# দ্রুত ক্ষয় হয়ে যাচ্ছে ট্রেনের চাকা
কামাল উদ্দিন সুমন
বিগত আওয়ামীলীগ সরকারের আমলে বিপুল অর্থ খরচ করে ২০২২ সালে রাজধানীতে চালু হয় মেট্রোরেল। মাত্র পার হয়েছে সাড়ে চার বছর। এরই মধ্যে মেট্রোরেলের নির্মাণমান, নিরাপত্তা ও পরিচালন ব্যবস্থায় গুরুতর ঘাটতির তথ্য এসেছে স্বাধীন নিরাপত্তা অডিট প্রতিবেদনে। এতে দেখা গেছে, মেট্রোর বিস্তারিত নকশা, গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা উপাদান এবং দুই শতাধিক সিস্টেম ইন্টিগ্রেশন ত্রুটির স্বাধীন তৃতীয় পক্ষের যাচাই সম্পন্ন হওয়ার আগেই এমআরটি লাইন-৬ বাণিজ্যিকভাবে চালু করা হয়েছে।
এছাড়া ৭৩০টি বা ২৩ দশমিক ২৮ শতাংশ বেয়ারিং প্যাড ত্রুটিপূর্ণ, দুটি পিয়ার ও একটি বক্স গার্ডারে ফাটল, ১৬টি স্টেশনের বৈদ্যুতিক ও সিগন্যালিং কক্ষে পানি প্রবেশ, ওভারহেড বিদ্যুৎ লাইনে নিয়মিত স্পার্কিং, ট্রেনের আন্ডারশুটিংয়ের কারণে পাঁচটি ট্রেনসেট প্রত্যাহার এবং ১০টি স্থানে গতি কমিয়ে ট্রেন পরিচালনার মতো উদ্বেগজনক তথ্য পাওয়া গেছে। ট্রেনের চাকাও দ্রুত ক্ষয় হয়ে যাচ্ছে। এতে ট্রেন দুর্ঘটনার আশঙ্কা করা হয়েছে।
এদিকে মেট্রোরেলের নিরাপত্তা ঝুঁকির খবরে নড়ে চড়ে বসছে সংশ্লিষ্টরা। মেট্রোরেলের নিরাপত্তা সুপারিশ বাস্তবায়নে ১০ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। গতকাল বুধবার ডিএমটিসিএলের জনষংযোগ বিভাগ থেকে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। ডিএমটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো.শাওগাতুল আলম স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে এ কমিটি গঠন করা হয়।
অফিস আদেশে বলা হয়,মেট্রোরেলের এমআরটি লাইন-৬ এর বিয়ারিং প্যাড পড়ে দুর্ঘটনার ঘটনায় নিরাপত্তা নিরীক্ষা (সেফটি অডিট) কমিটির তাৎক্ষণিক সুপারিশ বাস্তবায়নের জন্য ১০ সদস্যের একটি অভ্যন্তরীণ কমিটি গঠন করেছে ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল)। হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী আগামী ১২ আগস্টের মধ্যে সুপারিশ বাস্তবায়নের অগ্রগতি প্রতিবেদন দাখিল করবে এই কমিটি।
আদেশে বলা হয়, এমআরটি লাইন-৬-এ বিয়ারিং প্যাড পড়ে সংঘটিত দুর্ঘটনা নিয়ে হাইকোর্টে দায়ের করা রিট পিটিশনের শুনানিতে নিরাপত্তা নিরীক্ষা কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে তাৎক্ষণিক সুপারিশ বাস্তবায়নের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সেই নির্দেশনা বাস্তবায়নেই এ কমিটি গঠন করা হয়েছে।
কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে ডিএমটিসিএলের পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স) মো. নজরুল ইসলামকে। সদস্য হিসেবে রয়েছেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ আব্দুল ওহাব, এনডিসি, পিএসসি (প্রকল্প পরিচালক, এমআরটি লাইন-৬), মো. সারওয়ার উদ্দীন খান (প্রকল্প পরিচালক, এমআরটি লাইন-১), মৃণাল কান্তি বণিক (মহাব্যবস্থাপক, রোলিং স্টক), মোহাম্মদ শাহজাহান (অতিরিক্ত প্রকল্প পরিচালক, সিভিল, এমআরটি লাইন-৬), মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান (অতিরিক্ত প্রকল্প পরিচালক, আন্ডারগ্রাউন্ড, এমআরটি লাইন-১), মো. রেজাউর রহমান আকন্দ (অতিরিক্ত প্রকল্প পরিচালক, ইলেকট্রিক্যাল, সিগন্যাল, টেলিকমিউনিকেশন অ্যান্ড ট্র্যাক, এমআরটি লাইন-৬), মো. আরিফুর রহমান (মহাব্যবস্থাপক, পি-ওয়ে অ্যান্ড সিভিল) এবং মীর মনজুর রহিম (মহাব্যবস্থাপক, ইলেকট্রিক্যাল)। উপপ্রকল্প পরিচালক (সিভিল-২, আন্ডারগ্রাউন্ড, এমআরটি লাইন-১) খালেদ আনোয়ার সাগর কমিটির সদস্যসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
অফিস আদেশ অনুযায়ী, কমিটি নিরাপত্তা নিরীক্ষা কমিটির প্রতিবেদন ও হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী করণীয় নির্ধারণ ও বাস্তবায়ন করবে। একই সঙ্গে এমআরটি লাইন-৬ প্রকল্প এবং সংশ্লিষ্ট পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম পরিচালনা করবে। প্রয়োজনে নিরাপত্তা নিরীক্ষা কমিটির সঙ্গেও সমন্বয় করবে এবং সুপারিশ বাস্তবায়নের অগ্রগতি প্রতিবেদন নির্ধারিত সময়ে কর্তৃপক্ষের কাছে দাখিল করবে।
অডিট কমিটি বলছে,মেট্রোরেলের নির্মাণমান, নিরাপত্তা ও পরিচালন ব্যবস্থায় গুরুতর ঘাটতি বিচ্ছিন্ন কোনো ত্রুটি নয়; বরং পুরো মেট্রোরেল ব্যবস্থায় গভীর ও পদ্ধতিগত নিরাপত্তা দুর্বলতার প্রতিফলন।
জানা গেছে, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) সাবেক ভিসি অধ্যাপক ড. মো. জাহাঙ্গীর আলমের নেতৃত্বে গঠিত নয় সদস্যের স্বাধীন নিরাপত্তা অডিট কমিটির সর্বশেষ প্রতিবেদন গত মে মাসে ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএমটিসিএল) কাছে জমা দেওয়া হয়। পরে আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী সেটি উচ্চ আদালতেও দাখিল করা হয়েছে। ২০২৫ সালের ২৬ অক্টোবর ঢাকার ফার্মগেট এলাকায় মেট্রোরেলের একটি বেয়ারিং প্যাড নিচে পড়ে একজন পথচারীর মৃত্যুর ঘটনার পর হাইকোর্ট ও সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় এই অডিট পরিচালিত হয়।
প্রতিবেদনে সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য হলো, উত্তরা উত্তর থেকে মতিঝিল পর্যন্ত পরিদর্শন করা বেয়ারিং প্যাডের মধ্যে ৭৩০টি ত্রুটিপূর্ণ। এর মধ্যে ৪৪২, ৪৪৬ ও ৪৪৮নং পিয়ারের বেয়ারিং প্যাডে ট্রেন চলাচলের সময় অস্বাভাবিক জোরে ধাক্কা খাচ্ছে। একটি ৪২৩নং পিয়ারে প্যাড স্থানচ্যুত হওয়ার ঘটনাও নথিভুক্ত হয়েছে। কমিটির মতে, এই ত্রুটির কারণে কাঠামোর ওপর অস্বাভাবিক চাপ সৃষ্টি হচ্ছে যা দীর্ঘমেয়াদে বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। অথচ এখন পর্যন্ত এসব ত্রুটির মূল কারণ নির্ণয় কিংবা পূর্ণাঙ্গ প্রতিস্থাপন কর্মসূচির কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। যদিও এখন নিরাপত্তার জন্য বিয়ারিং গার্ড দেওয়া হচ্ছে।
এতে আরও বলা হয়েছে, ১৯৮ ও ৩৪১নং পিয়ার হেডে ফাটল দেখা দিয়েছে ও ৩৪৯-৩৫০ পিয়ারের মাঝের বক্স গার্ডারে দৃশ্যমান ফাটল শনাক্ত হয়েছে। ১৯৮নং পিয়ার হেড থেকে কংক্রিট খসে পড়ার ঘটনাও দেখা গেছে। বিশেষ করে ৩৪১ নম্বর পিয়ারের ফাটল নির্ধারিত সীমার চেয়ে বড় হওয়ায় তা কাঠামোগতভাবে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেছে কমিটি। এছাড়া স্থায়ী পাইলের লোড টেস্টের রেকর্ডও পাওয়া যায়নি ফলে প্রকৃত ভারবহন সক্ষমতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
একটি স্বাধীন নিরাপত্তা অডিটে (সুরক্ষা নিরীক্ষা) দেশের একমাত্র মেট্রোরেলের ৭৩০টি বেয়ারিং প্যাড ত্রুটিপূর্ণ পাওয়া গেছে, যা পরিদর্শন করা প্যাডগুলোর ২৩ শতাংশের বেশি। এই ত্রুটির সঙ্গে মেট্রোরেলের নি¤œমানের রাইডিং কোয়ালিটি (যাত্রী স্বাচ্ছন্দ্য) এবং গতিসীমা সংকোচনের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।
২১.২৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এই লাইনের একাধিক স্থানে পিয়ার হেড (থামের উপরিভাগ) এবং কংক্রিটের বেইজ বা ভিতে ‘উল্লেখযোগ্য’ ফাটল শনাক্ত করেছে অডিট কমিটি। এছাড়া মরিচা ধরা রেললাইন, ফাস্টেনিং (আটকানোর সরঞ্জাম) এবং অন্যান্য যন্ত্রাংশও পাওয়া গেছে।
এমনকি ট্রেনে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহকারী ওভারহেড ক্যাটেনারি সিস্টেমের (ওসিএস) ইনসুলেটেড ওভারল্যাপগুলোতে শক্তিশালী বৈদ্যুতিক স্ফুলিঙ্গ বা স্পার্কিং একটি স্থায়ী পরিচালনগত ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে, যা অগ্নিকান্ডের আশঙ্কা তৈরি করছে বলে জানিয়েছে এমআরটি লাইন-৬ এর পরিচালন ঝুঁকি ও কাঠামোগত অখ-তা পরীক্ষা করা নিরাপত্তা অডিট কমিটি।
“কম্পন, ঝাঁকুনি, ট্র্যাক-সাপোর্ট সমস্যা, ত্রুটিপূর্ণ বেয়ারিং প্যাড এবং সাময়িক গতিসীমা সংকোচনের কারণে রাইডিং কোয়ালিটি বা যাত্রী স্বাচ্ছন্দ্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে,কমিটি তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে। এতে আরও বলা হয়, অতিরিক্ত কম্পন নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে ট্রেনগুলো তাদের মূল নকশাকৃত বা ডিজাইন স্পিডে চলতে পারছে না।
প্রতিবেদনে বলা হয়, যদিও পুরো সিস্টেমটি ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ১১০ কিলোমিটার বেগে চলার জন্য ডিজাইন করা হয়েছিল, তবে ট্রেনগুলো বর্তমানে ঘণ্টায় ৬০ থেকে ৯০ কিলোমিটার গতিতে চলছে। এমনকি কিছু কিছু সেকশনে প্রকৃত গতি নেমে যাচ্ছে ঘণ্টায় মাত্র ৪৪ থেকে ৪৭ কিলোমিটার যা মেট্রোরেলের কর্মক্ষমতার বড় ধরনের ঘাটতি নির্দেশ করে।
একই এলাকার কাছাকাছি একটি বেয়ারিং প্যাড ভেঙে পড়ার মাত্র এক বছরের মাথায় এটি ছিল দ্বিতীয় ঘটনা, যা জাপানের অর্থায়নে নির্মিত ৩২,৭১৭ কোটি টাকার এই মেগা প্রকল্পের নকশা ও রক্ষণাবেক্ষণের গুরুতর ত্রুটি এবং নিরাপত্তা নিয়ে বড় প্রশ্ন তোলে। ২০২২ সালের ২৮ ডিসেম্বর চালু হওয়া এই উড়াল মেট্রোরেল দিয়াবাড়ী-মতিঝিল রুটে প্রতিদিন প্রায় ৪ লাখ যাত্রী পরিবহন করে। এর মোট ১৬টি উড়াল স্টেশন রয়েছে।
অডিট কমিটির অন্যতম সদস্য ও বুয়েটের অধ্যাপক ড. শামসুল হক সতর্ক করে বলেছেন, নির্মাণকাজের নি¤œমানের কারণে মেট্রোরেল ব্যবস্থা স্পষ্ট নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়েছে। তিনি বলেন, এত অল্প সময়ের পরিচালন মেয়াদের মধ্যে বেয়ারিং প্যাড সরে যাওয়া বা খুলে নিচে পড়ে যাওয়া কোনোভাবেই প্রত্যাশিত নয়, অথচ ইতিমধ্যে এমন ঘটনা ঘটে গেছে যা বিশ্বজুড়ে অত্যন্ত বিরল একটি বিষয়। সাময়িক ব্যবস্থা হিসেবে বেয়ারিং প্যাডগুলো যাতে আরও স্থানচ্যুত হতে না পারে, সেজন্য এখন সেগুলোর চারপাশে ব্র্যাকেট স্থাপন করা হচ্ছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশেষ উদ্বেগের বিষয় হলো ট্রেন চলাচলের সময় ৪৪২, ৪৪৬ এবং ৪৪৮ নম্বর পিয়ারের বেয়ারিং প্যাডগুলো সজোরে ধাক্কা খাচ্ছে বলে জানা গেছে এবং ৪২৩ নম্বর পিয়ারে একটি বেয়ারিং প্যাডের স্থানচ্যুতি রেকর্ড করা হয়েছে। কমিটি এগুলো অবিলম্বে প্রতিস্থাপন বা সংশোধনের সুপারিশ করেছে।
সবগুলো বেয়ারিং প্যাড স্থানচ্যুতির ঘটনার সম্ভাব্য কারণ হিসেবে ত্রুটিপূর্ণ বা অনুপযুক্ত ডিজাইন বিবেচনাকে দায়ী করেছে কমিটি এবং এ বিষয়ে জাপানি ডিজাইন কনসালট্যান্ট প্রতিষ্ঠান এনকেডিএম অ্যাসোসিয়েটস-এর কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছে।
পরামর্শক বা কনসালট্যান্টরা যদিও দাবি করেছেন যে, ঠিকাদাররা ডিফেক্ট নোটিফিকেশন পিরিয়ড (ডিএনপি)-এর অধীনে সব ধরণের ত্রুটি সক্রিয়ভাবে সমাধান করছেন, তবে বেশিরভাগ সমস্যার বারবার ফিরে আসার উচ্চ হার এখনও বজায় রয়েছে বলে কমিটি জানিয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত বা স্থানচ্যুত বেয়ারিং প্যাডের পাশাপাশি পিয়ার হেড, কংক্রিট বেইজ এবং বক্স গার্ডারে দৃশ্যমান ফাটলগুলো সবচেয়ে গুরুতর কাঠামোগত উদ্বেগের বিষয়গুলোর মধ্যে অন্যতম বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৩৪১ নম্বর পিয়ারে পরিমাপকৃত ১ মিলিমিটারের চেয়ে বড় ফাটলটি অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। এ ধরনের ফাটলের ক্রমাগত বিস্তার কাঠামোগত অবনতি ও সম্ভাব্য নিরাপত্তা ঝুঁকির ইঙ্গিত দেয়। তাই ফাটলগুলো সিল করতে, পরবর্তী ক্ষয়ক্ষতি কমাতে এবং এই অবকাঠামোর কাঠামোগত অখন্ডতা ও কার্যকাল রক্ষা করতে অবিলম্বে প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
প্রতিবেদনে রোলিং স্টকের ক্রমাগত ব্যর্থতার কথা চিহ্নিত করা হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে ঘন ঘন ট্রেনের ‘আন্ডারশুটিং’ (নির্দিষ্ট স্থানের আগে থেমে যাওয়া)। তীব্র ঝাঁকুনি দিয়ে ব্রেক করার কারণে ট্রেনগুলো নির্ধারিত বিন্দুর আগেই থেমে যায়, ফলে ট্রেনের দরজা এবং প্ল্যাটফর্মের স্ক্রিন ডোরের মধ্যে অসমঞ্জস্যতা বা মিসঅ্যালাইনমেন্ট তৈরি হয়। এটিকে যাত্রীদের নিরাপত্তার জন্য একটি গুরুতর ঝুঁকি হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। বারবার সমস্যা দেখা দেওয়ার কারণে ইতিমধ্যে পাঁচটি ট্রেন সেটকে পরিষেবা বা অপারেশন থেকে প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে। অন্যান্য উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে ট্রেনের চাকার ক্ষয় ও সম্ভাব্য ফাটল, দরজা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ব্যর্থতা এবং অনবরত বৈদ্যুতিক স্ফুলিঙ্গের কারণে প্যান্টোগ্রাফের ক্ষতিসাধন।
কমিটি সতর্ক করেছে যে, চাকার এই ত্রুটিগুলো সমাধান না করা হলে তা ট্রেন লাইনচ্যুতির কারণ হতে পারে। এছাড়া ১২টি বজ্রপাত নিরোধকের মধ্যে তিনটি ক্ষতিগ্রস্ত পাওয়া গেছে, এবং ১০টি স্থানে আরোপিত সাময়িক গতিসীমা সংকোচনের কারণে প্রতিনিয়ত অস্বাভাবিক কম্পন ও ঝাঁকুনি তৈরি হচ্ছে।
অডিটে দেখা গেছে, অনেক স্টেশনের কলাম বা খুঁটি পর্যাপ্ত ল্যাটারাল ব্রেসিং (পার্শ্বীয় বন্ধনী) ছাড়াই সিঙ্গেল-পাইল ফাউন্ডেশনের ওপর দাঁড়িয়ে আছে, যা ভূমিকম্পের ক্ষেত্রে ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। এতে আরও বলা হয়েছে যে, স্থায়ী পাইলগুলোর লোড টেস্টিংয়ের তথ্য অনুপস্থিত অথবা অপর্যাপ্তভাবে নথিবদ্ধ করা হয়েছে, যার ফলে এগুলোর ভারবহন ক্ষমতা যাচাইহীন অবস্থায় রয়ে গেছে।
অডিটে ট্রান্সফরমারের ত্রুটি, বৈদ্যুতিক ও সিগন্যালিং রুমে পানি চুইয়ে পড়া এবং ওভারহেড ক্যাটেনারি তারে ক্রমাগত স্ফুলিঙ্গ তৈরির বিষয়গুলোও তুলে ধরা হয়েছে। এর ফলে শর্ট সার্কিট, অগ্নিকান্ড, তার ছিঁড়ে যাওয়া, যাত্রী আটকে পড়া এবং পুরো সিস্টেম বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে গেছে বলে সতর্ক করা হয়েছে।