নীল আকাশ ছোঁয়ার এক রোমাঞ্চকর স্বপ্ন নিয়ে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে ঘুরতে গিয়েছিলেন তরুণ শৌভিক রায়। সমুদ্রের বিশালতার মাঝে ডানা মেলে আকাশে ওড়ার সে আনন্দ এক নিমেষেই রূপ নিল মহাবিষাদে। নিরাপত্তা ব্যবস্থার চরম ত্রুটি আর দায়িত্বহীনতার খেসারত দিতে হলো একটি তাজা প্রাণ দিয়ে। কক্সবাজার সৈকতের দরিয়ানগর এলাকায় ‘এফ্লাই এয়ার সি স্পোর্টস প্যারাসেইলিং’-এ ঘটে যাওয়া এই নির্মম দুর্ঘটনা কেবল একজন সম্ভাবনাময় তরুণকেই কেড়ে নেয়নি, বরং দেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্রে পর্যটকদের নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক নজরদারি নিয়ে জন্ম দিয়েছে এক গভীর ও প্রশ্নবিদ্ধ শূন্যতার।

গত শনিবার (১ আগস্ট) দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে কক্সবাজারের দরিয়ানগর এলাকায় প্যারাসেইলিং করতে গিয়ে নিরাপত্তা হারনেস ছিঁড়ে সমুদ্রে ছিটকে পড়েন খুলনা মহানগরীর বানিয়াখামার এলাকার শৌভিক রায়। হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এই মর্মান্তিক মৃত্যু পর্যটন খাতের অনিয়ম ও উদাসীনতাকে আবারও নগ্নভাবে ফুটিয়ে তুলেছে।

আনন্দের আনন্দযাত্রা যেভাবে পরিণত হলো বিষাদে

খুলনা সদর থানাধীন বানিয়াখামার এলাকার শেখর রায়ের পরিবারে বইছিল আনন্দের হাওয়া। কর্মব্যস্ত জীবনের যান্ত্রিকতা থেকে দূরে একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস নিতে এবং পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ৯ সদস্যের একটি দল কক্সবাজার ভ্রমণে গিয়েছিলেন শৌভিক রায়। হাসিখুশি প্রাণোচ্ছ্বল তরুণ শৌভিক সবাইকে মাতিয়ে রেখেছিলেন সারাক্ষণ। সমুদ্রের গর্জন, সৈকতের বালুবেলা আর নোনা জলের হাওয়া তাদের মনকে করে তুলেছিল সতেজ।

ঘুরতে ঘুরতে তাদের পা পড়ে কক্সবাজারের অন্যতম আকর্ষণীয় রোমাঞ্চকর জলক্রীড়া ‘প্যারাসেইলিং’ স্পটে। উঁচুতে আকাশে ভেসে সমুদ্রের নীল জলরাশি দেখার লোভ সামলানো কঠিন ছিল। কিন্তু কে জানত, এই আকাশভ্রমণই তার জীবনের শেষ ভ্রমণ হয়ে থাকবে। ‘এফ্লাই এয়ার সি স্পোর্টস প্যারাসেইলিং’ প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনায় নির্ধারিত ফি পরিশোধ করে আকাশে ওড়ার প্রস্তুতি নেন শৌভিক। শরীরে বেল্টের মতো বাঁধা হয় নিরাপত্তা হারনেস—যেটি উচ্চতা থেকে পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি রোধ করার কথা। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যেই ঘটে যায় এক অনাকাঙ্ক্ষিত বিভীষিকা।

প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, প্যারাসেইলিং চলাকালীন মাঝ আকাশে হঠাৎ করেই আলগা হয়ে যায় বা ছিঁড়ে যায় শৌভিকের নিরাপত্তা হারনেস। কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই কয়েকশ’ ফুট ওপর থেকে সরাসরি উত্তাল সমুদ্রে ছিটকে পড়েন তিনি। আঘাত পান মারাত্মকভাবে। মুহূর্তের মধ্যে আনন্দমুখর পরিবেশ রূপ নেয় আর্তনাদে। তাৎক্ষণিকভাবে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা তাকে উদ্ধার করে দ্রুত কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নিয়ে যান। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। হাসপাতালের জরুরি বিভাগের কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে মৃত বলে ঘোষণা করেন। হাসপাতাল চত্বরে শৌভিকের স্বজনদের হৃদয়বিদারক আহাজারি উপস্থিত সকলের হৃদয়কে ভারাক্রান্ত করে তোলে। যে স্বজনরা কিছু সময় আগেও শৌভিকের হাসিমুখ দেখছিলেন, তারা এখন নিথর দেহের পাশে বাকরুদ্ধ। এই আকস্মিক মৃত্যু খুলনা মহানগরীর বানিয়াখামার এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। পাড়া-প্রতিবেশী ও আত্মীয়স্বজনরা কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না এত হাসিখুশি একটি ছেলে এভাবে চলে যেতে পারে।

বারবার দুর্ঘটনা ও দায়িত্বহীনতার চিত্র

ঘটনার পর থেকেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে প্যারাসেইলিং পরিচালনার দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর লাইসেন্স, যান্ত্রিক সক্ষমতা এবং নিরাপত্তা মানদণ্ড নিয়ে। স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের অভিযোগ, দরিয়ানগর ও হিমছড়ি এলাকায় মো. ফরিদের মালিকানাধীন ‘এফ্লাই এয়ার সি স্পোর্টস’সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে নামমাত্র সুরক্ষায় এই ঝুঁকিপূর্ণ খেলা পরিচালনা করে আসছে। মানহীন সরঞ্জাম, অদক্ষ অপারেটর এবং পর্যাপ্ত উদ্ধার ব্যবস্থার অভাব সবসময়ই দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।

অনুসন্ধানে জানা যায়, এটি কক্সবাজারে প্রথম কোনো প্রাণহানি নয়। এর আগে ২০২৪ সালেও প্যারাসেইলিং করতে গিয়ে এক পর্যটক প্রাণ হারিয়েছিলেন। গত বছরের ৩০ আগস্ট দরিয়ানগর সৈকতে প্যারাসেইলিংয়ের সময় এক পর্যটক ঝাউগাছের ডগায় দীর্ঘ সময় ঝুলে থাকার রোমহর্ষক ঘটনা ঘটেছিল। ওই সময় প্রশাসন সাময়িকভাবে কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ দিলেও পরবর্তীতে তা আবার চালু হয়। এর আগে একই বছরের ২০ মে বৈরী আবহাওয়ায় নিয়ম ভেঙে একসঙ্গে দুজনকে উড্ডয়ন করায় দুর্ঘটনা ঘটেছিল, যাতে এক পর্যটক দম্পতি সমুদ্রে ছিটকে পড়ে আহত হন। বছরজুড়ে এমন একাধিক দুর্ঘটনা ঘটলেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো স্থায়ী বা কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলেই অভিযোগ স্থানীয় সচেতন মহলের।

প্রশাসনের কঠোর হুঁশিয়ারি ও আইনি প্রক্রিয়া

এই মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় নড়েচড়ে বসেছে স্থানীয় প্রশাসন। কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) তাসনীম জাহান গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, বারবার নিষেধ করার পরও সংশ্লিষ্টরা সেই নির্দেশ অমান্য করেছে এবং চরম ঝুঁকি নিয়ে পর্যটকদের প্যারাসেইলিং করিয়েছে। তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা দিয়েছেন, এ ঘটনায় পূর্ণাঙ্গ তদন্ত সাপেক্ষে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে কক্সবাজারে বারবার প্যারাসেইলিং দুর্ঘটনা ঘটার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ইতোমধ্যে নিহতের সুরতহাল প্রতিবেদন ও অন্যান্য আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে। ময়নাতদন্তের আনুষ্ঠানিকতা শেষে লাশ শোকস্তব্ধ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

এদিকে, ঘটনার পর থেকে অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠান ‘এফ্লাই এয়ার সি স্পোর্টস প্যারাসেইলিং’-এর মালিক মো. ফরিদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানের এমন পলায়নপর আচরণ ও উদাসীনতা জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।

শৌভিক রায়ের এই অকালমৃত্যু আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল যে, প্রমোদভ্রমণের নামে অনিয়ম ও বাণিজ্যিক লোভের কাছে মানুষের জীবন সস্তা হতে পারে না। প্রতিটি জলক্রীড়া ও ঝুঁকিপূর্ণ পর্যটন কার্যক্রমে কঠোর সরকারি নজরদারি, আন্তর্জাতিক মানের লাইফ সেভিং ইক্যুইপমেন্ট ব্যবহার এবং প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায়, আরেকটি তাজা প্রাণ ঝরে পড়ার দায় এড়াতে পারবে না দায়িত্বশীল কোনো পক্ষই। শৌভিকদের এই চলে যাওয়া আমাদের সমাজের প্রতিটি সচেতন নাগরিককে আজ গভীরভাবে নাড়া দিয়ে গেছে। আমরা চাই না কোনো মায়ের কোল আর এভাবে খালি হোক।