নুরুল আমিন মিন্টু, চট্টগ্রাম ব্যুরো : চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দীদের নিয়ে একটি সুপরিকল্পিত অবৈধ ব্যবসা চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। কারারক্ষী, ঠিকাদার ও কিছু অসাধু কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে এই দুর্নীতির জাল। বন্দীদের জামিন, স্বজন সাক্ষাৎ, মাদক পাচার থেকে শুরু করে ক্যান্টিনের লভ্যাংশ বণ্টন-সবখানেই চলছে অবৈধ অর্থ লেনদেন ও আত্মসাৎ। যমুনা ৮ ব্লকে আওয়ামী লীগ নেতাদের দেওয়া হচ্ছে অবৈধ ভিআইপি সুবিধা!
অবৈধ মোবাইল ও মাদক পাচার : জানা গেছে, কারাভ্যন্তরে মোবাইল ফোন ও নেশাজাত দ্রব্য পাচার করা হচ্ছে ঠিকাদার ও কিছু কারা কর্মকর্তাদের সহযোগিতায়। এটি এখন ওপেন সিক্রেট।
মোবাইল পাচার : সবজি, মাছ-মাংস বোঝাই গাড়ির মধ্যে লুকিয়ে কারাভ্যন্তরে মোবাইল ফোন ঢোকানো হয়। এসব মোবাইল ব্যবহার করে বন্দীরা কারাগার থেকে বাইরে চাঁদাবাজি, খুনের হুমকিসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে সংশ্লিষ্ট সূত্রে প্রকাশ।
মাদক ব্যবসা : শিশির নামের এক বন্দী চট্টগ্রাম কারাগারের ভেতর ইয়াবা ও গাঁজার বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। গেট ইনচার্জ ও কিছু কারারক্ষী এই পাচারে গোপনে সহায়তা করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
জেলারের দুর্নীতি : কারাগারের বর্তমান জেলার মো. মাসুদুর রহমান ও জেল সুপার ইকবাল হোসেন কয়েক কোটি টাকা ঘুস দিয়ে এই পোস্টে বদলি হয়ে এসেছেন বলে কারাগারের অভ্যন্তরে লোকমুখে শোনা যায়। সে কারণে অতীতের যে কোন সময়ের তুলনায় কারা অভ্যন্তরে অনিয়ম ও দুর্নীতি সবচেয়ে বেশি।
জামিন ও সাক্ষাতের বাণিজ্য : অভিযোগ উঠেছে এখন স্বজন সাক্ষাতের জন্য ৫ হাজার-৭ হাজার টাকা নেয়া হচ্ছে। সে সাথে জামিনের পর নতুন মামলায় গ্রেফতার এড়ানোর নামে বন্দীদের কাছ থেকে লাখ টাকা নেয়া হচ্ছে হাতিয়ে। ধনী বন্দীদের টার্গেট করে জামিনের পর নতুন মামলায় গ্রেফতারের ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করা হচ্ছে। ফটিকছড়ির এক বন্দীর কাছ থেকে ৭০ হাজার টাকা নেয়া হয়েছে। পটিয়ার সাবেক সাংসদ শামসুল হকের সহকারী এজাজের কাছ থেকে ২ লাখ টাকা নেয়া হয়েছে।
রাজনৈতিক যোগসাজশ : ফটিকছড়ি উপজেলা কথিত যুবলীগ নেতা কামাল হোসেন (বালু কামাল) কারাগার কর্তৃপক্ষের সঙ্গে মিলে টাকার বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছেন বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বন্দীদের সূত্রে জানা গেছে। বিশেষ সুবিধা দিয়ে কারাগারের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ কতিপয় বন্দীর কাছ থেকে স্বর্ণের গহনাও উপহার নেন বলে প্রচারিত রয়েছে। ডেপুটি জেলার জনৈক নওশাদ মিয়ার ঘুস বাণিজ্য মানুষের মুখে মুখে।
ক্যান্টিনের দুর্নীতি : কারাগারের ক্যান্টিন থেকে মাসে প্রায় ২ কোটি টাকা আয় হয়, যার বড় অংশই দুর্নীতির মাধ্যমে ভাগ বাটোয়ারা করা হয়। ডিআইজি (প্রিজন্স) টিপু সুলতান, জেলার মাসুদুর রহমান ও সিনিয়র জেল সুপার ইকবাল হোসেন, কারারক্ষী ও কতিপয় সাংবাদিক প্রতিমাসে বেতনের চেয়ে বেশি টাকা ভাগ পান।
যমুনা ৮ ব্লকে অবৈধ ভিআইপি সুবিধা! : কারাগারের 'যমুনা ৮' ব্লকটি কিছু অসাধু কারারক্ষীর সহযোগিতায় ভিআইপি বন্দীদের জন্য বিশেষ আরাম-আয়েশের স্থানে পরিণত হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সূত্রে জানা গেছে, এই ব্লকটি বর্তমানে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের দ্বারা বিশেষভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। সেখানে রাঙ্গুনিয়া উপজেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক ইউনুস, রাঙ্গুনিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন চৌধুরী মিল্টন, ফটিকছড়ি উপজেলার দুই ইউনিয়ন চেয়ারম্যান, পটিয়া উপজেলার কয়েকজন চেয়ারম্যান 'যমুনা ৮' ব্লকে অবৈধ ভিআইপি সুবিধা নিচ্ছেন। সূত্রে অভিযোগ করা হয়েছে, এই বন্দীরা কারারক্ষীদের সহযোগিতায় সাধারণ কারাবাসীদের থেকে আলাদা ও উন্নত সুবিধা ভোগ করছেন। যমুনা ৮ ব্লকটি তাদের জন্য বিশেষভাবে সাজানো হয়েছে বলে জানা গেছে। এসব বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার ইকবাল হোসেন এসব অভিযোগ অস্বীকার বলেন, কারাগারে কোনো প্রকার মাদকদ্রব্য ব্যবহার হয় না। মোবাইল ব্যবহার করে না কোনো বন্দী। ক্যান্টিন পরিচালনা কোনো দুর্নীতি হয়নি বলে তিনি দাবি করেন। জেলার ও সিনিয়র সুপার দুইজনই বিপুল অংকের ঘুসের মাধ্যমে চট্টগ্রামে বদলী হয়েছেন-এমন প্রশ্নে জবাবে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন ইকবাল হোসেন।