মহিব্বুল আরেফিন, রাজশাহী
জুলাই গণ-আন্দোলনের ইতিহাসে ২০২৪ সালের ২ ও ৩ আগস্ট ছিল রাজশাহীর আন্দোলনের গতিপথ বদলে দেয়ার দুটি দিন। দীর্ঘদিনের দমন-পীড়ন, গণগ্রেপ্তার, হামলা, গুলীবর্ষণ ও শিক্ষার্থীদের ওপর নজরদারির মধ্যেও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি), রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (রুয়েট), রাজশাহী কলেজ, নিউ গভ. ডিগ্রি কলেজ, রাজশাহী সরকারি সিটি কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা নতুন উদ্যমে রাজপথে নেমে আসেন। সেদিন তালাইমারী মোড় থেকে রাবির প্রধান ফটক পর্যন্ত হাজারো শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক ও সাধারণ মানুষ বিক্ষোভ মিছিলে অংশ নেন। পাশাপাশি নগরজুড়ে চলে বিক্ষোভ আর ঝটিকা মিছিল। আর ৩ আগস্ট কেন্দ্রীয় কর্মসূচির সঙ্গে একাত্ম হয়ে রাজশাহীতেও আন্দোলন ‘কোটা সংস্কার’ থেকে সরকারের পদত্যাগের ‘এক দফা’ দাবিতে রূপ নেয়। ফলে ছাত্র আন্দোলন পরিণত হয় সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণে একটি গণআন্দোলনে।
জুলাই মাসের মাঝামাঝি থেকে রাজশাহীতে আন্দোলনকারীদের ওপর একাধিক হামলা, ছাত্রলীগের ধাওয়া, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান, গ্রেপ্তার ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ ওঠে। অনেক শিক্ষার্থী আত্মগোপনে চলে যান, হল ও মেসে চলে তল্লাশি। তবুও আন্দোলনের সমন্বয়কারীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, গোপন বৈঠক এবং বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে ২ আগস্টের কর্মসূচির প্রস্তুতি নেন। পাশাপাশি নগরীর বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও একই প্রস্তুতি চলতে থাকে। আন্দোলনকারীরা জানায়, প্রশাসনিক চাপ ও হামলার আশঙ্কা সত্ত্বেও তারা শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি অব্যাহত রাখেন। এর আগে ৩০ জুলাই সরকার ঘোষিত রাষ্ট্রীয় শোক দিবসকে প্রত্যাখ্যান করে দেশজুড়ে আন্দোলনকারীরা বেছে নেন ভিন্ন এক প্রতীকী ভাষাশোকের কালোর পরিবর্তে লাল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অসংখ্য মানুষ নিজেদের প্রোফাইল ছবি লাল রঙে পরিবর্তন করে নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা ও আন্দোলনকারীদের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেন। এই ঘটনার সাথে রাজশাহীর শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকরা সংহতি প্রকাশ করেন। পাশাপাশি ৩০ জুলাই সকালে ‘নিপীড়ন বিরোধী শিক্ষক’ ব্যানারে প্রতিবাদ র্যালি ও সংহতি সমাবেশ আয়োজন করেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের একাংশ শিক্ষক। সকাল সাড়ে ১১টার দিকে শহীদ বুদ্ধিজীবী চত্বর থেকে শুরু হওয়া র্যালিতে অংশ নেয়া শিক্ষকরা মুখে লাল কাপড় বেঁধে এক কাতারে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদের অনন্য প্রতীক তৈরি করেন। র্যালিটি ক্যাম্পাসের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে রাজশাহী-ঢাকা মহাসড়কে গিয়ে সংহতি সমাবেশে পরিণত হয়। বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকলেও এই কর্মসূচিকে ঘিরে আন্দোলনপন্থী শিক্ষার্থীরা আশপাশে অবস্থান নেন এবং পুরো কর্মসূচির সঙ্গে সমন্বয় বজায় রাখেন।
বৃষ্টি উপেক্ষা করে সমাবেশ: ৩ আগস্ট সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রুয়েট সংলগ্ন তালাইমারী মোড়ে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের হাজারো শিক্ষার্থী জড়ো হতে শুরু করেন। প্রবল বৃষ্টি উপেক্ষা করে তারা মিছিল নিয়ে ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়কে অবস্থান নেন। পরে বিক্ষোভ মিছিল তালাইমারী থেকে ভদ্রা হয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের দিকে অগ্রসর হয়। এতে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক, আইনজীবী, চিকিৎসক, ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ যুক্ত হন। অংশগ্রহণকারীদের সংখ্যা প্রায় দুই হাজারে পৌঁছায় বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে উল্লেখ করা হয়।
স্লোগানে বদলে যায় আন্দোলনের ভাষা: রাজশাহীর রাজপথে সেদিন কেবল কোটা সংস্কারের দাবি শোনা যায়নি। আন্দোলনকারীরা স্লোগান দেন ‘খুনের বিচার চাই’, ‘গণগ্রেপ্তার বন্ধ কর’, ‘স্বৈরাচারের পতন চাই’, ‘এক দফা, এক দাবি সরকার তুই কবে যাবি’ ‘এই মুহুর্তে দরকার সরকারের পদত্যাগ’। শিক্ষার্থীরা বলেন, জুলাই জুড়ে সারাদেশে সংঘটিত প্রাণহানি, হামলা ও নির্যাতনের পর আন্দোলনের লক্ষ্য পরিবর্তিত হয়েছে। কেন্দ্রীয় ঘোষণার সঙ্গে মিল রেখে তারা সরকারের পদত্যাগকেই একমাত্র দাবি হিসেবে ঘোষণা করেন।
শিক্ষক-অভিভাবকদের সংহতি: রাজশাহীর আন্দোলনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল শিক্ষক ও সাধারণ মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ। বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষক মিছিলে যোগ দেন। অনেক অভিভাবক সন্তানদের সঙ্গে নিয়ে রাজপথে নামেন। নগরীর বিভিন্ন এলাকা থেকে সাধারণ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে মিছিলে যুক্ত হওয়ায় আন্দোলন নতুন মাত্রা পায়। এতে আন্দোলন আর কেবল শিক্ষার্থীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং তা গণআন্দোলনের রূপ নেয়।
কেন্দ্রীয় ঘোষণার প্রতিধ্বনি: একই দিন ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কারীরা সরকারের পদত্যাগের এক দফা ঘোষণা করেন এবং ৪ আগস্ট থেকে সর্বাত্মক অসহযোগ কর্মসূচির ডাক দেন। সেই ঘোষণার প্রতিফলন রাজশাহীর কর্মসূচিতেও স্পষ্টভাবে দেখা যায়। আন্দোলনকারীরা ঘোষণা দেন, ছাত্র হত্যার বিচার এবং সরকারের পদত্যাগ ছাড়া তারা রাজপথ ছাড়বেন না।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ২ ও ৩ আগস্টের কর্মসূচি রাজশাহীতে জুলাই আন্দোলনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাঁকগুলোর একটি। এ দুই দিনে শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের সম্মিলিত অবস্থান আন্দোলনকে নতুন গতি দেয়। পরদিন অসহযোগ আন্দোলন এবং ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের জন্য রাজশাহীর এই বিক্ষোভ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সারাদেশের মতো রাজশাহীতেও আন্দোলন আর কেবল শিক্ষার্থীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; এটি পরিণত হয়েছিল একটি সর্বজনীন গণআন্দোলনে।