অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, দেশের মেডিকেল শিক্ষার মান কোনোভাবেই রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হতে দেওয়া যাবে না। একজন ছেলে বা মেয়ে যদি যোগ্যতা অর্জন করে, তাহলে তাকে তার প্রাপ্য সুযোগ পেতেই হবে। মেডিকেল কলেজের মতো গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের কোনো সুযোগ থাকা উচিত নয়। কারণ এখানকার শিক্ষার মান নষ্ট হলে তার প্রভাব পড়ে সরাসরি দেশের জনগণের স্বাস্থ্যসেবার ওপর।
শনিবার চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজের নতুন ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
মন্ত্রী বলেন, স্বাস্থ্যখাতকে সরকার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। বাজেটে স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করা হয়েছে। কারণ উন্নত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। দেশের সাধারণ মানুষ যেন ডিজিটাল ও আধুনিক চিকিৎসাসেবা সহজে পায়, সে লক্ষ্যেই সরকার কাজ করছে।
তিনি বলেন, অনেক সময় উচ্চতর চিকিৎসার প্রয়োজন হলেও দেশে পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধার সীমাবদ্ধতার কারণে রোগীদের বিদেশে যেতে হয়। এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে দেশের হাসপাতাল ও মেডিকেল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। নতুন এই ভবন নির্মাণ সেই লক্ষ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশে অনেক উন্নয়ন প্রকল্প শুরু হলেও তা শেষ হতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। এই প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। প্রকল্প দ্রুত এবং নির্ধারিত সময়ে শেষ করার বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের আরও সচেতন হতে হবে। শুধু বড় বড় ভবন নির্মাণ করলেই হবে না, সেগুলোর পূর্ণাঙ্গ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি শিক্ষার্থীদের আবাসন, খেলাধুলা ও মানসিক বিকাশের বিষয়েও গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, মেডিকেল শিক্ষার্থীদের জন্য শুধু ক্লাসরুম নয়, মানসম্মত আবাসন, খাওয়া-দাওয়ার স্বাস্থ্যসম্মত ব্যবস্থা, খেলাধুলার জন্য খোলা জায়গা এবং ইনডোর সুবিধাও থাকতে হবে। একজন শিক্ষার্থীর মানসিক বিকাশের জন্য এসব বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মন্ত্রী আরও বলেন, বর্তমানে শিক্ষার ধরন বদলে গেছে। এখন শুধু প্রচলিত ক্লাসরুম নয়, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। ভিডিও, ডিজিটাল লার্নিং এবং আধুনিক প্রশিক্ষণ পদ্ধতি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা লাভ করতে পারে।
অর্থনৈতিক বাস্তবতার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, বর্তমান সরকার অর্থনৈতিকভাবে একটি কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বাজেট থেকে ইতোমধ্যে বিপুল অঙ্কের অর্থ বিভিন্ন খাতে ব্যয় হয়ে গেছে। জ্বালানিখাতে ইতোমধ্যে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা সরাসরি চলে গেছে এবং আগের সরকারগুলোর রেখে যাওয়া ঋণাত্মক হিসাবও সামাল দিতে হচ্ছে। প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকার মতো আর্থিক চাপ নিয়ে সরকারকে কাজ করতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, এই বাস্তবতার মধ্যেও স্বাস্থ্যখাত ও শিক্ষাখাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। কারণ দেশের মানুষের চিকিৎসা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উন্নয়ন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ।
মন্ত্রী মেডিকেল টেকনোলজি ইনস্টিটিউট গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, দেশে দক্ষ মেডিকেল টেকনোলজিস্টের বড় সংকট রয়েছে। শুধু ডাক্তার নয়, নার্স, টেকনোলজিস্ট, মেডিকেল ম্যানেজমেন্ট বিশেষজ্ঞ-সবাইকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। মেডিকেল টেকনোলজি ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করা গেলে দেশে যেমন দক্ষ জনবল তৈরি হবে, তেমনি বিদেশেও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে।
তিনি বলেন, মেডিকেল কলেজে আসন সংখ্যা বাড়ানোর আগে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাত ঠিক আছে কিনা তা নিশ্চিত করতে হবে। শুধু বেশি শিক্ষার্থী ভর্তি করিয়ে প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা বাড়ানো যাবে না। যদি শিক্ষক সংকট থাকে, তাহলে শিক্ষার মান কমে যাবে। আগে মান নিশ্চিত করতে হবে, তারপর আসন বাড়ানোর চিন্তা করা উচিত।
আমির খসরু বলেন, আমাদের দেশের জন্য ভালো ডাক্তার, দক্ষ নার্স, প্রশিক্ষিত টেকনোলজিস্ট এবং কার্যকর মেডিকেল ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত জরুরি। স্বাস্থ্যখাতের প্রতিটি অংশকে সমানভাবে উন্নত করতে পারলেই সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজের নতুন ভবন নির্মাণের মাধ্যমে চিকিৎসা ও শিক্ষা-উভয় ক্ষেত্রেই নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে এবং দেশের জনগণ আরও উন্নত স্বাস্থ্যসেবা পাবে।