খালিদ হাসান সিপাই, কুষ্টিয়া : পদ্মায় পর্যাপ্ত পানি না থাকায় গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্প এলাকায় পানি সরবরাহ করতে পারছে না পানি উন্নয়ন বোর্ড। এতে ব্যাহত হচ্ছে গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্প এলাকার হাজার হাজার হেক্টর বোরোর আবাদ। ফলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা করছে কৃষকরা। প্রতি বছর জানুয়ারীর ১০ তারিখে গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্প (জিকে) পানি ছাড়লেও এ মৌসুমে ফেব্রুয়ারীতেও পানি পৌঁছায়নি সেচ প্রকল্পের অধীনে আবাদী জমিতে। সপ্তাহখানেক আগে একটি পাম্প চালু করে আংশিক পানি ছাড়লেও বোরো আবাদের বিস্তৃত এলাকা অনাবাদী রয়েই গেছে। ফলে হুমকির মুখে পড়েছে কুষ্টিয়াসহ ৪ জেলার ১৩ উপজেলার (১ লাখ ৯৭ হাজার হেক্টর জমি) বোরো আবাদ। কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায় একটি চ্যানেল করে পদ্মা নদী থেকে পানি এনে পাম্পের মাধ্যমে তুলে ক্যানেলের মাধ্যমে কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, চুয়াডাঙ্গা ও মাগুরায় কৃষি জমিতে সরবরাহ করা হয় জিকে প্রকল্পের মাধ্যমে। কিন্তু পানির অভাবে এ প্রকল্পের অধীনে আবাদী জমি এখন পর্যন্ত অনাবাদী রয়েই গেছে।

কয়েক বছর ধরে বৃহত্তর কুষ্টিয়ার তিন জেলার নিয়মিত চিত্র এটি। আবহাওয়ার এমন চরম অবস্থার মধ্যে ছয় বছর ধরে অকেজো হয়ে পড়ে আছে গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্পের (জিকে) পাম্প হাউজ। শুষ্ক মৌসুমে কোনো পানি আসছে না। নদী-নালা, খাল-বিল বা জলাধারগুলোও যাচ্ছে শুকিয়ে। টিউবওয়েলগুলোতেও উঠছে না পানি। এমনকি কৃষিজমিতে সেচের জন্য পোঁতা অনেক অগভীর নলকূপেও পানি মিলছে না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভূপৃষ্ঠে পানির উৎস বা প্রবাহ না থাকায় এবং সেচকাজে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার বাড়ায় পরিস্থিতি দিন দিন খারাপ হচ্ছে। সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা ও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে চরম আবহাওয়ার শিকার হবেন লাখ লাখ মানুষ। এ জন্য পদ্মার পানির দুষ্প্রাপ্যতাকেই দায়ী করছেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা।

দেখা যায়, জেলার আওতাধীন জিকে ক্যানেলে বোরোধান রোপণের মওসুম শেষ হতে চললেও এক ফোঁটা পানি নেই। সেচ প্রকল্পের মেইন ক্যানেলের বুক জুড়ে এখন শুধুই হাহাকার। পানির অভাবে জিকে সেচ প্রকল্পের আওতাধীন অনেক কৃষক এখনও বোরো ধান রোপণ করতে পারেননি। ফলে সবুজ ধানক্ষেতের বদলে এসব ফসলি জমি এখনও রয়েছে গোচারণভূমি। বিলম্বে বোরো ধান রোপণের কারণে জিকে সেচ প্রকল্পের আওতাধীন চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ ও কুষ্টিয়া জেলার কয়েক লাখ হেক্টর জমির বোরো ধানের ফলন বিপর্যয়ের আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে।

সূত্রমতে, জিকে সেচ প্রকল্পের আওতায় ৪ জেলার ১৩ উপজেলার পৌনে ৫ লাখ একর জমিতে সেচ দেওয়া হয়। পানি সরবরাহ বন্ধ থাকায় বোরো ধান আবাদে ব্যাহত হচ্ছে। ১৫ জানুয়ারি সেচ প্রকল্পের আওতায় খালে পানি সরবরাহের কথা ছিল। কিন্তু সেটিও করতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। কৃষি বিভাগের পরিসংখ্যান মতে, তিন জেলার প্রায় ২ লাখ ৩২ হাজার হেক্টর জমিতে সেচ দিতে হয়। এর প্রায় সবটাই আসে ৫৮৩টি গভীর নলকূপ, ৩২৭টি এলএলপি এবং ১ লাখ ১৩ হাজার ৯৫১টি অগভীর নলকূপ থেকে।

পরিবেশবিদ গৌতম কুমার রায় বলেন, ‘আমাদের ভূগর্ভস্থ পানির ওপর যে মাত্রাতিরিক্ত নির্ভরতা, তা কমাতে হবে। প্রয়োজনে বর্ষায় পানি ধরে রাখার জন্য কোনো উপায় বা পদ্ধতি বাস্তবায়ন করতে হবে। ইতিমধ্যে এই অঞ্চলের কৃষি ও জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়েছে। এখনই কার্যকর উদ্যোগ নিতে ব্যর্থ হলে আমাদের জন্য ভয়ংকর ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে বলে মনে করেন গৌতম রায়।’

কুষ্টিয়া জনস্বাস্থ্য বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী ইবরাহিম মো. তৈমুর বলেন, ‘এ সংকট কাটাতে সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ এবং পানি সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর পক্ষ থেকে যৌথ ও বাস্তবসম্মত উদ্যোগ নেওয়ার বিকল্প নেই।’ তিনি জানান, অঞ্চলটিতে বছরের প্রায় ছয় মাস পানির স্তর অনেক নিচে নেমে যায়। সংকটে থাকে অগভীর স্তরের পানি সংগ্রহের যন্ত্রগুলো। আগামীতে হয়তো এ সংকটকালের পরিধি বাড়বে।

বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি), কুষ্টিয়ার নির্বাহী প্রকৌশলী (সেচ বিভাগ) ও প্রকল্প পরিচালক মো. আলী আশরাফ বলেন, ‘আধুনিক সেচপ্রযুক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে কৃষকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মুজিবনগর সমন্বিত কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে প্রকল্প এলাকায় আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দারিদ্র্য বিমোচনে প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। যদিও প্রয়োজনের তুলনায় এই প্রকল্পের পরিধি ১০ শতাংশও নয়। তবে এ প্রকল্পের আওতা বাড়াতে ইতিমধ্যে প্রস্তাবনা প্রস্তুত করা হয়েছে বলে জানান তিনি।

ভেড়ামারা পাম্প হাউজের নির্বাহী প্রকৌশলী মিজানুর রহমান বলেন, জিকে প্রকল্পের প্রধান ৪টি সেচ পাম্পের ৩টির সংস্কার কাজ চলছে। অপরদিকে প্রকল্পের চ্যানেলে এখন পানি পাওয়া যাচ্ছে ৪ দশমিক ৫ আরএল মিটার। হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে এখন গত ৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন ৪ দশমিক ৬ থেকে ৪ দশমিক ৭ আরএল মিটার পানি পাওয়া যাচ্ছে। এত কম পানি দিয়ে পাম্প চালানো সম্ভব নয়। তিনি আরো বলেন, জিকে প্রকল্পের প্রধান সরবরাহ খালের তিন নং ব্রিজের কাজ করছে সড়ক বিভাগ। এ কারণে মাটি ফেলে বন্ধ করে রাখা হয়েছে জিকের প্রধান খালটি। সড়ক বিভাগের কাজ শেষের দিকে, ৩০ জানুয়ারি খাল উন্মুক্ত করে দেবে বলে তারা জানান।

জিকে প্রকল্প একসময় দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে কৃষিতে বিপ্লব ঘটানো গঙ্গা-কপোতাক্ষ (জি-কে) প্রকল্পের কার্যক্রম সঙ্কুচিত হতে হতে এখন ৮ ভাগের ১ ভাগে নেমে এসেছে। পাম্প নষ্ট ও খালগুলো দখল-দূষণ হওয়ায় মুখ থুবড়ে পড়ছে এ সেচ প্রকল্প।

পানি উন্নয়ন বোর্ড এর কুষ্টিয়ার পাউবো’র বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী রাশিদুর রহমান বাপ্পি জানান, ৪ জেলার ১ লাখ ৯৭ হাজার হেক্টর জমিতে সেচের লক্ষ্যে যাত্রা শুরু এই প্রকল্পর। এর স্বর্ণযুগে ১৯৮৩ সালে ১ লাখ ১৬ হাজার হেক্টর জমিতে সেচ দেয়া হয়। বর্তমানে এর আওতায় ৯৫ হাজার ৬০০ হেক্টর জমিতে সেচ দেয়া সম্ভব। কিন্তু খালগুলোর বড় অংশ দখলে থাকা ও প্রকল্পের তিনটি পাম্পের মধ্যে দুটিই নষ্ট হওয়ায় চলতি বোরো মৌসুমে সর্বোচ্চ ১৫ হাজার হেক্টর জমিতে সেচ দেয়া সম্ভব হবে। রাশিদুর রহমান বাপ্পি আরো জানান, চার জেলার ১৩টি উপজেলায় এ কার্যক্রম বিস্তৃত।

প্রকল্পে প্রধান তিনটি খাল, ৪৯টি শাখা খাল ও ৪৪৪টি উপশাখা খাল রয়েছে। প্রধান খালের দৈর্ঘ্য ১৯৩ কিলোমিটার। শাখা খালগুলোর দৈর্ঘ্য ৪৬৭ কিলোমিটার ও উপশাখা খালের দৈর্ঘ্য হাজার কিলোমিটার। ১৯৫১ সালে পরিচালিত প্রাথমিক জরিপের পর ১৯৫৪ সালে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার প্রকল্পটি অনুমোদন করে।

এ প্রকল্পের আওতায় বছরে ৬০০ টাকায় ১ একর জমিতে ৩ মৌসুমে সেচ দিতে পারেন কৃষকরা। স্যালো মেশিন কিংবা বৈদ্যুতিক পাম্প চালিয়ে সমান পরিমাণ জমিতে সেচ দিতে কৃষকের ব্যয় হয় প্রায় ৪০ হাজার টাকার মতো। প্রকৌশলী রাশিদুর রহমান বাপ্পি বলেন, শুষ্ক সময়ে এখানে পানির স্তর অনেক নিচে নেমে যায়। অনেক এলাকায় পানি ওঠেই না। ঝিনাইদহের হরিণাকুন্ডুসহ অনেক এলাকায় জিকে না দিলে মানুষ খাওয়ার পানিও পায় না। জিকের পানি উপরিভাগে থাকায় পানির স্তর সাধারণত কিছুটা উঁচুতে থাকে। জিকের পানি না থাকলেও স্তর অনেক নিচে নেমে যায়।

কুষ্টিয়া সদর উপজেলার বড় আইলচারা গ্রামের আনার আলী বলেন, এমনিতেই চাহিদা মতো সার পাওয়া যাচ্ছে না, তার ওপর ডিজেলের দাম অনেক বেড়েছে। এর সঙ্গে বাড়তি যোগ হওয়া পানি সংকটে তারা একেবারে দিশেহারা। পানি উন্নয়ন বোর্ড বলছে, পানি সরবরাহের চেষ্টা চালাচ্ছে তারা। কিন্তু পদ্মায় পানির স্তর অনেক কম থাকায় পাম্পে প্রয়োজনীয় পানি উঠছে না। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জিকে প্রকল্প মুখ থুবড়ে পড়লে ভয়াবহ ঝুঁকির মধ্যে পড়বে এ অঞ্চলের কৃষি আবাদ। বোরো মৌসুমে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হয়ে উৎপাদন ব্যাহত হবে এ মৌসুমে।