ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের ‘প্রয়াস’ মাদক নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন মো. ফোরকান মিয়া (২৯) নামে এক যুবকের মৃত্যুর ঘটনায় সাতজনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করার আবেদন করা হয়েছে। নিহতের বাবা আবদুর রশিদ সোমবার ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে এ আবেদন করেন। মামলায় কেন্দ্রটির প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক মো. ইকরামুল হক ওরফে রুবেলকে প্রধান আসামি করা হয়েছে। পাশাপাশি অজ্ঞাতনামা আরও চার-পাঁচজনকে আসামি করার কথা বলা হয়েছে।

মামলার অন্য আসামিরা হলেন কেন্দ্রটির পরিচালক নরসিংদীর প্রমোদ কুমার বর্মন, সহযোগী রিয়াদ আহমদ ওরফে রকসি, সাথি, আরিফ, সাকিব ও শাহরিয়ার। আদালত ফোরকানের মৃত্যুর ঘটনায় আগে কোনো অপমৃত্যুর মামলা বা সাধারণ ডায়েরি হয়েছে কি না, তা যাচাই করে তদন্ত প্রতিবেদন দিতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে নির্দেশ দিয়েছেন।

নিহত ফোরকান নবীনগর উপজেলার নাটঘর ইউনিয়নের কুড়িঘর গ্রামের বাসিন্দা। তিনি দীর্ঘদিন কাতারে ছিলেন। প্রায় ছয় মাস আগে ছুটিতে দেশে ফেরার পর মাদকাসক্ত হয়ে পড়লে পরিবারের পক্ষ থেকে চিকিৎসার জন্য গত ১২ আগস্ট তাকে শহরের ফুলবাড়িয়া বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন ‘প্রয়াস’ মাদক নিরাময় কেন্দ্রে ভর্তি করা হয়। তিন মাসের চিকিৎসার জন্য ৭০ হাজার টাকা দেওয়ার চুক্তি হয় এবং ভর্তির সময় ২০ হাজার টাকা পরিশোধ করা হয়েছিল।

মামলার আবেদনে ফোরকানের পরিবারের অভিযোগ, কেন্দ্রে ভর্তি হওয়ার পরদিন থেকেই বিভিন্ন ব্যক্তির মাধ্যমে তিনি তাঁর বাবাকে জানাতেন যে, কেন্দ্রের লোকজন তাকে মারধর করছেন। ১৪ আগস্ট এক স্বজন কেন্দ্রে গেলে ফোরকান তাঁর কাছে মারধরের অভিযোগ করেন বলেও আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পরিবারের দাবি, এরপরও তাঁর ওপর নির্যাতন চালানো হয়।

সবশেষ ১৮ আগস্ট রাতে ফোরকানকে মারধর করে হত্যার অভিযোগ করেছে তাঁর পরিবার। তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে ‘প্রয়াস’ কর্তৃপক্ষ।

কেন্দ্রটির পরিচালক প্রমোদ বর্মন বলেন, ফোরকান অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। তাঁর দাবি, ফোরকানের পরিবার কেন্দ্রটির বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ করছে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেনারেল হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক নাজমুল হক রনিও জানান, ফোরকানকে মৃত অবস্থায় হাসপাতালে আনা হয়েছিল। পরে তাঁর মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়।

এদিকে ফোরকানের মৃত্যুর পরদিন, ১৯ আগস্ট দুপুরে ‘প্রয়াস’ কেন্দ্রে স্থানীয় লোকজন ভাঙচুর চালান। এ সময় সেখানে থাকা প্রায় ৪০ জন রোগী একসঙ্গে পালিয়ে যান। প্রকাশিত ভিডিওতে কয়েকজন রোগীকে জানালা দিয়ে পাশের ভবনের ছাদে লাফিয়ে পালাতে দেখা গেছে।

পালিয়ে যাওয়া কয়েকজন রোগী গণমাধ্যমের কাছে অভিযোগ করেন, তাঁদেরও কেন্দ্রে নির্যাতন করা হতো। তাঁদের দাবি, ফোরকানও নির্যাতনের শিকার হয়ে বিনা চিকিৎসায় মারা গেছেন। কেন্দ্রটিতে কোনো মনোরোগবিশেষজ্ঞ, চিকিৎসক বা নার্স ছিলেন না বলেও তাঁরা অভিযোগ করেন। তবে এসব অভিযোগ স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

ঘটনার পর কেন্দ্রটির পরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাও সেখান থেকে সরে যান। বর্তমানে কেন্দ্রটি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে রয়েছে বলে জানা গেছে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সাজেদুল হাসান জানান, কর্মকর্তারা কেন্দ্রটি পরিদর্শন করেছেন। ভাঙচুরের কারণে কেন্দ্রটির জানালা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বর্তমানে তদারকিতে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের লোকজন রয়েছেন। কর্তৃপক্ষ কোনো অনিয়ম করে থাকলে লাইসেন্স বাতিলের ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে বলেও জানান তিনি।

এর আগে জেলা প্রশাসনের একজন সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট কেন্দ্রটি পরিদর্শন করে চিকিৎসক ছাড়াই প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনার অভিযোগের বিষয়ে তথ্য পান বলে স্থানীয় প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।