রেজাউর বারী বাবুল, স্টাফ রিপোর্টার, গাজীপুর: গাজীপুর দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পাঞ্চল, যেখানে প্রতিদিন লক্ষাধিক মানুষ কাজ করে। জেলা প্রশাসক নাফিসা আরেফীন গাজীপুরের উন্নয়ন, পরিবেশ রক্ষা এবং নাগরিক সেবা বিষয়ে নিরলসভাবে কাজ করে চলেছেন। দৈনিক সংগ্রামের সঙ্গে এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি গাজীপুরের চ্যালেঞ্জ, উন্নয়ন পরিকল্পনা ও প্রশাসনের কার্যক্রম নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।
প্রধান চ্যালেঞ্জ: শিল্প কারখানা ও শ্রমিক অসন্তোষ
গাজীপুরের অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে জেলা প্রশাসক শিল্প কারখানা ও শ্রমিক অসন্তোষের বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, "গাজীপুর একটি শিল্পনগরী, যেখানে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে শ্রমিকরা আসেন। যদি কোনো কারখানা বন্ধ হয়ে যায়, তখন শ্রমিক অসন্তোষ দেখা দিতে পারে, যা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।" এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় প্রশাসন নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করছে এবং শিল্প মালিক ও শ্রমিকদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে।
প্রশাসনিক সেবা ও দুর্নীতি বিরোধী অবস্থান
জেলা প্রশাসক নাফিসা আরেফীন জানান, জনগণের সেবা আরও সহজ ও কার্যকর করতে প্রশাসনের সব কার্যক্রম ডিজিটালাইজড করা হচ্ছে। প্রত্যেক সেবা গ্রহণকারীর তথ্য সংরক্ষণ করা হচ্ছে, যাতে সেবার মান নিশ্চিত করা যায়। তিনি দুর্নীতির বিরুদ্ধে "জিরো টলারেন্স" নীতি গ্রহণ করেছেন এবং বলেন, "দুর্নীতির বিরুদ্ধে আমার বার্তা স্পষ্ট—আমি এটি কোনোভাবেই সহ্য করব না।"
আইনশৃঙ্খলা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শৃঙ্খলা
গাজীপুরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্য জেলা প্রশাসক বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছেন। তিনি বলেন, "৫ আগস্টের পর থেকে আমরা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে কার্যক্রম শুরু করেছি। প্রশাসন নিয়মিত কাজ করছে এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে সমন্বয় রেখে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করা হয়েছে।"
নারী উন্নয়ন ও ক্ষমতায়ন
নারী উন্নয়ন ও ক্ষমতায়নে জেলা প্রশাসক নাফিসা আরেফীন শিক্ষাকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, "প্রাথমিক পর্যায় থেকে যাতে কোনো মেয়ে শিশু ঝরে না পড়ে, সেদিকে প্রশাসন বিশেষ নজর দিচ্ছে।" নারীশক্তিকে এগিয়ে নিতে নানা প্রশিক্ষণ কর্মসূচি, উদ্যোক্তা তৈরির উদ্যোগ, সমাজসেবা কার্যক্রম এবং জাতীয় নারী অধিকার ও যুব উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে।
এছাড়া, প্রশাসন স্থানীয় পর্যায়েও বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে, যাতে নারীরা আত্মনির্ভরশীল হতে পারে এবং সামাজিকভাবে শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে। মেয়েদের শিক্ষা নিশ্চিত করতে বিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা বজায় রাখা হচ্ছে এবং নারীদের কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য নানা উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। নাফিসা আরেফীন বলেন, "নারীদের সমাজের মূলধারায় সম্পৃক্ত করার জন্য প্রশাসন কাজ করছে।"
বাল্যবিবাহ রোধে কঠোর পদক্ষেপ
গাজীপুরে বাল্যবিবাহ রোধে প্রশাসন কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে। জেলা প্রশাসক জানান, "বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে আমরা 'জিরো টলারেন্স' নীতি গ্রহণ করেছি। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের (ইউএনও) মাধ্যমে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে এবং অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য মোটিভেশনাল প্রোগ্রাম চালু করা হয়েছে।"
জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ রক্ষা
জলবায়ু পরিবর্তন এবং পরিবেশ রক্ষায় গাজীপুরের প্রশাসন নিয়মিত পদক্ষেপ নিচ্ছে। জেলা প্রশাসক নাফিসা আরেফীন বলেন, "গাজীপুরের বাতাসে অক্সিজেনের সংকট দেখা দিয়েছে এবং শিল্পকারখানার নির্গত কার্বন, গ্রিনহাউজ গ্যাস ও অন্যান্য ক্ষতিকর পদার্থ পরিবেশের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।" এই সমস্যার সমাধানে প্রশাসন ইতোমধ্যে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে।
তিনি বলেন, "গাজীপুরের ঐতিহ্যবাহী বনাঞ্চলগুলো উজাড় হয়ে যাচ্ছে এবং জলাশয়, পুকুর, খাল, নদী ও বিলগুলো দখল এবং দূষণের শিকার হচ্ছে। এসব সমস্যা সমাধানে আমরা কাজ শুরু করেছি। চিলাই নদীকে দূষণমুক্ত করতে কার্যক্রম শুরু হয়েছে এবং শিগগিরই লবলং খালের আদিরূপ দেখতে পাবেন।"
পরিবেশ ধ্বংসকারী পলিথিনের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের উদ্যোগ
গাজীপুরে পরিবেশ ধ্বংসকারী পলিথিনের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে। জেলা প্রশাসক জানান, "পানি দূষণের মূল কারণগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে এবং প্রতিকার হিসেবে প্রতি শুক্র ও শনিবার মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে।" তিনি আরও বলেন, "সরকারের পাশাপাশি নাগরিকদেরও পরিবেশ রক্ষায় সচেতন হতে হবে। যদি সবাই একসঙ্গে কাজ করি, তবে গাজীপুরকে একটি সবুজ, পরিচ্ছন্ন এবং পরিবেশবান্ধব নগরীতে পরিণত করা সম্ভব।"
প্রযুক্তি ও তরুণদের প্রতি জেলা প্রশাসনের পদক্ষেপ
জেলা প্রশাসক নাফিসা আরেফীন গাজীপুরে প্রযুক্তি ব্যবহারের উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছেন। তিনি জানান, "তরুণদের প্রযুক্তি শিক্ষা ও উদ্ভাবনশীলতার প্রতি আরো মনোযোগ দেওয়া হচ্ছে। আমরা প্রযুক্তির ব্যবহারকে আরও প্রচলিত করতে চাই, যাতে গাজীপুরের তরুণরা বিভিন্ন শিল্প খাতে নিজেদের দক্ষতা বৃদ্ধি করতে পারে।"
এছাড়া, তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন ও উদ্যোক্তা তৈরির জন্য বিভিন্ন প্রশিক্ষণ এবং কর্মসূচি বাস্তবায়িত হচ্ছে। গাজীপুরের যুবকদের জন্য স্কিল ডেভেলপমেন্ট এবং সৃজনশীল কাজের সুযোগ বৃদ্ধি করতে প্রশাসন উদ্যোগ নিয়েছে। জেলা প্রশাসক বলেন, "প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে আমরা তরুণদের নতুন সম্ভাবনার দিকে এগিয়ে নিতে চাই, যা গাজীপুরের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং উন্নয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।"
গাজীপুর—উন্নয়নের নতুন দিগন্ত
জেলা প্রশাসক নাফিসা আরেফীন আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন, "প্রশাসনের এই কার্যক্রমগুলো গাজীপুরকে আরও উন্নত, নিরাপদ এবং পরিবেশবান্ধব নগরীতে পরিণত করবে। ইতোমধ্যে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়েছে, যা গাজীপুরকে দেশের সেরা শিল্প ও বসবাসযোগ্য শহরে পরিণত করার লক্ষ্যে কাজ করছে।"