৫০-এ শুরু হয়েছিল যে পথচলা, ৫৯-এ এসে হাতে অনার্সের সনদ

জীবনের যে সময়ে এসে অনেকেই সন্তানের ভবিষ্যৎ, সংসার আর অবসরজীবন নিয়ে ভাবেন, সেই বয়সেই নিজের অসম্পূর্ণ শিক্ষার স্বপ্নকে নতুন করে জাগিয়ে তুলেছিলেন বেলায়েত শেখ। বয়স তখন ৫০। সামনে ছিল জীবনের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে আসার ক্লান্তি, পেছনে ছিল নানা বাস্তবতার গল্প। তারপরও মনের ভেতর একটি ইচ্ছা তাঁকে বারবার তাড়িয়ে বেড়িয়েছে-আবার পড়াশোনায় ফিরতে হবে, একটি ডিগ্রি অর্জন করতে হবে।

সেই ইচ্ছা থেকেই হাতে তুলে নিয়েছিলেন বই-খাতা। ২০১৭ সালে ঢাকার দারুল ইসলাম আলিম মাদ্রাসায় নবম শ্রেণিতে ভর্তি হন তিনি। নতুন করে স্কুলজীবন শুরু করা সহজ ছিল না। বয়সে অনেক ছোট শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একই শ্রেণিতে বসে পড়াশোনা করার অভিজ্ঞতাও ছিল একেবারেই ভিন্ন। কিন্তু মানুষের কথা বা বয়সের ব্যবধানকে তিনি নিজের পথে বাধা হতে দেননি।

নিয়মিত পড়াশোনা চালিয়ে ২০১৯ সালে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন বেলায়েত শেখ। এরপর থামেননি। দুই বছর পর ২০২১ সালে এইচএসসি পরীক্ষাতেও সফল হন। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকের গণ্ডি পেরিয়ে তখন তাঁর স্বপ্ন আরও বড় হয়ে ওঠে-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বেন, অনার্স ডিগ্রি অর্জন করবেন।

এই স্বপ্ন পূরণের পথে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায়ও অংশ নেন তিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার চেষ্টা করেন। শেষ পর্যন্ত ২০২২ সালে স্টেট ইউনিভার্সিটির সাংবাদিকতা, যোগাযোগ ও মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগে ভর্তির সুযোগ পান।

বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙিনায় পা রাখার পর শুরু হয় তাঁর জীবনের আরেকটি নতুন অধ্যায়। বয়সে সহপাঠীদের চেয়ে বড় হলেও ক্লাসে নিয়মিত থাকার চেষ্টা করেছেন তিনি। পাঠ্যবই, অ্যাসাইনমেন্ট, পরীক্ষা-সবকিছুর সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যেতে হয়েছে। একই সঙ্গে সামলাতে হয়েছে সংসারের দায়িত্বও।

বেলায়েত শেখের সংসারে রয়েছেন বৃদ্ধা মা, স্ত্রী, দুই ছেলে ও এক মেয়ে। ছেলে-মেয়েদের ঘরেও রয়েছে তিনজন নাতি-নাতনি। পরিবারের নানা দায়িত্বের মধ্যেও নিজের পড়াশোনার জন্য সময় বের করে নিয়েছেন তিনি। জীবনের ব্যস্ততা যতই থাকুক, লক্ষ্য থেকে সরে যাননি।

অবশেষে এসেছে সেই প্রতীক্ষিত দিন। গত শনিবার (২৯ আগস্ট) স্টেট ইউনিভার্সিটির সাংবাদিকতা, যোগাযোগ ও মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগের অনার্স পরীক্ষার ফল প্রকাশ হয়। ফলাফলে উত্তীর্ণ হয়েছেন বেলায়েত শেখ। বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগের সমন্বয়ক ও সহকারী অধ্যাপক রিফাত সুলতানা তাঁর উত্তীর্ণ হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

একটি ফলাফল তাঁর কাছে তাই শুধু পরীক্ষায় পাস করার খবর নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দীর্ঘ নয় বছরের পরিশ্রম, বয়সকে উপেক্ষা করে এগিয়ে চলা এবং বারবার নিজেকে নতুন করে প্রমাণ করার গল্প। ৫০ বছর বয়সে যে মানুষটি নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী হয়েছিলেন, তিনিই ৫৯ বছরে এসে বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্স ডিগ্রি অর্জন করলেন।

নিজের সাফল্যের অনুভূতি জানাতে গিয়ে বেলায়েত শেখ বলেন, “শিক্ষার কোনো বয়স নেই। জীবনে যত বাধাই আসুক, ইচ্ছাশক্তি ও পরিশ্রম থাকলে স্বপ্ন পূরণ করা সম্ভব। যারা বয়সের কারণে পড়াশোনা থেকে দূরে আছেন, সুযোগ পেলেই তাদের আবার পড়াশোনায় ফিরে আসার আহ্বান জানাই।”

তাঁর এই অর্জনের খবরে আনন্দিত পরিবার, শিক্ষক, সহপাঠী ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বেলায়েত শেখের শিক্ষাজীবনে ফিরে আসা এবং দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর অনার্স ডিগ্রি অর্জনের বিষয়টি প্রশংসা পেয়েছে।

বেলায়েত শেখের গল্পে সবচেয়ে বড় শিক্ষা-জীবনের কোনো একটি পর্যায়ে থেমে যাওয়া মানেই সব শেষ নয়। ইচ্ছা থাকলে নতুন করে শুরু করা যায়, আবার পথ তৈরি করা যায়। তাঁর ক্ষেত্রে সেই নতুন পথচলা শুরু হয়েছিল ৫০ বছর বয়সে; আর নয় বছর পর সেই পথ এসে পৌঁছেছে অনার্সের সনদে।

বয়সের হিসাব হয়তো তাঁকে অনেকের থেকে আলাদা করেছে, কিন্তু স্বপ্নের কাছে তিনি ছিলেন অন্য সবার মতোই একজন শিক্ষার্থী। আর সেই স্বপ্নকে আঁকড়ে ধরে শেষ পর্যন্ত সফল হয়েছেন। তাই বেলায়েত শেখের অর্জন যেন শুধু একটি ডিগ্রি নয়-এটি প্রমাণ যে স্বপ্ন পূরণের জন্য বয়স নয়, প্রয়োজন সাহস, ধৈর্য ও শেষ পর্যন্ত লড়ে যাওয়ার মানসিকতা।