এস আই বাবর, সাতকানিয়া : অপারেশনের পর ইসমাম বার বার আমার কাছ থেকে এক গ্লাস পানি খেতে চেয়েছিল কিন্তু চিকিৎসকের নিষেধ থাকায় আমি দিতে পারিনি। পানি না খেয়েই পরপারে চলে গেল আমার ছেলে ইসমাম। ছেলেকে পানি দিতে না পারার কষ্ট আমাকে ক্ষত-বিক্ষত করে দিচ্ছে। বার বার মনে পড়ছে ইসমামের বলা শেষ কথাগুলো। ইসমাম বলছে “আম্মু আমাকে একটু পানি দাও”।

ছাত্র-জনতার আন্দোলনে ঢাকার চাঁনখারপুলে পুলিশ ও আওয়ামী সন্ত্রাসীদের গুলীতে নিহত চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার দর্জি পাড়ার বাসিন্দা ইসমামের মা সাহেদা বেগম এসব কথা বলেন। জানা যায়, ইসমামুল হকরা ছিল তিন ভাই। বড় ভাই মুহিবুল হক (১৯) আর ছোট ভাই আবু বক্কর ছিদ্দিক তানভীর (১৩)। মাত্র ১০ বছর বয়সে বাবা নুরুল হক মারা যান। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি বাবার মৃত্যুর পর স্থানীয় সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৫ম শ্রেণী পর্যন্ত লেখা পড়া করে আর্থিক অনটনের কারণে লেখাপড়ার ইতি টানতে হয় ইসমামকে। ২০১৯ সালে মাত্র ১২ বছর বয়সে আমিরাবাদে শুরু করেন চাকরি জীবন। এর পর সেখান থেকে আরো বাড়তি বেতনের আশায় ২০২৩ সালে চাকরি নেন ঢাকার চকবাজারের একটি জুয়েলারি দোকানে। ইসমাম ঢাকায় আর মুহিবুল আমিরাবাদে একটি দোকানে চাকরি করে অর্জিত অর্থ দিয়ে মা সাহেদা বেগম ও ছোট ভাই আবু বক্কর ছিদ্দিকের অন্নের সংস্থান ও পড়ালেখার খরচ কোন রকমে চলছিল।

ইসমামের বড় ভাই মুহিবুল হক (২০) জানান, ২০২৪ এর জুলাইয়ে ছাত্র জনতার আন্দোলন শুরু হলে সেখানে অংশ নিতে থাকেন। সর্বশেষ কোটা বিরোধী আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা ৫ আগস্ট মার্চ টু ঢাকা কর্মসূচি শুরু ঘোষণা করলে তাতে যোগ দেন ইসমাম। ৫ আগস্ট সকালে চকবাজার থেকে অন্যান্য ছাত্র-জনতার সাথে শাহবাগের দিকে এগুতে থাকলে চাঁনখার পুল এলাকায় পুলিশের এলোপাতাড়ি গুলীতে গুরুতর আহত হয় ইসমাম। গুরুতর আহত অবস্থায় লোকজন উদ্ধার করে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখানকার কর্তব্যরত লোকজন চিকিৎসা না দিয়ে ফিরিয়ে দেয় ইসমামকে। খবর পেয়ে পরের দিন আমি আমার মাকে সাথে নিয়ে ঢাকায় যায়। ইসমামের গুরুতর অবস্থা দেখে তাকে আবারো ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখানে তাকে জরুরি ভিত্তিতে অপারেশন করানো হয়। অপারেশনের পর একটু সুস্থবোধও করছিল আমার ভাই। তখন আমার ও মায়ের সাথে কথা বলে ইসমাম। হঠাৎ করে অবস্থার অবনতি হলে ৭ আগস্ট সকালে তাকে আইসিইউতে নেয়া হয়। সেখানে চিকিৎসারত অবস্থায় আমাদের ছেড়ে চলে যায় ইসমাম। এরপরে আন্দোলনের সমন্বয়ক ও এলাকাবাসীর সহযোগিতায় ৮ আগস্ট লাশ লোহাগাড়ায় আনা হয়। সেখানে শাহপীর পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে জানাযা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।

কেমন আছে ইসমামের পরিবার : জানা যায়, ইসমাম আর ইসমামের বড় ভাই মুহিবের চাকরি থেকে অর্জিত অর্থ দিয়ে মায়ের খাবার ও ছোট ভাই আবু বক্কর ছিদ্দিকের লেখাপড়ার খরচ চলতো। এখন ইসমাম নেই। থেমে গেছে ইসমামের মাসে মাসে পাঠানো অর্থ। বর্তমানে বড় ভাই মুহিবুল লোহাগাড়ার আমিরাবাদে একটি দোকানে চাকরি করে। সেখান থেকে মাইনে পাই হাজার পাচেঁক টাকা। সেই টাকা দিয়ে মায়ের খাবার আর ছোট ভাইয়ের লেখাপড়ার খরচ জোগাতে বেশ বেকায়দায় মুহিবুল। মুহিবুল বলেন, সরকারি ভাবে জুলাই স্মৃতি ফাউন্ডেশন, জেলা প্রশাসন ও জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে আর্থিক সহযোগিতা করা হয়েছে। বর্তমানে তার ছোট ভাই আবু বক্কর ছিদ্দিক হাফেজী শেষ করে আধুনগর ইসলামিয়া মাদরাসায় ক্লাশ ফাইভে পড়ালেখা করছে।

জেলা প্রশাসকের বক্তব্য: জানতে চাইলে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক ফরিদা খানম বলেন, কোটা বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনে শহীদ পরিবার, আহত ও তাদের পরিবারের খোঁজ খবর সরকার নিয়মিত রাখছে। আমরা ডিসেম্বর মাসে চট্টগ্রামের নয় জন শহীদ (ইসমামসহ) পরিবারকে এক লক্ষ টাকা করে দিয়েছি। এর পরে জানুয়ারী মাসে ইসমামের বাড়ি করার জন্য নগদ অর্থ সহায়তা করা হয়েছে। আগামীতে সরকারী ঘোষণা অনুযায়ী তাদের আরো সহায়তা করা হবে।

শাহজাহান চৌধুরীর বক্তব্য: ইসমামুল হকের মৃত্যুর পরবর্তী সময়ে জানাযা ও দাফন কার্যক্রম নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেন সাতকানিয়া-লোহাগাড়া আসনের সাবেক এমপি আলহাজ শাহজাহান চৌধুরী। তিনি বলেন, শহীদ ইসমামের জন্য আমাদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হচ্ছে। তার মৃত্যুতে পরিবারটি বিপর্যস্ত হয়ে গেল। সরকারের পক্ষ থেকে সহযোগিতাতো থাকবেই। এর বাইরে আমরা স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় জামায়াত ইসলামীর পক্ষ থেকে তার পরিবারকে সহায়তা করেছি। কবর জেয়ারত ও পরিবারের সদস্যদের সান্ত্বনা দেয়ার জন্য জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান কেন্দ্রীয় নেতাদের সাথে নিয়ে লোহাগাড়ায় এসেছিলেন। ইসমামরা রক্ত দিয়েছে বলেই ফ্যাসিস্ট হাসিনা পালাতে বাধ্য হয়েছে। আমরা এই শহীদদের সব সময় স্মরণে রাখবো, ইনশাআল্লাহ।