খুলনা অঞ্চলের বাছাইকৃত রুকন প্রার্থী শিক্ষাশিবির
খুলনা ব্যুরো
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের শুধু সামনে তাকালে চলবে না; ভবিষ্যতের সম্ভাব্য পরিস্থিতি বিবেচনা করে দূরদৃষ্টি নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বিপদ সংকেত বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং একটি পথ বন্ধ হলে বিকল্প পথ খুঁজে বের করার যোগ্যতা নেতৃত্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গুণ। তিনি বলেন, দূরে তাকালে শরীর, মন সোজা থাকে, চলতে থাকে। এজন্য সামনে কী হতে পারে, এটা বুঝতে পারব। বিপদ সংকেত বুঝতে পেরে সিদ্ধান্ত নেওয়ার যোগ্যতা, এক পথ বন্ধ হলে অন্য পথ খুলে দেওয়ার যোগ্যতা, এগুলো হিকমতের লক্ষণ। ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের বিভিন্ন গুণাবলি তুলে ধরে তিনি তাওয়াক্কুল, বায়াত ও শোকরের গুরুত্বও ব্যাখ্যা করেন। গতকাল শনিবার সকালে নগরীর আল ফারুক সোসাইটি মিলনায়তনে খুলনা অঞ্চল জামায়াতে ইসলামীর উদ্যোগে খুলনা অঞ্চলের বাছাইকৃত রুকন প্রার্থী শিক্ষাশিবিরে (পুরুষ-মহিলা) প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি এ সব কথা বলেন।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য খুলনা অঞ্চল পরিচালক অধ্যক্ষ মোহাম্মদ ইজ্জত উল্লাহ এমপির সভাপতিত্বে ও কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য খুলনা অঞ্চল টিম সদস্য মাওলানা আবুল কালাম আজাদ এমপির পরিচালনায় বিশেষ অতিথি ছিলেন কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা এ টি এম মাছুম, কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল সাবেক এমপি ড. হামিদুর রহমান আযাদ ও কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা মো. শাহজাহান। আলোচনা করেন ও উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও খুলনা অঞ্চল টিম সদস্য মুহাদ্দিস আব্দুল খালেক এমপি, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য খুলনা মহানগরী আমীর মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমান, খুলনা অঞ্চল টিম সদস্য অধ্যক্ষ মাওলানা মশিউর রহমান খান এমপি, হাফেজ মুহাদ্দিস রবিউল বাশার এমপি, মাস্টার শফিকুল আলম, খুলনা জেলা আমীর মাওলানা এমরান হুসাইন, সাতক্ষীরা জেলা আমীর উপাধ্যক্ষ মো. শহীদুল ইসলাম মুকুল, বাগেরহাট জেলা আমীর মাওলানা রেজাউল করিম, খুলনা মহানগরী নায়েবে আমীর অধ্যাপক নজিবুর রহমান, জেলা নায়েবে আমীর অধ্যক্ষ মাওলানা মো. কবিরুল ইসলাম, সহকারী সেক্রেটারি অধ্যাপক মিয়া গোলাম কুদ্দুস, মহানগরী অফিস সেক্রেটারি মীম মিরাজ হোসাইন, প্রচার সেক্রেটারি মুহাম্মদ আব্দুল গফুর, অধ্যাপক ইকবাল হোসেন, মাওলানা শাহারুল ইসলাম, মাওলানা শেখ মো. অলিউল্লাহ প্রমুখ।
তাওয়াক্কুলের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে জামায়াতে ইসলামীর এই সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, মানুষের দায়িত্ব হলো নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া। তবে চূড়ান্ত ফলাফলের জন্য বস্তুগত শক্তির ওপর নির্ভর না করে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখতে হবে। তিনি বলেন, মানুষকে আমরা মামলার জন্য উকিল বানাই, আর আমার ইচ্ছা পূরণ, দুনিয়ার সব প্রয়োজন পূরণের জন্য আমি আল্লাহকে উকিল বানাবো। এটার নাম তাওয়াক্কুল। মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, জাগতিক, বৈষয়িক, লজিস্টিক ও কারিগরি প্রস্তুতি থাকা প্রয়োজন। তবে এসব প্রস্তুতিকে সফলতার একমাত্র ভিত্তি মনে করা যাবে না। তাঁর ভাষায়, আমার বস্তুগত সমস্ত প্রস্তুতি থাকতে পারে, কিন্তু আল্লাহ তাআলা যদি আমার ওপর রাজি না হন, কুদরতের মালিক যদি রাজি না হন, আমার হাজারো কোটি টাকা, হাজারো জনবল সব ব্যর্থ হয়ে যাবে।
তাওয়াক্কুলের বিষয়টি বোঝাতে কৃষকের উদাহরণও দেন তিনি। কৃষক জমিতে ধান ফলাতে বীজ, সার ও কীটনাশক ব্যবহার করেন, আগাছা পরিষ্কার করেন এবং ফসলের পরিচর্যা করেন। কিন্তু সব প্রস্তুতি ও পরিশ্রমের পরও সেই ফসল শেষ পর্যন্ত তাঁর নিজের রিজিকে নাও থাকতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তাওয়াক্কুলের তিনটি লক্ষণের কথা উল্লেখ করেন মিয়া গোলাম পরওয়ার। প্রথমত, নিজের তদবির ও বস্তুগত শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভর না করে আল্লাহর ওপর ভরসা করা। দ্বিতীয়ত, নিজের সাধ্য-যোগ্যতার পরিবর্তে পরীক্ষার সময় আল্লাহর সাহায্যের ওপর আস্থা রাখা। তৃতীয়ত, একা হলেও আন্দোলনে টিকে থাকার জন্য আল্লাহর ওপর নির্ভর করা।
তিনি বলেন, কে আছে আর কে নেই, কোন বড় লোক চলে গেল, কোন আমীর গেল, রুকন গেল, কোন এমপি গেল, কী করল, কিচ্ছু আসে যায় না। আমি আমার আল্লাহর ওপর চলতে থাকব। এটা আমার তাওয়াক্কুল।
বায়াতের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, বায়াতের অর্থ বেচাকেনা। ইসলামী পরিভাষায় এর মাধ্যমে একজন ব্যক্তি নিজের জান-মাল ও সত্তাকে আল্লাহর পথে ব্যবহারের অঙ্গীকার করেন।
সূরা তাওবার ১১১ নং আয়াত উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, ‘নিশ্চয়ই মুমিনের কাছ থেকে আল্লাহ ক্রয় করে নিচ্ছেন জান ও মাল, জান্নাতের বিনিময়ে। তিনি বলেন, মানুষের চোখ, জবান, হাত, পা ও সম্পদ, সবই আল্লাহর দেওয়া আমানত। তাই এসব নিজের ইচ্ছামতো নয়, আল্লাহর নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবহার করার অঙ্গীকারই বায়াতের মূল তাৎপর্য। মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, চোখ দিয়ে এমন কোনো দৃশ্য দেখব না, যা আল্লাহ অপছন্দ করেন; হাত দিয়ে এমন কোনো কাজ করব না, যা তিনি অপছন্দ করেন; জবান দিয়ে এমন কোনো কথা বলব না, যা তিনি অপছন্দ করেন, এভাবে অঙ্গীকার পালন করার অর্থই হলো এসব আল্লাহর কাছে বিক্রি করে দেওয়া। তিনি আরও বলেন, সংগঠনের পরিভাষায় বায়াত হচ্ছে নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্যের শপথ এবং সংগঠনের সিদ্ধান্ত মেনে চলার অঙ্গীকার।
বায়াত গ্রহণকারীদের রুকন হিসেবে উল্লেখ করে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, রুকন অর্থ খুঁটি, স্তম্ভ, পিলার বা অবলম্বন। বায়াতের মাধ্যমে একজন কর্মী এমনভাবে নিজেকে গড়ে তুলবেন, যাতে সংগঠন তাঁর ওপর আস্থা রাখতে পারে। তিনি বলেন, ঝড় আসবে, প্রতিবাদ আসবে, মিছিল আসবে, মৃত্যু আসবে, জুলুম আসবে, ঝড় আসতে সবাই পালিয়ে যায়, পড়ে যায়; আমি খুঁটির মতো দাঁড়িয়ে থাকব। এই চরিত্র অর্জন করার জন্য বায়াত নিতে হবে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সংগঠনের দায়িত্বশীলদের মাধ্যমে সংশোধন, আত্মসমালোচনা ও জবাবদিহির মধ্য দিয়ে কর্মীদের এই দৃঢ়তা তৈরি করতে হবে।
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে শুকর বা কৃতজ্ঞতার গুরুত্ব তুলে ধরেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল। এ প্রসঙ্গে তিনি কুরআনের আয়াত ‘লাইন শাকারতুম লা-আজিদান্নাকুম’ উল্লেখ করে বলেন, আল্লাহর নেয়ামত ও অনুগ্রহের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলে তিনি আরও বাড়িয়ে দেন। তিনি বলেন, এসব গুণাবলি অর্জনের মধ্য দিয়ে মুমিনের গুণাবলি অর্জন করতে হবে। একই সঙ্গে ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের প্রয়োজনীয় চরিত্র ও যোগ্যতা অর্জনের আহ্বান জানান তিনি।
জামায়াতকে বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে এগিয়ে যেতে হচ্ছে
সৈয়দপুর (নীলফামারী) সংবাদদাতা : বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, সংগঠন পরিচালনা ও দেশের সংকট মোকাবিলায় জামায়াতকে বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে এগিয়ে যেতে হচ্ছে। এক্ষেত্রে দায়িত্বশীলদেরকে গঠনমূলক ও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে। আল্লাহর সাথে সম্পর্ককে সর্বাগ্রে শক্তিশালী করতে হবে। জ্ঞান ও প্রজ্ঞায় নিজেদের সমৃদ্ধ করতে হবে। আদর্শ চর্চা ও আচরণের মাধ্যমে নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি করতে হবে। স্যোসাল মিডিয়ার ক্ষেত্রে সাবধানতা, সতর্কতা অবলম্বনপূর্বক দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। মানুষের সমস্যা উপলদ্ধি করে জনকল্যাণকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। মতপার্থক্য মোকাবিলায় সহনশীলতা ও হিকমত অবলম্বন করতে হবে।
তিনি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী রংপুর-দিনাজপুর অঞ্চলের উদ্যোগে জেলা/মহানগরী দায়িত্বশীলদের নিয়ে (১৩ থেকে ১৫ আগস্ট) ৩ দিনব্যাপী আয়োজিত দায়িত্বশীল শিক্ষাশিবিরে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন।
নীলফামারী জেলার সৈয়দপুরে অনুষ্ঠিত ওই শিক্ষা শিবিরে সভাপতিত্ব করেন রংপুর-দিনাজপুর অঞ্চলের পরিচালক ও কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি মাওলানা আবদুল হালিম। এতে বিষয় ভিত্তিক আলোচনা উপস্থাপনা করেন সংগঠনের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা এটিএম মাসুম।
এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও সহকারী অঞ্চল পরিচালক অধ্যক্ষ মাওলানা মমতাজ উদ্দিন, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান বেলাল এমপি, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও সাবেক শিবির সভাপতি মো. দেলওয়ার হোসেন।
সেক্রেটারি জেনারেল ১১ দলীয় ঐক্যের কর্মসূচির প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলেন- বর্তমান সরকার ৭০ ভাগ মানুষের গণভোটের রায় বাস্তবায়নে যে অনাগ্রহ দেখাচ্ছে তার প্রতিবাদে ও জনগনের দাবি বাস্তবায়নে ১১ দল রোড মার্চ সহ নভেম্বরে ঢাকায় মহাসমাবেশের ডাক দিয়েছে। এই কর্মসূচি বাস্তবায়নে স্থানীয় ১১ দলের সাথে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। এই কর্মসূচি পালনের মধ্য দিয়ে গণতান্ত্রিক ও সামাজিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা এবং দুর্নীতি ও ক্ষমতা অপব্যবহারের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নিতে হবে।
তিনি আরো বলেন, সংগঠন পরিচালনা করার দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি পরিবার সুরক্ষা ও গঠনের প্রতি নজর রাখতে হবে। নেতৃবৃন্দকে প্রতিনিয়ত আত্মজিজ্ঞাসার মাধ্যমে নিজেদেরকে দায়িত্ব পালনে প্রস্তুত ও গ্রহণযোগ্য হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। ধৈর্য্য ও সতর্কতা অবলম্বন করে পথ চলতে হবে।
মাওলানা এটিএম মাসুম বলেন, সংগঠনের মেজাজ ও পরিবেশ রক্ষায় ব্যক্তিগত ও সাংগঠনিকভাবে দায়িত্বশীলদেরকে ভূমিকা রাখতে হবে। মেজাজ ও পরিবেশ ক্ষুন্ন করতে পারে এমন সব কাজ পরিহার করতে হবে। পরস্পরের দোষত্রুটি ব্যক্তিগত দৃষ্টি আকর্ষণের মাধ্যমে সংশোধনের চেষ্টা চালাতে হবে। নিজেদের অহংকারমুক্ত রাখতে হবে। দায়িত্ব পালনে সংগঠনের কাছে ও আল্লাহর কাছে জবাবদিহিতার অনুভূতি নিয়ে ময়দানে কাজ করতে হবে।
মাওলানা আবদুল হালিম বলেন, ৩ দিনের প্রশিক্ষণকে ধারণ করে আগামী দিনে সংগঠনকে মজবুত, গতিশীল ও গণমুখী করতে হবে। বিগত নির্বাচনে রংপুর অঞ্চলের মানুষ জামায়াতের প্রতি যে আস্থা দেখিয়েছে কাজের মাধ্যমে তার বাস্তব প্রতিফলন ঘটাতে হবে। ফ্যাসিস্ট আমলে শীর্ষ নেতৃবৃন্দ সহ অসংখ্যা নেতাকর্মীর ত্যাগ-কুরবানীর ফলে অর্জিত সংগঠনের বর্তমান অবস্থানকে আরও মজবুত ও সম্প্রসারিত করতে হবে।
শিক্ষাশিবিরে কুরআন-হাদীস অনুশীলন, বই ও বিষয়ভিত্তিক গ্রুপ আলোচনা পরিচালনা করেন অঞ্চল টীম ও জেলা/ মহানগরীর দায়িত্বশীলবৃন্দ। ৩ দিনব্যাপী শিক্ষা শিবির সঞ্চালনা করেন কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরা সদস্য ও অঞ্চল টীম সদস্য ফকীহ মাওলানা আব্দুল হাকিম। নীলফামারী জেলা আমীর অধ্যক্ষ মাওলানা আব্দুস সাত্তার এমপির নেতৃত্বে নীলফামারী জেলা সংগঠন ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করেন।