আমাদের যে সন্তানেরা যে কারণে জীবন দিলো সেই বৈষম্যহীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করলেই জুলাইয়ের দাবি পূরণ হবে। এজন্য রাষ্ট্র কাঠামোতে সংস্কার দরকার। কাঠামোগত পরিবর্তন দরকার। জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী রাষ্ট্রের প্রতিটি জায়গায় পরিবর্তন আনতে হবে। জুলাইয়ের দেনা-পাওনা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে এমনটাই জানালেন ২০২৪ সালের জুলাইয়ে শহীদ জাবির ইব্রাহীমের মা ও সংসদ সদস্য রোকেয়া বেগম। রাজধানীর উত্তরায় শিশু ছেলে জাবির ইব্রাহীম পুলিশের গুলীতে শহীদ হন। শহীদ পরিবারগুলোর প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি আহতদের প্রত্যাশার বাংলাদেশ গড়ে তুলতে যৌক্তিক দাবিগুলো তিনি জাতীয় সংসদে তুলে ধরেছেন।

দৈনিক সংগ্রামের সাথে আলাপকালে শহীদ জাবির ইব্রাহীমের মা জানান, দেশে সব কিছু তো আগের মতোই চলছে। প্রকৃত অর্থে কিছুই পরিবর্তন হয়নি। সবখানে অরাজকতা চলছে। সংবিধান সংস্কার হয়নি। সংস্কার হওয়ার সম্ভাবনাও দেখা যাচ্ছে না। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন হয়নি। জুলাই সনদকে অস্বীকার করা হচ্ছে। সবখানে দলীয়করণ চলছে। আমার মনে হয় এক ফাসিস্ট পালিয়েছে; অন্যরাও ফ্যাসিস্ট হয়ে উঠছে। আগের থেকে কোন পরিবর্তন নাই। আজকে ফ্যাসিস্টরা বলছে, আবার নাকি কোটাব্যবস্থা ফেরত এসেছে। আসলে কি তাই! আরে ফ্যাসিস্টরা এসব কথা বলবেই। কারণ তারা ১৭ বছর লুটপাট করেছে। এখন করতে পারছে না। তবে হ্যা শহীদ পরিবার তো কিছু চাইবেই। তারা সেই পাওনার দাবিদার।

শহীদ জননী রোকেয়া বেগম অভিযোগ করে বলেন, চোখের সামনে দেখছি কোনো পরিবর্তন হয়নি। সব জায়গায় দলীয়করণ হচ্ছে। ব্যাংক বীমাসহ সরকারি বড় বড় পোস্টে দলের লোক বসানো হচ্ছে। সংবিধান সংস্কারের পরিবর্তে সংশোধন করতে চাচ্ছে সরকার। গণভোটের রায় মানতে চাচ্ছে না। আরে গণরায় না মানলেও আপনাদের ক্ষমতা বেআইনি। প্রকৃত অর্থে এগুলো জুলাইয়ের সাথে, দেশের সাথে বেঈমানি। জনগণের সাথে প্রতারণার শামিল।

আগামী জুলাইটা কেমন চান এমন প্রশ্নের জবাবে শহীদ জননী বলেন, আমার সন্তানেরা যেমন রাষ্ট্র চেয়েছিল। যেজন্য তারা জীবন দিয়েছে সেরকম রাষ্ট্র চাই। সবখানে সংস্কার চাই। গুণগত পরিবর্তন চাই।

তিনি বলেন, জাতীয় সংসদে আমি সবার আগে সন্তান হত্যার বিচার চেয়েছি। বিচার ছাড়া ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থা বিলুপ্তি সম্ভব নয়। এজন্য ফ্যাসিবাদের বিচার হওয়া দরকার সবার আগে। আমাদের দেশে স্বাভাবিক ভাবে কোন বিচার পেতে ২০/২৫ বছর চলে যায়। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, রামিশা হত্যার বিচার একমাসের মধ্যে হবে বলা হলো। কিন্তু হয়েছে কি? না, হয়নি। আজো সেই বিচার কার্যকর হয়নি। বিচার না হলে ফ্যাসিবাদ কমবে না। একদল যাবে আরেক দল আসবে। আবার ফ্যাসিবাদী আচরণ শুরু করবে। সুশাসন আসবে না।

দ্বিতীয়ত আমি ১৪শ’ শহীদ এবং আহতদের পরিবারের মর্যাদা ও সম্মান দাবি করেছি। আমি বলেছি জাতিসংঘের রিপোর্ট অনুযায়ী যারা শহীদ হয়েছেন তাদের নাম এখনো গেজেট আকারে প্রকাশ করতে হবে। কিন্তু হয়নি। আমি তাদের নামের গেজেট চাই। তৃতীয়ত; এই জুলাইকে কেউ কেউ ছোট করার চেষ্টা করছে। আমি সেই কালচারাল ফ্যাসিস্টদের বিচার চাই। তাদের বিচারের আওতায় আনতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বাস্তব জীবনে জুলাই যোদ্ধাদের হুমকি, নির্যাতন এবং স্মৃতিস্তম্ভে হামলার অভিযোগ তুলে বলেছি জুলাইকে মুছে ফেলতে পলাতক ফ্যাসিস্টের বাহিনী বাস্তবে ও সামাজিক মাধ্যমে অতিমাত্রায় তৎপর।

এছাড়া জুলাইয়ে আহতদের স্বাস্থ্য সেবায় হয়রানি করা হচ্ছে। যারা একাজটি করছে তাদের বিচার করতে হবে। তাদের বিনা পয়সায় চিকিৎসা দিতে হবে। আমি জাতীয় সংসদে শহীদ এবং আহত পরিবারের আবাসন সুবিধা দেয়ার দাবি জানিয়েছি। বিনা বেতনে পড়াশোনার সুযোগ দেওয়ার দাবি জানিয়েছি। সর্বোপরি জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছে। সংবিধান সংস্কারের কথা বলেছি। সংশোধন নয়।

২০২৪ ইং সালের ৫ আগস্ট উত্তরায় পুলিশের গুলীতে শহীদ হয় বাবার হাত ধরা ৬ বছর বয়সি জাবির। জুলাইয়ের এই শহীদের মা রোকেয়া বেগমকে সংরক্ষিত মহিলা আসনে সংসদ সদস্য মনোনীত করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। ছেলে জাবির ইব্রাহিমের স্মৃতিচারণ করে রোকেয়া বেগম বলেন, ৫ আগস্ট আমার ছোট্ট ছেলেটা গুলীবিদ্ধ হয়ে রক্তক্ষরণে শাহাদাত বরণ করে। আমি যখন ওকে দেখছিলাম, তখন দেখছিলাম ও সাদা ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। একটা ফোঁটা রক্তও ওর ভেতরে ছিল না। পুরো রক্ত এই জমিনে পড়ে গিয়েছিল।