গবেষণাভিত্তিক স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর ইনক্লুসিভ পলিসি অ্যান্ড গভর্নেন্স (সিআইপিজি) আয়োজিত সরকারের ৬ মাস: প্রত্যাশা, প্রাপ্তি ও ঘাটতির মূল্যায়ন (প্রেক্ষিত: অর্থনৈতিক-সামাজিক নিরাপত্তা, মানবাধিকার, আইনশৃঙ্খলা এবং নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অগ্রগতি) শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক গতকাল শনিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৈঠকে বক্তারা সরকারের প্রথম ছয় মাসের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি, মানবাধিকার, আইনশৃঙ্খলা এবং নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অগ্রগতি ও ঘাটতি নিয়ে আলোচনা করেন।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি প্রফেসর ড. আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী বলেন, দীর্ঘদিনের শাসনব্যবস্থার শৃঙ্খল ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক আন্দোলনের মাধ্যমে ভেঙে পড়ে এবং ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান ঘটে। গণ-অভ্যুত্থানের পর মানুষ যে স্বাধীন, গণতান্ত্রিক, বৈষম্য ও নিপীড়নমুক্ত বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিল, সেই আকাক্সক্ষা কতটুকু বাস্তবায়িত হয়েছে তা এখন গভীরভাবে মূল্যায়নের সময় এসেছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি নিয়োগে দলীয়করণের অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, বিষয়ভিত্তিক যোগ্যতা ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রয়োজন বিবেচনা না করে দলীয় বিবেচনায় অ্যারাবিক ডিপার্টমেন্টের প্রফেসরকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি নিয়োগ দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি বলেন, একটি সরকারের পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়নের জন্য ছয় মাস দীর্ঘ সময় না হলেও সরকারের নীতি, অগ্রাধিকার ও বাস্তবায়নের গতিপথ বোঝার জন্য তা যথেষ্ট।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও পুঁজিবাজার বিশ্লেষক প্রফেসর ড. আবু আহমেদ বলেন, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে কৃষি কার্ড বা ফ্যামিলি কার্ডের মতো উদ্যোগ প্রত্যাশিত সুফল দেবে না। তিনি বলেন, ট্রেজারি বন্ডের মাধ্যমে সরকার ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ায় ব্যাংকগুলো তুলনামূলক নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে সরকারকে ঋণ দিতে আগ্রহী হচ্ছে, যা বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ, উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। শিল্পকারখানা বন্ধ ও বেকারত্ব বৃদ্ধির বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ও ইসলামী ব্যাংকের পরিচালক নিয়োগ নিয়েও সমালোচনা করেন।

সাবেক চিফ প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার এবং মানবাধিকারসংক্রান্ত নতুন আইনি কাঠামোর সমালোচনা করে বলেন, এতে গুমের শিকার ব্যক্তিদের সুরক্ষার পরিবর্তে অভিযুক্তদের দায়মুক্তির সুযোগ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। র‌্যাবের পরিবর্তে এসআরবি গঠনকে তিনি খোলস পরিবর্তন হিসেবে অভিহিত করেন। র‌্যাবের নথিপত্র হস্তান্তরের সময়সীমা ও প্রক্রিয়া এবং নতুন আইনে আটক এর সংজ্ঞা ও মেয়াদ সুস্পষ্ট না থাকায় তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে জুলাই সনদের প্রত্যাশিত বাস্তবায়ন না হওয়ার অভিযোগও তোলেন তিনি।

ঢাকা-১৬ আসনের সংসদ সদস্য কর্নেল (অব.) মো. আবদুল বাতেন বিচার বিভাগে নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, স্বাধীন ও নিরপেক্ষ প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর পরিবর্তে দলীয় প্রভাবযুক্ত সার্চ কমিটির মাধ্যমে বিচারক নিয়োগের সুযোগ থাকলে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে প্রতিষ্ঠা করা বিচার বিভাগীয় সচিবালয় বাতিল করার তীব্র সমালোচনা করেন।

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার এস এম শাহরিয়ার কবির গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার এবং মানবাধিকারসংক্রান্ত আইনের বিভিন্ন বিধানের সমালোচনা করেন। তিনি অভিযোগ করেন, এসব আইনের বিতর্ক থেকে জনদৃষ্টি অন্যদিকে সরিয়ে নিতে সম্পত্তি হস্তান্তরসংক্রান্ত আইন সামনে আনা হয়েছে। গুম ও মানবাধিকারসংক্রান্ত আইনের অস্পষ্ট বিধান ভবিষ্যতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি করতে পারে বলেও তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন সিআইপিজির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. মোজাম্মেল হক। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড পিস স্টাডিজ (সিএসপিএস)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. মো. মিজানুর রহমান। মূল প্রবন্ধে তিনি বলেন, গত ছয় মাসে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, রেমিট্যান্স ও রপ্তানিতে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গেলেও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উচ্চমূল্য সাধারণ মানুষের ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করছে। সামষ্টিক অর্থনৈতিক সূচকের পাশাপাশি মানুষের জীবনযাত্রায় কতটা স্বস্তি এসেছে, সেটিকেই অর্থনৈতিক সাফল্যের অন্যতম প্রধান মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

গোলটেবিল থেকে সরকারের আগামী দিনের কার্যক্রমে পাঁচটি অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানায় সিআইপিজি।

মূল্যস্ফীতি ও নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ; মব সহিংসতা, চাঁদাবাজি ও রাজনৈতিক সহিংসতার বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ ও কঠোর ব্যবস্থা; ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং পাচারকৃত অর্থ উদ্ধারে কার্যকর উদ্যোগ; যুবসমাজের দক্ষতা উন্নয়ন ও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি; এবং জুলাই চার্টার ও নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নে সময়াবদ্ধ ও জবাবদিহিমূলক রোডম্যাপ প্রকাশ।

পরিশেষে, সিআইপিজির নির্বাহী পরিচালক ও সাবেক অতিরিক্ত সচিব ড. খুরশীদ আলম উপস্থিত সকল অতিথিবৃন্দ, আলোচক ও গণমাধ্যমকর্মীদের ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে সেমিনারের সমাপ্তি ঘোষণা করেন।