- ট্রাইব্যুনালে শ্রমিক দল নেতার জবানবন্দী
- জুলাই অভ্যুত্থান দমনে ব্যবহৃত হয় ৩ লাখের বেশি গুলী
পল্লবী থানা শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদক মো. আল আমিন হোসেন ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দী দিতে এসে বলেছেন, নিজের চোখের সামনেই সিয়ামের চোখে এসে লাগে পুলিশের ছোড়া একটি গুলী। মাথার পেছন দিয়ে বেরিয়ে আসা সেই গুলী আঘাত করে মাথায়ও। গুলীবিদ্ধ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন তিনি। হারিয়ে ফেলেন জ্ঞান। তবে হুঁশ ফিরতেই দেখেন তার টি-শার্টে লেগে আছে সিয়ামের মগজ ও রক্ত।
গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর সদস্য বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরীর একক বেঞ্চে দেওয়া জবানবন্দীতে ভয়াবহ সেই বর্ণনা দেন আল আমিন।
চব্বিশের জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থান চলাকালে কারফিউ দিয়ে গণহত্যায় উসকানিসহ মানবতাবিরোধী অপরাধে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান ও সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের মামলায় ১১ নম্বর সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দী দেন শ্রমিক দলের এই নেতা।
বর্তমানে গার্মেন্টস ব্যবসার পাশাপাশি রাজধানীর পল্লবী থানা শাখা শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন আল আমিন। ২০২৪ সালে একই শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন তিনি।
সাক্ষ্যে আল আমিন বলেন, ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত আমরা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অংশ নিই। এরই ধারাবাহিকতায় ১৮ জুলাই মিরপুর-১০ নম্বর এলাকায় পপুলার ডায়াগনস্টিক হাসপাতালের সামনে আমরা আন্দোলনে যোগ দেই। রাত ১০টার পর আমাদের ওপর গুলী ছোড়েন আট-দশজন পুলিশ সদস্য। তাদের মাঝখানে তিন-চারজন সাদা পোশাকধারী লোককেও ঢুকতে দেখি। পুলিশের ছোড়া একটি গুলী আন্দোলনরত রাব্বানী হোটেলের কর্মচারী সিয়াম সর্দারের বাঁ চোখে বিদ্ধ হয়। গুলীটি তার মাথার পেছন থেকে বেরিয়ে আমার মাথার সামনে এসে লাগে। এতে আমার মাথায় ক্ষত হলে মাটিতে পড়ে যাই।
সাক্ষী বলেন, এ অবস্থা দেখে আশপাশের লোকজন এসে আমাকে মাটি থেকে উঠিয়ে পানি ঢালেন। একপর্যায়ে জ্ঞান ফিরলে দেখি সিয়ামের মাথার মগজ ও রক্ত আমার টি-শার্টে লেগে আছে। তখন লোকজন মিলে সিয়ামকে সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে পাঠালে চিকিৎসকরা মৃত ঘোষণা করেন। তার মৃত্যুর খবরে আন্দোলন আরও জোরালো হয়। এমনকি ওই দিন সারারাত আমরা মিরপুর ১০ নম্বরে অবস্থান নেই। তবে আমার মাথার ক্ষত ততটা মারাত্মক ছিল না।
জবানবন্দীতে আরও উল্লেখ করা হয়, ১৯ জুলাই সকাল থেকে পুনরায় আন্দোলনে অংশ নেন আল আমিনরা। তাদের সঙ্গে সাধারণ ছাত্র-জনতাও যোগ দেন। আন্দোলনের একপর্যায়ে জুটপট্টির আসিফ, পারভেজ, রুবেলসহ আরও অনেকেই শহীদ হয়েছেন বলে তাদের কাছে খবর আসে। এরপরও তারা জোরালোভাবে আন্দোলন করতে থাকেন।
শ্রমিক দল নেতা ট্রাইব্যুনালে বলেন, ১৯ জুলাই ছাত্রলীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবকলীগ ও শ্রমিকলীগের নেতাকর্মীরা একটি হোন্ডা মিছিল করেন। তখন ওই মিছিল থেকে ছাত্র-জনতার উদ্দেশে গুলী ছোড়েন তারা। এতে অনেকেই গুলীবিদ্ধ হন। এরপর আমাদের পরিবারের ওপর বিভিন্ন রকমের হুমকি আসতে থাকে। এ ছাড়া, আন্দোলন দমনে শ্রমিক লীগ নেতা জিন্নাত আলীসহ আওয়ামী লীগের অনেকেই মিরপুর-১০ নম্বরে অবস্থিত বায়তুল মামুর মসজিদে বসে ষড়যন্ত্র করেন।
তিনি বলেন, ৫ আগস্টের পর বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটা কল রেকর্ড প্রকাশিত হয়। ওই কল রেকর্ডে সালমান এফ রহমান ও আনিসুল হকের কথোপকথন শুনতে পাই। কারফিউ জারি করে আন্দোলনকারীদের শেষ করে দেওয়ার কথা বলেন তারা। এ ঘটনার জন্য আমি শেখ হাসিনা, ওবায়দুল কাদের, সালমান এফ রহমান, আনিসুল হকসহ আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের দায়ী করি। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত ছিলেন।
জবানবন্দী শেষে আল আমিনকে জেরা করেন আনিসুল হক ও সালমান এফ রহমানের আইনজীবী পলাশ চন্দ্র রায়।
ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম ও সহিদুল ইসলাম সরদার। এ সময় প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম, মার্জিনা রায়হান ও সুলতান মাহমুদ উপস্থিত ছিলেন।
এদিন সকালে এ মামলার দুই আসামী সালমান ও আনিসুলকে কারাগার থেকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য আগামী ২৫ আগস্ট দিন নির্ধারণ করেন ট্রাইব্যুনাল।
ক্রসফায়ারে ছাত্রদল নেতাসহ ২ হত্যা : ট্রাইব্যুনালে দুই থানার ওসির সাক্ষ্য
বরিশালের আগৈলঝাড়ায় ক্রসফায়ারে ছাত্রদল নেতাসহ দুইজনকে হত্যার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক এমপি আবুল হাসানাত আবদুল্লাহসহ চার আসামীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছেন পুলিশের দুই কর্মকর্তা। পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য আগামী ১৬ আগস্ট দিন ধার্য করেছেন ট্রাইব্যুনাল।
মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীরের একক বেঞ্চ এ দিন ধার্য করেন।
এদিন ট্রাইব্যুনালে মামলার ৯ ও ১০ নম্বর সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দী দেন যথাক্রমে উজিরপুর মডেল থানার বর্তমান ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রকিবুল ইসলাম এবং আগৈলঝাড়া থানার ওসি মাসুদ খান। দুইজনই জব্দ তালিকার সাক্ষী ছিলেন।
জবানবন্দীতে এ মামলার বিভিন্ন আলামত কখন, কোথায় থেকে জব্দ করেছিলেন, তা তুলে ধরেন পুলিশের এই দুই কর্মকর্তা। পাশাপাশি মামলাসংশ্লিষ্ট সাধারণ ডায়েরি (জিডি) কখন করা হয়েছিল, তাও উল্লেখ করেন।
সাক্ষ্য শেষে তাদের জেরা করেন গ্রেপ্তার দুই আসামীর আইনজীবী আবুল হাসান ও স্টেট ডিফেন্স আইনজীবী মো. আমির হোসেন। জেরা সম্পন্ন হলে পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য ১৬ আগস্ট দিন ঠিক করেন আদালত।
ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর ফারুক আহাম্মদ। এ সময় প্রসিকিউটর আবদুস সোবহান তরফদার, জহিরুল আমিন, তারেক আবদুল্লাহসহ অন্য প্রসিকিউটররা উপস্থিত ছিলেন।
এ মামলায় গ্রেপ্তার আছেন উজিরপুর থানার সাবেক এএসআই মো. মাহাবুল ইসলাম ও এএসআই জসিম উদ্দিন। তাদের গতকাল ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। সাবেক এমপি আবুল হাসানাত ছাড়া অন্য আসামী বরিশালের সাবেক পুলিশ সুপার (এসপি) একেএম এহসান উল্লাহ পলাতক রয়েছেন।
হত্যাকাণ্ডের শিকার দুইজন হলেনÑ আগৈলঝাড়া উপজেলা জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক টিপু হাওলাদার ও উপজেলা জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থার সাংগঠনিক সম্পাদক কবির মোল্লা।
এর আগে, ২০ মে চার আসামীর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল-২।
প্রসিকিউশনের অভিযোগে বলা হয়েছে, টিপু ও কবির ছিলেন আবুল হাসানাতের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী। এজন্য রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করে তাদের দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্র ও পরিকল্পনা করেন তিনি। এ কাজ বাস্তবায়ন করতে তৎকালীন এসপি একেএম এহসান উল্লাহকে নির্দেশ দেওয়া হয়। এরপর মিথ্যা মামলায় ২০১৫ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি দুইজনকে গ্রেপ্তার করে উজিরপুর থানা পুলিশ। এরপর মাহাবুল ও জসিমকে দিয়ে গৌরনদী-গোপালগঞ্জ হাইওয়ের আগৈলঝাড়া বাইপাস সড়কের পাশে টিপু ও কবিরকে ক্রসফায়ারের নাটক সাজিয়ে হত্যা করা হয়।
জুলাই অভ্যুত্থান দমনে ব্যবহৃত হয় ৩ লাখের বেশি গুলী : চব্বিশের জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থান দমনে ছাত্র-জনতার ওপর নির্বিচারে গুলী চালানো হয়েছিল বলে দাবি করেছে প্রসিকিউশন। এর মধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীই ব্যবহার করেছে তিন লাখের বেশি গুলী।
গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেলে এ তথ্য তুলে ধরা হয়। প্যানেলের অপর সদস্যরা হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
এদিন জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ শীর্ষ ৭ নেতার বিরুদ্ধে পঞ্চম দিনের মতো প্রসিকিউশনের যুক্তিতর্ক সম্পন্ন হয়।
ট্রাইব্যুনালে যুক্তি উপস্থাপন করেন প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম। এ সময় চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম, প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম, আবদুস সোবহান তরফদার, ফারুক আহাম্মদ, সহিদুল ইসলাম সরদার, শাইখ মাহদী, মঈনুল করিমসহ অন্যান্য প্রসিকিউটর উপস্থিত ছিলেন।
যুক্তিতর্কে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট আন্দোলন দমনে চায়না রাইফেল, পিস্তল, শটগান থেকে শুরু করে হেলিকপ্টার ব্যবহারের মাধ্যমে আন্দোলনকারীদের ওপর গুলী ছোড়ার বিবরণ দেন প্রসিকিউটর তামিম।
তিনি জানান, বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করেছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। এর মধ্যে রয়েছে চায়না রাইফেল, ৭ দশমিক ৬২ মিমি রাইফেল, পিস্তল, এলএমজি, এসএমজি, শটগান, রিভলভারসহ অন্যান্য অস্ত্র। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী জুলাই-আগস্ট আন্দোলন ঘিরে মোট ৩ লাখ ৫ হাজার ৩১১ রাউন্ড গুলী খরচ করা হয়েছিল। শুধু ঢাকায় খরচ হয়েছে ৯৫ হাজার ৩১৩ রাউন্ড। এছাড়া দেশের ৪১ জেলার ৪৩৮ স্থানে ঘটেছে হত্যাকাণ্ড। ৫০-এরও বেশি জেলায় ব্যবহৃত হয়েছে মারণাস্ত্র।
আন্দোলনকারীদের ওপর হেলিকপ্টার থেকেও গুলী ছোড়ার কথা তুলে ধরে প্রসিকিউশন। ড্রোন ব্যবহার করে আন্দোলনকারীদের শনাক্তের পর হেলিকপ্টারের মাধ্যমে গুলী ছোড়া হয়েছে বলে জানান প্রসিকিউটর তামিম।