নুরুল আমিন মিন্টু, চট্টগ্রাম ব্যুরো : চট্টগ্রাম বন্দরের জাহাজ থেকে তেল চুরি করে বিক্রি করার ঘটনা অনেক পুরনো। ইঞ্জিন চালক, সুকানি ও জাহাজের মাস্টাররাই এই তেল চুরির সঙ্গে জড়িত। সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজসে বছরের পর বছর ধরে জাহাজ থেকে তেল চুরি করছে তারা। এই তেল তারা নিদির্ষ্ট চোর সিন্ডিকেটের কাছে বিক্রি করে। এতে প্রতি মাসে বন্দরের কোটি কোটি টাকা লোপাট করা হচ্ছে। কিন্তু ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায় জড়িত সেই ইঞ্জিন চালক, সুকানি ও জাহাজের মাস্টাররা। প্রতিদিন বন্দরের জাহাজ থেকে শত শত লিটার জ্বালানি তেল কর্ণফুলী নদীর তেল চোর সিন্ডিকেটের কাছে পাচার হচ্ছে। এতে কারো কোন নজরদারি নেই। জানা যায়, কর্ণফুলী থানা আওয়ামীলীগ নেতা জুলধা ইউনিয়নের আব্দুস শুক্কুর প্রকাশ তেল শুক্কুর এই ব্যবসার অন্যতম নিয়ন্ত্রক। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পরও তিনি এই ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছেন। পতেঙ্গা গুপ্তাখাল ডিপো এলাকাসহ বঙ্গোপসাগরের চোরাই তেলের বড় একটি অংশ নিয়ন্ত্রণ করেন তিনি। সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের ‘ম্যানেজ’ করে নানা কৌশলে তারা লোপাট করছেন সরকারি তেল। তার বিরুদ্ধে নগরী ও জেলার বিভিন্ন থানায় মামলা রয়েছে বলে জানা গেছে।
বন্দর সূত্রে জানা যায়, গত ৫ ডিসেম্বর খণক জাহাজের জন্য মেঘনা অয়েল কোম্পানিতে ৩০ হাজার লিটার জ্বালানি তেলের রিকুইজেশন দেয় চবক কতৃপক্ষ। প্রাথমিক তদন্তে পদ্মা অয়েল এর নাম আসলেও পরবর্তীতে নিশ্চিত হওয়া যায় মেঘনা অয়েল কোম্পানি থেকে ৩০ হাজার লিটার জ্বালানি তেল গ্রহণ করে জাহাজ জরিপ-৯। বন্দর কর্তৃপক্ষের জরিপ-৯ জাহাজ ৫ ডিসেম্বর ৩০ হাজার লিটার জ্বালানি তেল মেঘনা থেকে গ্রহণ করে। খণক জাহাজকে ২২ হাজার লিটার দিয়ে বাকী ৮ হাজার লিটার জ্বালানি তেল গায়েব করে ফেলার অভিযোগ উঠে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, জরিপ-৯ জাহাজের ইঞ্জিন চালক মো. মোখলেছ, জরিপ-১১ জাহাজের ইঞ্জিন চালক বাহার উদ্দিন ও বন্দরের জাহাজ থেকে প্রতিনিয়ত চোরাই তেল বিক্রির মূল হোতা সুকানি কাজী ওয়াহিদুল ইসলামের যোগসাজসে ৮ হাজার লিটার জ্বালানি তেল কর্ণফুলী নদীর তেল চোর সিন্ডিকেটের কাছে বিক্রি করে। এতে নগদ প্রায় সাড়ে ৮ লাখ টাকা পকেটে ভরে তারা। এই ঘটনা জানাজানি হলে বন্দর কর্তৃপক্ষ একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে খনক জাহাজসহ বিভিন্ন জাহাজে কর্মরত অনেকেই বলেন এই বড় ধরনের তেল চুরির ঘটনায় বন্দর জুড়ে তোলপাড় চলছে। তবে টাকার বিনিময়ে সব ধামাচাপা দিয়ে ফেলার আয়োজন প্রায় সম্পন্ন। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি জরিপ-৯ জাহাজ থেকে আবারো ৫ হাজার লিটার জ্বালানি তেল পাচার করে ওহিদুল, মোখলেছ ও বাহার সিন্ডিকেট। এই তেল পাচারের ভিডিও ফুটেজ এই প্রতিবেদকের হাতে আছে। এই বিষয়ে অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে।
জানতে চাইলে জরিপ-৯ এর ইঞ্জিন চালক মো. মোখলেছ ঘটনা স্বীকার করলেও এতে তিনি জড়িত নয় বলে দাবী করে বলেন, জাহাজের মাস্টার, অফিসের কর্মকর্তা বা সিনিয়র হাইড্রোগ্রাফার শোয়েব আখতার ঢালী এ বিষয়ে জানেন।
জাহাজের মাস্টার শাহীনুল কবিরের কাছে জানতে চাইলে তিনি খণক জাহাজের কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা জানেন বলে ফোন বিচ্ছিন্ন করেন। জরিপ-১১ জাহাজের ইঞ্জিন চালক বাহার উদ্দিনকে ফোন করলে তিনি সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে ফোন কেটে দেন। পরে বারবার ফোন করলেও তিনি রিসিভ না করাতে তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
জানতে চাইলে সিনিয়র হাইড্রোগ্রাফার ঢালী মোহাম্মদ শোয়ায়েব নজীর বলেন, খণক জাহাজের দায়িত্বে প্রকৌশলী নাসির। তবে এই বিষয়ে তদন্ত চলছে, এমনটি জানালেও বিস্তারিত জানতে চীফ হাইড্রোগ্রাফার ও সচিবের সাথে কথা বলতে বলেন।
সিনিয়র হাইড্রোগ্রাফার (প্ল্যানিং) প্রকৌশলী নাসির বলেন, খণক জাহাজের ফুয়েল নিয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। সম্ভবত উচ্চ পর্যায়ে তদন্ত করছেন। বন্দর সংশ্লিষ্টরা বলছে বন্দরের এই তেল চোরি বন্ধ করতে পারলে বছরে অন্তত কয়েকশত কোটি টাকা সাশ্রয় হবে বন্দর কর্তৃপক্ষের।