘ গণনার পদ্ধতি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং কিছুটা অনুমানের ওপর নির্ভরশীল। সে সময় কাদামাটিতে বাঘের পায়ের ছাপ পর্যবেক্ষণ করে সংখ্যা নির্ধারণ করা হতো। উদাহরণস্বরূপ, ২০০৪ সালের শুমারিতে বাঘের সংখ্যা দেখানো হয়েছিল ৪৪০টি। কিন্তু পদ্ধতিগত নানা ত্রুটির কারণে সেই শুমারিগুলো বরাবরই বিতর্ক ও প্রশ্নের মুখে পড়েছিল। সময়ের পরিবর্তনে বাঘ গণনায় এখন আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত আধুনিক ‘ক্যামেরা ট্র্যাপিং’ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে।

খুলনার বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ জানান, ২০১৪ সাল থেকে সুন্দরবনের চারটি রেঞ্জকে প্রায় সাড়ে ছয়শ’ গ্রিডে ভাগ করে এই ক্যামেরাগুলো স্থাপন করা হয়। দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় প্রায় ১০ লাখ ছবি বিশ্লেষণ করা হয়। প্রতিটি বাঘের শরীরের স্বতন্ত্র ডোরাকাটা নকশা বা স্ট্রাইপ নিখুঁতভাবে শনাক্ত করে আলাদা প্রাণী হিসেবে তাদের গণনা করা হয়েছে। ক্যামেরার ফ্রেমে ১৯টি শাবকের উপস্থিতি মিললেও বনের কঠোর ও প্রতিকূল পরিবেশে অনেক শাবকই পূর্ণবয়স্ক হওয়ার আগেই মারা যায়। ফলে বৈজ্ঞানিক মানদন্ড ও সতর্কতার অংশ হিসেবে সেগুলোকে মূল গণনার বাইরে রাখা হয়েছে। সাম্প্রতিক ২০২৩-২৪ সালের সর্বশেষ শুমারির চূড়ান্ত তথ্য অনুযায়ী, সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশে বর্তমানে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২৫টিতে।

সপ্তাহের ব্যবধানে বিরল দুই দৃশ্য : সংখ্যায় বাঘ বাড়ার এই খবরের সত্যতা যেন মিলল গত এক সপ্তাহের বাস্তব অভিজ্ঞতায়। বনকর্মীদের ঠিক সামনে পরপর দু’বার বাঘের বিরল ও রাজসিক উপস্থিতি গোটা দেশবাসীর নজর কেড়েছে।

প্রথম ঘটনা: শুক্রবার দুপুরে বাগেরহাটের মোংলা উপজেলার চাঁদপাই রেঞ্জের আন্ধারমানিক ইকোট্যুরিজম কেন্দ্রের বন কার্যালয়ের সামনে হঠাৎ উদয় হয় এক পূর্ণবয়স্ক বাঘিনীর। প্রায় ১৫ মিনিট ধরে সে অত্যন্ত রাজসিক ভঙ্গিতে চারপাশ ঘুরে বেড়ায়। জোয়ারের সময় নদীঘেঁষে উঠে আসা বাঘিনীটি কিছুক্ষণ চারপাশের পরিবেশ গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে অত্যন্ত ধীরপায়ে আবার গহীন জঙ্গলে ফিরে যায়। বনকর্মী শ্যামল কুমার পালের নজরে এলে তার সহকর্মী ইমতিয়াজ মাসরুর এই দুর্লভ মুহূর্তটি ক্যামেরাবন্দী করেন।

দ্বিতীয় ঘটনা: এর মাত্র দুই দিন পর রোববার সকালে পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জের কচিখালী অভয়ারণ্য কেন্দ্রের টাইগার পয়েন্ট এলাকায় খাল সাঁতরে পার হওয়ার সময় আরেকটি বাঘ আকস্মিকভাবে বনরক্ষীদের সামনে পড়ে যায়। বন বিভাগের স্মার্ট টিমের বোটচালক সাইফুর রহমান সাহসিকতার সঙ্গে সেই অভূতপূর্ব দৃশ্যটি ক্যামেরাবন্দী করেন।

সংকটের গভীরে খাদ্যসংকট ও চোরাশিকার : বন বিভাগ বাঘের পর্যাপ্ত খাদ্যের কথা বলে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেও, সুন্দরবনের ভেতরের প্রকৃত চিত্রটি বেশ উদ্বেগজনক। বাঘের প্রধান খাদ্য হলো চিত্রা হরিণ ও বুনো শূকর। কিন্তু মোংলা, শরণখোলা, কয়রা ও শ্যামনগরকেন্দ্রিক সংঘবদ্ধ ও বেপরোয়া শিকারিচক্রের কারণে সুন্দরবনে আশঙ্কাজনকভাবে কমছে হরিণের সংখ্যা।

বন বিভাগের নিয়মিত অভিযানেও থামানো যাচ্ছে না এই অপতৎপরতা। প্রতিনিয়ত উদ্ধার করা হচ্ছে হাজার হাজার মিটার নাইলনের ফাঁদ। এসব নীরব ঘাতক ফাঁদে আটকা পড়ে শুধু হরিণই নয়, প্রায়ই মারাত্মকভাবে আহত হচ্ছে স্বয়ং বাঘও। সম্প্রতি এ ধরনের একটি নাইলনের ফাঁদে আটকা পড়ে আহত হওয়া এক বাঘিনীকে উদ্ধার করে দীর্ঘ চিকিৎসায় সুস্থ করে বনে অবমুক্ত করা হয়েছিল। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, বনে ফিরে যাওয়ার পর আর কখনোই তার কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। বনের ভেতরে খাদ্যপ্রাণীর এই ক্রমাগত ঘাটতি দেখা দিলে বাঘ স্বাভাবিকভাবেই লোকালয়ের কাছাকাছি চলে আসে, যা মানুষ ও বন্য প্রাণীর সংঘাতের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ : জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্র আজ মারাত্মক হুমকির মুখে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং সুন্দরবনজুড়ে লবণাক্ততার মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় বাঘ ও হরিণের নিরাপদ আশ্রয়স্থল এবং সুপেয় মিঠাপানির প্রাকৃতিক উৎসগুলো ক্রমান্বয়ে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। যদিও বন বিভাগ বাঘের জন্য ২০টি কৃত্রিম উঁচু কিল্লা এবং মিঠাপানির পুকুর খনন করেছে, তবে সুন্দরবনের সুবিশাল পরিসরের তুলনায় তা অত্যন্ত অপ্রতুল। আশার কথা হলো, মানুষ ও বাঘের মধ্যকার সরাসরি সংঘাত অতীতের তুলনায় অনেকটাই কমে এসেছে। সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) এজেডএম হাছানুজ্জামান জানান, সুন্দরবন সংলগ্ন প্রায় ৭৪ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে নাইলনের রোপ ফেন্সিং বা তারের বেড়া স্থাপন, ভিলেজ টাইগার রেসপন্স টিম গঠন, কমিউনিটি পেট্রোলিং এবং নিয়মিত সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনার ফলে এই সংঘাত আজ উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা ও দীর্ঘমেয়াদি ভাবনা : বর্তমান সময়ে বাঘ সংরক্ষণে ড্রোন এবং আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়েছে। বনের বাঘগুলোর মধ্যে প্রাণঘাতী ‘ক্যানাইন ডিস্টেম্পার’ ভাইরাসের কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি- এটি নিঃসন্দেহে একটি বড় স্বস্তির খবর। তবে বাঘের দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষা ও বংশবৃদ্ধি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. ওয়াসিউল ইসলাম বলেন, “বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়া নিঃসন্দেহে অত্যন্ত ইতিবাচক একটি বিষয়, তবে এটিকে এখনই কোনো স্থায়ী সাফল্য হিসেবে ধরে নেওয়া যাবে না। কারণ জলবায়ু পরিবর্তন এবং চোরাশিকারের মতো মারাত্মক দুই সংকট সুন্দরবনে এখনও সমানভাবে বিদ্যমান। বনের মূল খাদ্যশৃঙ্খল যদি এভাবে দুর্বল হতে থাকে, তবে ভবিষ্যতে এই সংখ্যা টিকিয়ে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়বে।”

সুন্দরবন একাডেমীর নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আনোয়ারুল কাদিও বলেন, “শুধু মোট বাঘের সংখ্যা প্রকাশ করলেই আমাদের দায়িত্ব শেষ হয় না; বরং সুন্দরবনে বাঘ ও বাঘিনীর সঠিক অনুপাত কত, সেটিও নিয়মিত প্রকাশ করা প্রয়োজন। কারণ বনের দীর্ঘমেয়াদি প্রজনন এবং প্রাণীটির জনসংখ্যার স্থিতিশীলতা অনেকটাই নির্ভর করে এই জনমিতিক ভারসাম্যের ওপর। একই সঙ্গে, কৃত্রিম কিল্লা ও মিঠাপানির পুকুরগুলো বাস্তবে বাঘ ও অন্যান্য প্রাণীর জন্য কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখছে, তারও একটি নিরপেক্ষ বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন করা উচিত।”

বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনে অনেক ছোট-বড় শিকারি গ্রেফতার হলেও তাদের নেপথ্যে থাকা গডফাদার বা প্রভাবশালী সিন্ডিকেটগুলো প্রায়ই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায় এবং তাদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। শুমারির তথ্য অনুযায়ী সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা বেড়ে ১২৫টিতে উন্নীত হওয়া এবং নতুন করে বাঘের স্বচ্ছন্দ বিচরণ নিশ্চিতভাবেই এক দারুণ আশাজাগানিয়া খবর। কিন্তু আইনের কঠোর ও নিরপেক্ষ প্রয়োগ, বনের খাদ্যপ্রাণী সংরক্ষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বহুমুখী প্রভাব মোকাবিলার জন্য কার্যকর ও দূরদর্শী উদ্যোগ গ্রহণ না করা হলে, বাঘের এই পরিসংখ্যান ভবিষ্যতে কেবল কাগজের পাতার সাফল্য হয়েই টিকে থাকবে। সুন্দরবনের নদী-খালের বাঁকে বাঁকে ডোরাকাটা এই রাজত্বের সম্মান ও অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হলে এখনই সর্বাত্মক ও সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে।