রাজশাহী বিভাগের ৮টি জেলায় প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২০ কোটি টাকার মাছ বিক্রি কেনাবেচা হচ্ছে। রুই-কাতলাসহ কার্পজাতীয় মাছের চাষ ব্যাপক বৃদ্ধি পাওয়ায় এই বাজার বিস্তৃত হয়েছে বলে জানা গেছে। মৎস চাষের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বলছেন মাছ চাষে এটা একটা বিপ্লব বটে।

সূত্র জানায়, বিভাগের আটটি জেলায় মোট পুকুরের সংখ্যা ৪ লাখ ৪৯ হাজার ৬৫৩টি। মাছচাষির সংখ্যা ১ লাখ ৬৫ হাজার ৭০৬টি। বছরে ৫ লাখ ৯৬ হাজার ৪৬৭ মেট্রিকটন মাছ উৎপাদন করা হয়। এর মধ্যে নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে দেড় লাখ মেট্রিকটন মাছ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানো হচ্ছে। প্রায় ৩ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির পাশাপাশি বিদেশেও রফতানি হচ্ছে। লাভজনক হওয়ায় আগ্রহও বাড়ছে চাষিদের। এই বিভাগের চাহিদা মিটিয়ে প্রতিদিন এই মাছ পাঠানো হচ্ছে রাজধানীসহ বিভিন্ন স্থানে। আর এতে বিক্রি হচ্ছে ২০ কোটি টাকারও বেশি মাছ। রাজশাহীতে গত কয়েক বছরে বেড়েছে পুকুরের সংখ্যাও। ফসলে লোকসান হওয়ায় বাধ্য হয়ে পুকুর খনন করে মাছ চাষে নামছেন চাষিরা। আর মাছ চাষেই লাভের মুখ দেখছেন তারা। অন্য ফসলের চেয়ে মাছ চাষ তুলনামূলকভাবে বেশ লাভজনক হওয়ায় এ পেশায় ঝুঁকছেন অনেকে। এ বিষয়ে মৎস্য অধিদফতরের কর্মকর্তাদের ভাষ্য হলো, আগে শুধু রাজশাহীতে মিশ্র প্রক্রিয়ায় মাছ চাষ হতো। এখন সেটা বিভাগের অন্য জেলাতেও হচ্ছে। পুকুরে প্রধান মাছ যদি রুই হয় তবে সিলভার কার্প, কাতলাসহ দেশি ছোট মাছও চাষ করা হয়। এর ফলে পুকুরে ভারসাম্য রক্ষা হয়। এই জেলা থেকে বড় মাছ পাঠানোর পাশাপাশি দেশী পাবদা, শিং, কই, মাগুর চাষ হয়। রীতিমতো সেগুলো রাজশাহীর বাইরে একটা বড় ধরনের বাজার তৈরি করে ফেলেছে। এ ছাড়া পাবদা মাছ নিয়মিত ভারতে রফতানি হচ্ছে। এখানকার চাষিরা নিয়ম মেনে মাছ চাষ করেন। তারা বছরে দেড় হাজারের বেশি মানুষকে মাছ চাষবিষয়ক প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকেন। এ ছাড়া তারা নিয়মিত কৃষকের মাছ প্রদর্শনের মতো কর্মসূচি পালন করেন। মৎস্য কর্মকর্তারা জানান, দুই যুগ আগে এই জেলা থেকে তাজা মাছ পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়। ঢাকা, চট্টগ্রাম, বরিশাল, সিলেট, ময়মনসিংহসহ অন্তত ২৫টি জেলায় প্রতিদিন তাজা মাছ পাঠানো হচ্ছে। এর ফলে রাজশাহীর বাইরের মানুষ ফরমালিনমুক্ত মাছ খেতে পারে। ফলে এ জেলার মাছের চাহিদা বাড়ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র আরো জানায়, প্রতিদিন বিকেল থেকে ভোররাতের মধ্যে প্রায় ৫০০ ট্রাকের বেশি তাজা মাছ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যায়। প্রতি ট্রাকে কমপক্ষে ৭০০ থেকে ৮০০ কেজি মাছ থাকে। সেই হিসাবে প্রতিদিন ২০ কোটি টাকার বেশি এই তাজা মাছ বিক্রি হয়। রাজশাহী জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি মাছ চাষ হয় পবা উপজেলায়। সেখানকার পারিলা ইউনিয়নের পারিলা গ্রাম থেকেই প্রতিদিন ৫০ ট্রাকের মতো তাজা মাছ যায় ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলা শহরে। আর পুরো রাজশাহী থেকে যায় ২০০ ট্রাকের বেশি তাজা মাছ। এই গ্রামের একজন চাষি জানান, গত ১৪ বছর ধরে ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় তিনি মাছ পাঠান। প্রায় ২২ বিঘা জমির ওপর তার পুকুর আছে। তিনি জানান, একসময় রাজশাহীতেই মাছ বিক্রি করতে হতো। দাম তেমন পাওয়া যেতো না। পরে তারা ট্রাকে ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় মাছ নেয়া শুরু করেন। এদিকে মিঠা পানির কার্পজাতীয় মাছ উৎপাদনে দেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মাছের উৎপাদন ও কেনাবেচা হয় নাটোর ও নওগাঁয়। তবে এসব অঞ্চলের পুকুরগুলোতে রুই, কাতলা, মৃগেল, সিলভার কার্প, পাবদা, ট্যাংরা শিংসহ বিভিন্ন ধরনের মাছ চাষ করা হয়। এসব মাছ পুকুর থেকে তুলে বিশেষ সংরক্ষণের মাধ্যমে জীবিত অবস্থায় সরবরাহ করা হয় রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। কিছু চাষি হতাশাও প্রকাশ করেন। তারা বলেন, মাছের খাবারের দাম যেভাবে বেড়েছে, মাছের দাম তেমন বাড়েনি। এতে লাভ কম হচ্ছে। এ ছাড়া ঢাকায় মাছ নিতে বাড়তি ট্রাকভাড়া গুনতে হচ্ছে তিন-চার হাজার টাকা। মৎস্য অধিদফতর থেকে আর্থিক কোনো সহযোগিতা পাওয়া যায় না। তবে নানা রকম পরামর্শ, সেমিনারের আয়োজন করা হয়। এতে উপকৃত হওয়া যায়।