• ১১টি সরকারি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদ
  • ১১ সিটি কর্পোরেশন ও ৫৬ জেলা পরিষদে প্রশাসক পদ
  • ৮ নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের ৭ জনই দলীয় লোক

বিগত দিনে আন্দোলন সংগ্রামে বিএনপির জন্য ত্যাগ স্বীকার করা দলীয় পদধারী অনেক নেতাকর্মীকে মুল্যায়নের অংশ হিসেবে সরকারি পদে বসিয়েছে বিএনপি। বিশেষ করে গেলো জাতীয় নির্বাচনে যাদের মনোনয়ন দিতে পারেনি তাদের এক্ষেত্রে বেশি অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে।

এরই অংশ হিসেবে দেশের ১১টি সরকারি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে দলীয় পদধারী এবং নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিব পদে বিএনপি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়েছে বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকার। গত ২৩ জুলাই জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের চুক্তি ও বৈদেশিক নিয়োগ শাখার উপসচিব মো. গোলাম রব্বানী সই করা পৃথক ১২টি প্রজ্ঞাপনে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়া হয়। এর আগে ১১টি সিটি কপোরেশন ও ৫৬টি জেলা পরিষদে প্রশাসক পদে নিয়োগ পায় বিএনপির পদধারীরা।

সরকারি প্রতিষ্ঠানে দলীয় পদধারীদের নিয়োগ নিয়ে নানা প্রশ্ন, বিতর্ক ও সমালোচনা তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রশাসনে দলীয়করণের ঝুঁকি তৈরি করায় এ ধরনের নিয়োগ ‘উদ্বেগজনক’। এ রকম সিদ্ধান্ত সরকারি দল বিএনপির জন্য ‘আত্মঘাতী’ হতে পারে, এমন আশঙ্কার কথাও বলেছেন তারা। সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮-এর ৪৯ ধারা সরকারকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের ক্ষমতা দিয়েছে। তাই এ নিয়োগগুলোকে বেআইনি বলার সুযোগ নেই। তবে এ নিয়োগ প্রক্রিয়া বিএনপি’র ৩১ দফার ৮ম ধাপের পরিপন্থি বলে জানা গেছে।

বিএনপি’র ৩১ দফার ৮ম দফায় লেখা আছে : ‘সংকীর্ণ রাজনৈতিক দলীয়করণের ঊর্ধ্বে উঠিয়া সকল রাষ্ট্রীয়, সাংবিধানিক ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে এসব প্রতিষ্ঠান আইনি সংস্কারের মাধ্যমে পুনর্গঠন করা হবে। শুনানির মাধ্যমে সংসদীয় কমিটির ভেটিং সাপেক্ষে এসব প্রতিষ্ঠানের সাংবিধানিক ও গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেওয়া হবে।’ আর বিএনপি ক্ষমতায় এসে নিজেই এই ৩১ দফার ৮ম দফা লঙ্ঘন করে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ নিয়ে তৈরি হয়েছে সমালোচনা। সংসদের বিরোধী দল ও অন্যন্য রাজনৈতিক দলের নেতারা এধরনের নিয়োগ প্রক্রিয়ার কঠোর সমালোচনা করেছেন।

সরকারি প্রতিষ্ঠান ও নির্বাচন কমিশনে নিয়োগ পেলেন যারা:

গত ২৩ জুলাই সরকারি বিভিন্ন সংস্থা, দফতর ও করপোরেশনে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বিএনপির ১২ জন। এরা হলেন বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালকের দায়িত্বপ্রাপ্ত হন জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের কেন্দ্রীয় কমিটির কার্যকরী সভাপতি সালাহ্উদ্দিন সরকার, বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেডের (বোয়েসেল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদের বিএনপির আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক মোহাম্মদ রাশেদুল হক, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশনের (বিআইডব্লিউটিসি) চেয়ারম্যান পদে দায়িত্বপ্রাপ্ত দলের সহ-ধর্মবিষয়ক সম্পাদক এটিএম আবদুল বারী ড্যানী, বাংলাদেশ জাতীয় সমাজকল্যাণ পরিষদের নির্বাহী সচিব পদে দায়িত্বপ্রাপ্ত যুবদলের সাবেক কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি (দফতর সম্পাদকের দায়িত্বপ্রাপ্ত) মো. কামরুজ্জামান দুলাল।

বাংলাদেশ ইস্পাত ও প্রকৌশল করপোরেশনের চেয়ারম্যান পদে দায়িত্বপ্রাপ্ত দলের রংপুর বিভাগীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক আবদুল খালেক, বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্যশিল্প করপোরেশনের চেয়ারম্যান পদের জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য শামসুজ্জামান সুরুজ, বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে বিএনপির সহ-বন ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক কাজী রওনাকুল ইসলাম টিপু, বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের চেয়ারম্যান পদে যুবদলের সাবেক কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি জাকির হোসেন সিদ্দিকী, বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) চেয়ারম্যান পদের দলের ঢাকা বিভাগীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক বেনজীর আহমেদ, বাংলাদেশ জুট করপোরেশনের চেয়ারম্যান পদে দায়িত্বপ্রাপ্ত দলের জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মামুন হাসান । এছাড়া নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিব পদে চুক্তিভিত্তিক দায়িত্ব পেয়েছেন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপির সংসদীয় আসন পুনর্বিন্যাস কমিটির সদস্য মো. শামসুল আলম।

১১ সিটি কর্পোরেশনে প্রশাসক পদে দলীয় লোক:

গত ২৩ ফেব্রুয়ারি ও ১৪মার্চ ২ দফায় ১১টি সিটি কপোরেশনে দলীয় পদধারীদের নিয়োগ দেয়া হয়েছে। দেখা গেছে ১১ সিটি করপোরেশনেও। সিটি করপোরেশনগুলোতে যাঁরা প্রশাসক হয়েছেন, তাঁদের মধ্যে কেউ সংসদ নির্বাচনে পরাজিত, অনেকে আবার দলীয় মনোনয়নবঞ্চিত।

১৪ মার্চের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, বরিশাল সিটি করপোরেশনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক (বরিশাল বিভাগ) বিলকিস আক্তার জাহান শিরীনকে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। রাজশাহী সিটি করপোরেশনে (রাজশাহী মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক) মাহফুজুর রহমান, ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনে (ময়মনসিংহ দক্ষিণ জেলা বিএনপির সদস্যসচিব) রুকুনোজ্জামান রোকন, রংপুর সিটি করপোরেশনে (রংপুর মহানগর বিএনপির সদস্যসচিব) মাহফুজ উন নবী চৌধুরী এবং কুমিল্লা সিটি করপোরেশনে (কুমিল্লা মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক) মো. ইউসুফ মোল্লা প্রশাসক পদে নিয়োগ পেয়েছেন।

তার আগে গত ২৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনসহ ছয় সিটিতে প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছে সরকার। এর মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে দায়িত্ব পাওয়া বিএনপি নেতা মো. আব্দুস সালাম সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন পাননি। আর উত্তর সিটিতে দায়িত্ব পাওয়া মো. শফিকুল ইসলাম খান ঢাকা-১৫ আসনে নির্বাচন করে হেরে যান। খুলনা সিটিতে প্রশাসকের দায়িত্ব পাওয়া নজরুল ইসলাম মঞ্জু খুলনা-২ আসনে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন। তিনি জামায়াতের প্রার্থীর কাছে হেরে যান। সিলেট সিটিতে দায়িত্ব পাওয়া আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী ও নারায়ণগঞ্জ সিটির মো. সাখাওয়াত হোসেন খান দলীয় মনোনয়নবঞ্চিত। গাজীপুর সিটি করপোরেশনে প্রশাসকের দায়িত্ব পাওয়া মো. শওকত হোসেন সরকার ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে গাজীপুরে একটি সংসদীয় আসন বৃদ্ধির ফলে গাজীপুর-২ আসনে সংসদ সদস্য প্রার্থী ছিলেন। পরে উচ্চ আদালত আসন বৃদ্ধির বিষয়টি অবৈধ ঘোষণা করায় তিনি আর প্রার্থী হতে পারেননি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের সাবেক অধ্যাপক সালাহউদ্দিন এম আমিনুজ্জামান মনে করেন , দলীয় ব্যক্তিদের প্রশাসক নিয়োগের মাধ্যমে স্থানীয় সরকারকে নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি দলীয় লোকদের সামনে নিয়ে আসা হচ্ছে। যাঁদের দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে, তাঁদের অনেকের এ কাজে অভিজ্ঞতা নেই। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বিশেষ পরিস্থিতি ছিল। এখন তো নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায়। এ সময় নির্বাচনের উদ্যোগ না নিয়ে প্রশাসক নিয়োগের মাধ্যমে এক ধরনের ব্যত্যয় হলো। তিনি মনে করেন, স্থানীয় সরকারে প্রশাসক না দিয়ে নির্বাচনের উদ্যোগ নিলে ভালো হতো।

নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রশাসক পদে থেকেই নির্বাচনের প্রস্তুতির বিষয়টিকে অনেকটা একপেশে রাজনৈতিক সুবিধা হিসেবে দেখছেন নির্বাচন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির জনপরিচিতি দ্রুত বাড়ে। সরকার ও প্রশাসনিক সুযোগ-সুবিধা কাজে লাগিয়ে তিনি প্রতিদিন নাগরিকদের কাছে যাওয়ার সুযোগ পান, যা অন্য সম্ভাব্য প্রার্থীদের থাকে না। এতে প্রশাসকরা স্বাভাবিকভাবেই রাজনৈতিকভাবে বাড়তি সুবিধা পান। অন্য সম্ভাব্য প্রার্থীরা এই সুযোগটি পান না। তারা অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়েন। ফলে নির্বাচনকে ঘিরে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ নিশ্চিত করার বিতর্ক আবারও সামনে আসবে। এ কারণেই বিশ্বের অনেক দেশেই প্রশাসনিক দায়িত্ব ও নির্বাচনি কার্যক্রমের মধ্যে স্পষ্ট বিভাজন রাখা হয়। আমাদের এখানেও তা রয়েছে, তবে নির্বাচনের মাত্র কয়েকদিন আগে থেকে।

সিটি করপোরেশন নির্বাচনে প্রশাসকরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলে ‘অবশ্যই এর নেতিবাচক’ প্রভাব নির্বাচনে পড়বে বলে মনে করেন নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ও সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার। তিনি বলেন, এ ক্ষেত্রে নির্বাচনি মাঠ সবার জন্য সমান হবে না। সেই উদ্দেশ্যেই বিএনপির নেতাদের প্রশাসক করা হয়েছে। বিএনপি আগে বলেছে, প্রশাসক পদে দলীয় কাউকে বসানো হবে না। বাস্তবে দলটি পছন্দের নেতাদের দায়িত্ব দিয়েছে, যা সংবিধানের ৫৯ অনুচ্ছেদের পরিপন্থী।

বদিউল আলম মজুমদার অভিযোগ করেন, এই প্রশাসকরাই যদি নির্বাচন করেন, তাহলে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারেন। এর ফলে অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, বর্তমান আইনে প্রশাসকদের জন্য আগে যে এক বছরের অযোগ্যতার বিধান ছিল, তা বাতিল করা হয়েছে। ফলে তারা চাইলে নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন। তবে মনোনয়নপত্র দাখিলের আগে অবশ্যই প্রশাসকের পদ থেকে পদত্যাগ করতে হবে অথবা অব্যাহতি নিতে হবে। সংশোধিত আইনে বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে।

নির্বাচন কমিশনে নিয়োগ পাওয়া কে এই শামসুল আলম?

নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিব পদে নিয়োগ পাওয়া মো. শামসুল আলম চাকরি জীবনে একই প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন পরিচালনা শাখার কর্মকর্তা ছিলেন। ২০১৭ সালে অবসরে যাওয়ার পর বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় হন। ওই বছরের ৩১ ডিসেম্বর তাকে গ্রেফতার করেছিল তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। ২০২৫ সালের আগস্টে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খানের নেতৃত্বে দলীয় আসন পুনর্বিন্যাস কমিটিরও সদস্য ছিলেন শামসুল আলম। চাকরি থেকে অবসরের ৮ বছর পর গত ২৩ জুলাই নির্বাচন কমিশনের অতিরিক্ত সচিব হিসেবে তাকে নিয়োগ দেয় সরকার।

কেন বিতর্ক?

নির্বাচন কমিশনের অতিরিক্ত সচিব হিসেবে মো. শামসুল আলমের নিয়োগের পরপরই এ নিয়ে তুমুল আলোচনা শুরু হয়েছে। কারণ বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি বিএনপির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। সে কারণে একটি নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ দেওয়ায় অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন। বিশেষ করে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এর নেতিবাচক প্রভাব পরে কিনা, সে আশঙ্কাও করছেন তারা।

বিরোধী দলের কড়া প্রতিবাদ :

নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে বিএনপির সঙ্গে সম্পৃক্ত অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে নিয়োগ দেওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। তার নিয়োগ বাতিলের দাবি জানিয়ে গত ২৬ জুলাই গণমাধ্যমে বিবৃতি দেন দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি অভিযোগ করে বলেন, যিনি এত দিন বিএনপির এজেন্ডা বাস্তবায়নে সোচ্চার ছিলেন, তার অধীনে কোনও নিরপেক্ষ নির্বাচন হতে পারে না।’

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব বলেন,‘সরকার সব প্রতিষ্ঠানকে দলীয়করণ করার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে। একটি নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান হিসেবে নির্বাচন কমিশনকেও রেহাই দেওয়া হয়নি। তারা এমনটি করতে থাকলে জনগণ নিশ্চয়ই বসে থাকবে না। তিনি অবিলম্বে এ নিয়োগ বাতিলের দাবি জানান।

৫৬ জেলা পরিষদে প্রশাসক পদে দলীয় লোক :

গত ১৫ ৩১ মার্চ দুই দফায় ৫৬ জেলা পরিষদের প্রশাসক পদে দলীয় পদধারীদের নিয়োগ দেয়া হয়েছে। ১৫ মার্চ এক প্রজ্ঞাপনে দেশের ৪২টি জেলা পরিষদে ৩১ মার্চ আরও ১৪ জেলা পরিষদে নতুন প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছে সরকার। নিয়োগ প্রাপ্ত এসব প্রশাসকগন জেলা পর্যায়ের বিএনপির দলীয় পদধারী।

বিএনপির সূত্রগুলো জানিয়েছে, বিগত সরকারের সময়ে আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ভূমিকা রাখা এসব নেতাদের অনেকেই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলের মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন। কেউ মনোনয়ন পাননি, কাউকে দলের সিদ্ধান্তে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াতে হয়েছিল। এখন তাঁদের এভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছে।

আট নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের ৭জনই দলীয় লোক :

১১ জুন দেশের শীর্ষ আট নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষে নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ দিয়েছে সরকার। পৃথক পৃথক প্রজ্ঞাপনে এ নিয়োগ দিয়েছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। তবে সরকারি এ পদে নিয়োগ পাওয়া আট জনের মধ্য সাত জনই বিএনপির স্থানীয় পর্যায়ের শীর্ষ নেতা এবং বাকি অন্য একজন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের বল্যবন্ধু। ৮ জনের মধ্যে কুমিল্লা মহানগর বিএনপির সভাপতি উদবাতুল বারী আবুকে কুমিল্লা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের প্রথম চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ পেয়েছেন। রাজশাহী মহানগর যুবদলের সাবেক সভাপতি মো. আবুল কালাম আজাদকে রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ধানের শীর্ষ প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজিত মোতাহার হোসেন তালুকদার ময়মনসিংহ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান এবং সিলেট মহানগর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রেজাউল হাসান লোদী সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ পেয়েছেন।

এছাড়া রংপুর মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক মো. সামসুজ্জামান সামুকে রংপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান, চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক ইঞ্জিনিয়ার বেলায়েত হোসেনকে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান এবং নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মাশুকুল ইসলাম রাজীবকে নারায়ণগঞ্জ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান করেছে সরকার। এদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের স্কুলজীবনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু, রাষ্ট্রায়ত্ত ইস্টার্ন রিফাইনারির সাবেক কর্মকর্তা ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ জসিম উদ্দিনকে কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলদেশের নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামানের মনে করেন ,একসঙ্গে এতগুলো সরকারি সংস্থার নেতৃত্বস্থানীয় পদে দলীয় ব্যক্তিদের নিয়োগ উদ্বেগজনক। শুরু থেকেই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের মতো নজরদারি সংস্থার শীর্ষ পদ থেকে স্থানীয় সরকারের প্রশাসক, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যসহ রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ পদে যত নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, সব ক্ষেত্রেই দলীয় ক্ষমতার একচ্ছত্র আধিপত্যের সংস্কৃতি অনুসরণ করা হয়েছে। এসবের মাধ্যমে সরকার পরিষ্কারভাবে যে বার্তা দিচ্ছে, তা হলো এবার আমাদের পালা। এটা যে চূড়ান্ত বিবেচনায় আত্মঘাতী হবে, তারা সেটা উপলব্ধি করছে না।’