কুষ্টিয়ায় এনজিও খুলে শত শত কোটি টাকা আত্মসাৎ ও প্রতারণার অভিযোগে দায়ের করা ১২৪ মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানাভুক্ত এবং ১২ মামলায় সাজাপ্রাপ্ত জেল পলাতক আসামি মো. আনিছুর রহমানকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) রাত ১২টার দিকে ঢাকার বিমানবন্দর থানা এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) বিকেলে আদালতের মাধ্যমে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

কুমারখালী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) সোহাগ শিকদার আনিছুর রহমানের গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি কুমারখালী উপজেলার নন্দলালপুর ইউনিয়নের সদরপুর গ্রামের বাসিন্দা।

পুলিশ, স্থানীয় বাসিন্দা ও ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০০৬ সালে নন্দলালপুর ইউনিয়নের আলাউদ্দিননগর এলাকায় ‘বিশ্বাস সঞ্চয় ঋণদান ও সমবায় সমিতি লিমিটেড’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান চালু করেন আনিছুর রহমান। পরবর্তী সময়ে কুষ্টিয়া, রাজবাড়ী, পাবনা, ঝিনাইদহসহ বিভিন্ন জেলায় প্রতিষ্ঠানটির কয়েকশ শাখা খোলা হয়।

এসব শাখার মাধ্যমে গ্রাহকদের দ্বিগুণ টাকা ফেরতের প্রলোভন দেখিয়ে বিভিন্ন মেয়াদি ডিপিএসসহ নানা প্রকল্পের নামে বিপুল পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করা হতো বলে অভিযোগ রয়েছে। কয়েক বছরে শত শত কোটি টাকা জমা হওয়ার পর আনিছুর রহমান ওই অর্থ দিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে জমি, বাড়ি ও গাড়িসহ বিভিন্ন সম্পদ গড়ে তোলেন বলে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ।

২০২৩ সালের শুরুতে প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা অর্থ ফেরতের জন্য চাপ দিতে শুরু করেন। এর মধ্যে একই বছরের নভেম্বরে অফিসে তালা ঝুলিয়ে আনিছুর রহমান আত্মগোপনে চলে যান বলে জানা যায়।

পরে ২০২৪ সালের শুরুতে কুষ্টিয়াসহ বিভিন্ন আদালতে তার বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাৎ ও প্রতারণার অভিযোগে প্রায় ১২৪টি মামলা দায়ের হয়। এসব মামলায় আদালত তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। পাশাপাশি ১২টি মামলায় বিভিন্ন মেয়াদে সাজা হয় তার।

পুলিশ জানায়, ২০২৪ সালের ৩০ এপ্রিল বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার সময় ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে আনিছুর রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাকে কুষ্টিয়া কারাগারে পাঠানো হয়। কিন্তু একই বছরের ৭ আগস্ট দুপুরে কারাগারের প্রধান ফটক ভেঙে আনিছুর রহমানসহ ১০৪ আসামি পালিয়ে যান।

দীর্ঘদিন পলাতক থাকার পর বুধবার রাতে ঢাকার বিমানবন্দর থানা এলাকা থেকে তাকে পুনরায় গ্রেপ্তার করে পুলিশ। বৃহস্পতিবার বিকেলে আদালতের মাধ্যমে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।

আনিছুর রহমানের গ্রেপ্তারের খবর পেয়ে বৃহস্পতিবার সকালে অনেক ভুক্তভোগী কুমারখালী থানায় এসে জড়ো হন। তারা দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা টাকা ফেরতের দাবি জানান।

রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলার মাছপাড়া এলাকার আব্দুল মাজেদ (৬৪) বলেন, সারা জীবন গার্মেন্টসে চাকরি করে প্রায় সাড়ে ১১ লাখ টাকা জমিয়েছিলেন। চার বছরে টাকা দ্বিগুণ করার আশায় তিনি আনিছুরের প্রতিষ্ঠানে সেই অর্থ জমা রাখেন। কিন্তু দুই বছরের মাথায় টাকা নিয়ে আনিছুর পালিয়ে যান বলে অভিযোগ করেন তিনি।

কুমারখালীর শিলাইদহ ইউনিয়নের জাহেদপুর গ্রামের জাহানারা খাতুনও আনিছুরের প্রতিষ্ঠানে অর্থ জমা দিয়েছিলেন। তিনি জানান, চাকরির বেতন, বোনাস, জমির ইজারা এবং গরু-ছাগল বিক্রির টাকা মিলিয়ে প্রায় ৩০ লাখ টাকা তিনি সেখানে জমা রেখেছিলেন। কিন্তু সেই অর্থ আর ফেরত পাননি।

জাহানারা খাতুন অভিযোগ করেন, এনজিওর নামে আনিছুর বিপুল অর্থ আত্মসাৎ করে নিজের নামে বাড়ি, গাড়িসহ বিভিন্ন সম্পদ গড়ে তুলেছেন।

আনিছুরের ভাগ্নি বিনা খাতুন জানান, দ্বিগুণ লাভের আশায় তিনি মামার কাছে তিন লাখ টাকা রেখেছিলেন। সেই টাকাও ফেরত পাননি।

কুমারখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জামাল উদ্দিন বলেন, মানুষের কাছ থেকে প্রলোভনের মাধ্যমে আনিছুর রহমান কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তার বিরুদ্ধে আদালতে মামলা হওয়ার পর তাকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছিল। পরে ২০২৪ সালের ৭ আগস্ট কারাগার থেকে পালিয়ে যান তিনি। এবার তাকে পুনরায় গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

ওসি আরও বলেন, আনিছুরের গ্রেপ্তারের খবর পেয়ে বেশ কয়েকজন ভুক্তভোগী থানায় এসেছেন। তাদের আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে টাকা উদ্ধারের বিষয়ে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।