বগুড়া ও সিলেটে ৩টি ভয়াবহ সড়ক দুঘর্টনায় ১৮ জন নিহত ও ৩৯ আহত হয়েছেন। আহতদের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়ছে। নিহতদের মধ্যে বগুড়ায় ৭ জন শ্রমিক, ২ জন মোটর বাইকার ও সিলেটে দু’টি যাত্রীবাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত হয়েছে ৯। আহতদের মধ্যে বগুড়ায় ২৬ জন্য এবং সিলেটে ১৩ জন বলে আমাদের বগুড়া ও সিলেট ব্যুরো জানায়।

বগুড়া অফিস : বগুড়া-নওগাঁ আঞ্চলিক মহাসড়কে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে একটি বাসের চাপায় কাজের সন্ধানে আসা ৭জন দিনমজুর নিহত ও কমপক্ষে ২৫জন আহত হয়েছেন। শুক্রবার ভোর সাড়ে পাঁচটার দিকে বগুড়া সদর উপজেলার এরুলিয়া উচ্চবিদ্যালয়ের সামনে কাজের সন্ধানে দাঁড়িয়ে থাকা দিনমজুরদের ওপর যাত্রীবাহী বাসটি উঠে গেলে এ দুর্ঘটনা ঘটে। আহতদের উদ্ধার করে বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। বগুড়া সদর থানার ওসি ইব্রাহিম আলী জানিয়েছেন বাস চাপায় নিহত ৭ জনের পরিচয় পাওয়া গেছে। তারা হলেন , বগুড়া সদর উপজেলার ফাপোঁড় মধ্যপাড়ার বেল্লাল হোসেন (৪০), কাহালু উপজেলার নারহট্ট সরদার পাডার নুর মোহাম্মদ সরদার (৭৫), জয়পুরহাট জেলার কালাই থানার মো. আনারুল ইসলাম (৫৫), জেলার পাঁচবিবি থানার আমিরুল (৪০), গাইবান্ধা জেলার গোবিন্দগঞ্জের আবু সাইদ (৪৫), একই উপজেলার নুর আলম (৪৫) এবং দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলার মো. তাজিমুল (৪৭)।

জানা যায়, রংপুর, গাইবান্ধা, পাবনাসহ বিভিন্ন জেলা থেকে আসা দিনমজুরেরা প্রতিদিন ভোরে এরুলিয়া বাজারের এই শ্রমিকের হাটে কাজের সন্ধানে জড়ো হন। স্থানীয় গৃহস্থরা এখান থেকেই দৈনিক মজুরিতে দিনমজুর সংগ্রহ করেন। শুক্রবার ভোরে ঢাকা থেকে নওগাঁ অভিমুখী শাহ ফতেহ আলী পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী বাস দ্রুতগতিতে যাওয়ার সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা দিনমজুরদের চাপা দিয়ে উল্টে যায়। এতে ঘটনাস্থলেই তিন শ্রমিক নিহত হন। পরে হাসপাতালে নেওয়ার পথে মারা যান আরও ৪ জন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত ২৫ জন। তাদের উদ্ধার করে শজিমেক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। আহতদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা।

স্থানীয়রা জানান, বৃষ্টির মধ্যে বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে প্রথমে একটি খুঁটিতে ধাক্কা দেয়। এরপর গাড়িটি শ্রমিকদের শরীরের ওপর উঠে যায়। দুর্ঘটনার পর ক্ষুব্ধ স্থানীয় বাসিন্দারা মহাসড়ক অবরোধ করেন। এই স্থানে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার কথা উল্লেখ করে তারা স্থায়ী গতিরোধক নির্মাণের দাবি জানান। এসময় ওই সড়কে প্রায় ৪ ঘন্টাগাড়ী চলাচল বন্ধ ছিল। বগুড়া সদর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) ইব্রাহীম আলী জানান, বাসচাপায় ঘটনাস্থলে তিনজন এবং হাসপাতালে চারজন মারা গেছেন। আহতদের উদ্ধার করে দ্রুুত হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও সড়ক সচল করা হয়েছে।

এদিকে, বাসচাপায় সাত দিনমজুর নিহত হওয়ার ঘটনায় অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট মাসুদ হোসেনকে প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বগুড়া জেলা প্রশাসন। কমিটিকে আগামী ৩ কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে নিহতদের পরিবার ও আহতদের চিকিৎসার জন্য আর্থিক সহায়তার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসক তৌফিকুর রহমান সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান। জেলা প্রশাসক তৌফিকুর রহমান বলেন, দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান করে প্রয়োজনীয় সুপারিশ দিতে তদন্ত কমিটিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি আরও জানান, নিহত সাতজনের প্রত্যেক পরিবারের জন্য সরকারি বিধি অনুযায়ী ২৫ হাজার টাকা এবং আহতদের প্রত্যেক পরিবারের জন্য ১৫ হাজার টাকা করে জরুরি আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে। এ ছাড়া আহতদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আহতদের বিনামূল্যে চিকিৎসা ও সরকারি ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় রক্তের ব্যবস্থা করতে স্বেচ্ছায় রক্তদাতাদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান জেলা প্রশাসক।

এদিকে, মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহতের প্রতি শোক ও সমবেদনা জানিয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী বগুড়া মহানগর শাখার আমীর অধ্যক্ষ আবিদুর রহমান সোহেল ও সেক্রেটারি অধ্যাপক আ.স.ম আব্দুল মালেক বিবৃতি দিয়েছেন। বিবৃতিতে নেতৃদ্বয় মরহুমদের রুহের মাগফিরাত কামনা ও শোকাহত পরিবারের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা জ্ঞাপন করেন। তারা আহতদের সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করার জন্য সরকারের প্রতি দাবি জানিয়েছেন।

এদিকে বগুড়া সদর উপজেলার এরুলিয়া এলাকায় প্রাইভেট কার ও মোটরসাইকেলের সংঘর্ষে স্বামী-স্ত্রী নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় তাঁদের আট বছর বয়সি নাতি গুরুতর আহত হয়েছে। শুক্রবার বিকেল সাড়ে চারটার দিকে বগুড়া-নওগাঁ আঞ্চলিক সড়কের এরুলিয়া বিমানবন্দরের সামনে এ দুর্ঘটনা ঘটে।

নিহত ব্যক্তিরা হলেন বগুড়া শহরের আটাপাড়া এলাকার মৃত মোসলেম উদ্দিনের ছেলে ব্যবসায়ী বাবুল হাসান (৫৫) এবং তাঁর স্ত্রী জেসমিন বিবি (৪৭)। দুর্ঘটনায় আহত নাতি জুলকার নাঈন (৮) নিহত বাবুল হাসানের বড় ছেলে রেজাউল করিম রেজার সন্তান।

জানা গেছে, শুক্রবাফ বিকেলে বাবুল হাসান তাঁর স্ত্রী ও নাতিকে নিয়ে মোটরসাইকেলযোগে কাহালু উপজেলায় বড় ছেলের বাসায় একটি দাওয়াত খেতে যাচ্ছিলেন। যাওয়ার পথে এরুলিয়া বিমানবন্দরের সামনে বিপরীত দিক থেকে আসা একটি প্রাইভেট কারের সঙ্গে তাঁদের মোটরসাইকেলটির সংঘর্ষ হয়। এতে ঘটনাস্থলেই বাবুল হাসান মারা যান। স্থানীয় লোকজন ও পুলিশ গুরুতর আহত অবস্থায় জেসমিন বিবিকে ও শিশু জুলকার নাঈনকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠায়। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় জেসমিন বিবি মারা যান। দুর্ঘটনা কবলিত যানবাহন দুটি বর্তমানে পুলিশ হেফাজতে রয়েছে।

স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী মোহাম্মদ মিরাজুল মন্ডল জানান, মোটরসাইকেল চালক তাঁর পরিবারকে বাঁচানোর জন্য গাড়িটি রাস্তার একদম বাঁয়ে নামিয়ে নিয়েছিলেন। কিন্তু বিপরীত দিক থেকে আসা প্রাইভেট কারটি সরাসরি মোটরসাইকেলটিকে আঘাত করে। তিনি অভিযোগ করেন, এই রাস্তায় প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্সবিহীন চালকদের কারণে নিয়মিত দুর্ঘটনা ঘটছে। চালকদের সঠিক প্রশিক্ষণ ও যোগ্যতা যাচাইয়ের পরেই রাস্তায় গাড়ি নামানোর অনুমতি দেওয়া উচিত।

ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বগুড়া সদর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মোস্তাফিজুর রহমান জানান, জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এর মাধ্যমে তথ্য পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। লাশ ময়নাতদন্ত ও সুরতহাল প্রতিবেদনের জন্য শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।

উল্লেখ্য, এর আগে শুক্রবার ভোরে একই সড়কের এরুলিয়া বিমানবন্দর এলাকায় আরেকটি সড়ক দুর্ঘটনায় ৭ জন নিহত হয়েছে। একই স্থানে কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে আবারও প্রাণহানির ঘটনায় স্থানীয়দের মাঝে ক্ষোভ ও শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

সিলেট ব্যুরো : সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের ওসমানীনগরের কাশিকাপন এলাকায় দুই যাত্রীবাহী বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে ৯ জন নিহত এবং অন্তত ১৩ জন আহত হয়েছেন। গতকাল শুক্রবার সকাল ৭টার দিকে এ দুর্ঘটনা ঘটে।

পুলিশ জানায়, সিলেটগামী বেঙ্গল পরিবহনের একটি বাসের সঙ্গে ঢাকাগামী ইউনিক পরিবহনের বাসের সংঘর্ষ হলে ইউনিক পরিবহনের বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়কের পাশের ধানক্ষেতে ছিটকে পড়ে এবং দুমড়ে-মুচড়ে যায়। ঘটনাস্থলেই ৭ জন নিহত হন। পরে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও দু’জনের মৃত্যু হয়।

নিহতদের মধ্যে কিশোরগঞ্জের সাইফুল ইসলাম (৫০), ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আবুল হোসেন (৪৬), কিশোরগঞ্জের সংগীতশিল্পী পেহেলি ভৈরবী (১৯), কুমিল্লার আরমান হোসেন রাহিম (১৯), ঢাকার বিক্রমপুরের জাইফা ইসলাম (৩) ও সিলেট নগরের সপ্তম রায় প্রীতম (২২)-এর পরিচয় নিশ্চিত হয়েছে। অপর তিনজনের পরিচয় শনাক্তে পিবিআই কাজ করছে।

দুর্ঘটনার পর শেরপুর হাইওয়ে পুলিশ, ওসমানীনগর থানা পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস উদ্ধার অভিযান চালিয়ে আহতদের ওসমানী হাসপাতালে ভর্তি করে। নিহতদের লাশ ময়নাতদন্তের জন্য হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। শেরপুর হাইওয়ে থানার ওসি মো. আনিছুর রহমান জানান, এ ঘটনায় আইনগত প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

এদিকে, দুর্ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে একটি বাসকে উচ্চগতিতে চলতে দেখা গেলেও সেটিই দুর্ঘটনার কারণ কি না, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে গর্ত ও খানাখন্দ থাকায় প্রায়ই যানবাহন লেন পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়, যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।