খুলনা ব্যুরো
স্বাধীনতার দীর্ঘ পথপরিক্রমায় মুক্তবুদ্ধি চর্চা ও সত্য প্রকাশের অন্যতম হাতিয়ার হলো গণমাধ্যম। তবে এই সত্য প্রকাশের দাম যখন জীবন বা পেশাগত নিরাপত্তাহীনতা দিয়ে শোধ করতে হয়, তখন তা সমগ্র জাতির জন্যই এক অশনিসংকেত। সাম্প্রতিক সময়ে খুলনা তথা দক্ষিণাঞ্চলে সাংবাদিকদের ওপর একের পর এক বর্বরোচিত হামলা, হুমকি, কার্যালয়ে ভাঙচুর এবং প্রকাশ্য গুলিবর্ষণের ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। গত তিন দশকে সন্ত্রাসী ও চরমপন্থীদের রক্তক্ষয়ী সহিংসতার ইতিহাস বহনকারী এই অঞ্চলে কর্মরত গণমাধ্যমকর্মীরা আজ চরম নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে পেশাগত দায়িত্ব পালন করছেন।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সাংবাদিকদের লক্ষ্য করে একের পর এক সহিংস আক্রমণ চালানো হয়েছে। সর্বশেষ খুলনা থেকে প্রকাশিত ঐতিহ্যবাহী ‘দৈনিক প্রবাহ’ অফিসে সশস্ত্র হামলা চালিয়েছে দুর্বৃত্তরা। গত রোববার দিবাগত রাত ২টার দিকে ঘটা এই বর্বরোচিত হামলায় পত্রিকার চিফ পেস্টারম্যান ফয়সাল আহমেদকে গুরুতর মারধর করা হয়। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করলেও এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি। এর আগে গত ১৪ জুলাই দিবাগত রাতে খুলনা মহানগরীর জাতিসংঘ শিশু পার্কের পাশে একটি চা স্টলে বসে থাকা অবস্থায় দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, এসএটিভি এবং স্টার নিউজ-এর ব্যুরো প্রধানসহ ছয়জন সাংবাদিককে লক্ষ্য করে প্রকাশ্যে গুলী চালায় দুর্বৃত্তরা। অলৌকিক কারণে তাঁরা বড় ধরনের প্রাণহানি থেকে রক্ষা পেলেও একজন সাংবাদিক সামান্য আহত হন। এরও আগে ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে একদল উগ্র দুর্বৃত্ত সরাসরি খুলনা প্রেসক্লাবে প্রবেশ করে কর্মরত সাংবাদিকদের শারীরিক ও মানসিকভাবে লাঞ্ছিত করে। এসব ঘটনার প্রতিবাদে স্থানীয় সাংবাদিকরা খুলনা-যশোর মহাসড়ক অবরোধ করে তীব্র বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন।
এর আগে খুলনাঞ্চলে গত তিন দশকে সন্ত্রাসী ও চরমপন্থীদের হামলায় কমপক্ষে এক ডজন সাংবাদিক হত্যাকা-ের শিকার হয়েছেন। এসব হত্যার নেপথ্যে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সক্রিয় ছিল আন্ডারগ্রাউন্ড চরমপন্থী দল ও অপরাধী চক্র। নিহতদের তালিকায় রয়েছে দীর্ঘ ও বেদনাদায়ক ইতিহাস: ২০০১ সালের ১৮ এপ্রিল রাতে সন্ত্রাসীদের হামলায় দৈনিক অনির্বাণের ডুমুরিয়া উপজেলা প্রতিনিধি নহর আলী নিহত হন। ২০০২ সালের ২ মার্চ সন্ধ্যায় অফিসে আসার পথে দৈনিক পূর্বাঞ্চলের ক্রাইম রিপোর্টার হারুন অর রশিদ সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হন। ২০০২ সালের ৫ জুলাই অপহরণের পর গুলি করে হত্যা করে দৈনিক অনির্বাণের অপরাধ বিষয়ক প্রতিবেদক শুকুর হোসাইকে। ২০০৪ সালের ১৫ জানুয়ারি খুলনা প্রেসক্লাবের অদূরে দিবালোকে চরমপন্থীদের বোমা হামলায় দৈনিক সংবাদ ও নিউ এজ-এর সিনিয়র রিপোর্টার এবং বিবিসি বাংলার প্রতিনিধি মানিক চন্দ্র সাহা নিহত হন। ২০০৪ সালের ২৭ জুন অফিস ও বাসভবনের সামনে বোমা হামলায় একুশে পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক এবং দৈনিক জন্মভূমি পত্রিকার সম্পাদক হুমায়ুন কবীর বালু নিহত। খুলনা প্রেসক্লাবের ভেতরে পেতে রাখা বোমা বিস্ফোরণে নিহত হন দৈনিক সংগ্রামের খুলনা ব্যুরো প্রধান শেখ বেলাল উদ্দিন। ২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর রাতে আড়ংঘাটার শলুয়া বাজারে সন্ত্রাসীদের পিস্তলের গুলিতে নিহত হন অনলাইন নিউজ পোর্টালের সম্পাদক ইমদাদুল হক মিলন।
খুলনাঞ্চলের জাতিসংঘ শিশুপার্কের পাশে ৪ সাংবাদিককে লক্ষ্য করে গুলীবর্ষণের ঘটনায় দীর্ঘ এক মাস অতিবাহিত হলেও এখন পর্যন্ত কোনো অপরাধীকে শনাক্ত বা গ্রেপ্তার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। পুলিশের এই দীর্ঘসূত্রতায় খুলনাঞ্চলের সাংবাদিক সমাজে তীব্র ক্ষোভ ও অসোষ বিরাজ করছে। এ ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনার দাবিতে খুলনা মেট্রোপলিটন সাংবাদিক ইউনিয়ন (এমইউজে) খুলনার পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও তথ্যমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি প্রদান করা হয়েছে।
এদিকে, অতীতে সংঘটিত আলোচিত সাংবাদিক হত্যা মামলাগুলোর বিচার প্রক্রিয়ার চিত্রও হতাশাজনক। নিরাপত্তার আশঙ্কায় এসব মামলার অধিকাংশেরই বাদী হননি নিহত পরিবারের কোনো সদস্য। যদিও খুলনায় পাঁচটি সাংবাদিক হত্যার বিচার শেষ হয়েছে, তবে নেপথ্যের মূল কুশীলবরা আজও ধরাছোঁয়ার বাইরে। উদাহরণস্বরূপ, ২০০৪ সালের ১৫ জানুয়ারি বোমা হামলায় নিহত মানিক সাহা হত্যা মামলায় ২০১৬ সালের ৩০ নবেম্বর আদালত ১১ আসামির মধ্যে ৯ জনকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদন্ড দেন। তবে একই সঙ্গে বিস্ফোরক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে দায়ের করা মামলার ১০ আসামীর সবাই খালাস পান। নিহত পরিবার ও সাংবাদিক সমাজ এই রায়ে সন্তুষ্ট হতে পারেনি। তাদের মতে, পুলিশের দুর্বল তদন্ত প্রতিবেদন ও ত্রুটিপূর্ণ অভিযোগপত্রের কারণেই আসামিরা সর্বোচ্চ শাস্তি থেকে বেঁচে গেছেন এবং মূল হোতারা চিহ্নিত হয়নি।
সাংবাদিকদের ওপর ক্রমাগত এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে খুলনা প্রেসক্লাব, মেট্রোপলিটন সাংবাদিক ইউনিয়ন খুলনাসহ বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠন। টিআইবি, জাতীয় মানবাধিকার সংস্থা ‘আইন ও সালিশ কেন্দ্র’ (আসক) খুলনায় সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে অপরাধীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার জোরালো দাবি জানিয়েছে। মানবাধিকার ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা এসব ঘটনাকে স্বাধীন সাংবাদিকতা ও মুক্তচিন্তার ওপর সরাসরি আঘাত বলে অভিহিত করেছেন।
স্থানীয় সাংবাদিকদের জোরালো অভিযোগ, অপরাধের পরও মূল অভিযুক্তরা গ্রেফতর না হওয়ায় দুর্বৃত্তরা আরও বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠছে। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষা এবং সাংবাদিকদের জীবন ও কর্মস্থলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অবিলম্বে প্রশাসনের কঠোর হস্তক্ষেপ ও কার্যকর পদক্ষেপ কামনা করছে দক্ষিণ অঞ্চলের পুরো সাংবাদিক সমাজ।