# স্বাধীন বিচার বিভাগীয় সচিবালয়ের অপমৃত্যু ঘটানো হয়েছে: বিরোধী দলীয় নেতা
# বিচার বিভাগ ধ্বংসের নীলনকশা - এনসিপির আইনজীবী
# সরকারের স্বৈরাচারী মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ : ডাকসু
# আজ আদালত অবমাননার মামলা হবে
সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় বিলুপ্ত করে এই সচিবালয়ের সিনিয়র সচিবসহ ১৫ জন কর্মকর্তাকে আইন মন্ত্রণালয়ে ফেরত নেওয়া হয়েছে। সরকারের এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে তীব্র প্রতিবাদ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন রাজনীতিবিদ, আইনজীবীসহ বিভিন্ন মহল। তারা বলছেন, এ সিদ্ধান্তের মাধ্যমে সরকার স্বৈরাচারী মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছে। এর মাধ্যমে বিচার বিভাগ ধ্বংসের নীলনকশা বাস্তবায়বায়ন হবে বলে তারা আশংকা করছেন। এ বিষয়ে মামলা চলমান অবস্থায় এ সিদ্ধান্ত নেয়া আদালত অবমাননা। আজকে আদালত অবমাননার মামলা দায়ের করা হবে বলে জানিয়েছেন আইনজীবীরা।
গত মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় বিলুপ্ত করে এই সচিবালয়ের সিনিয়র সচিবসহ ১৫ জন কর্মকর্তাকে আইন মন্ত্রণালয়ে ফেরত নেওয়া হয়। সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শক্রমে এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানিয়েছে সরকার। এ বিষয়ে রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে আইন মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগ।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শ অনুযায়ী বাংলাদেশ জুডিসিয়াল সার্ভিসের নিম্ন বর্ণিত সদস্যদেরকে পরবর্তী উপযুক্ত পদে পদায়নের নিমিত্ত পুনরাদেশ না দেওয়া পর্যন্ত আইন ও বিচার বিভাগে সংযুক্ত করা হলো। প্রজ্ঞাপনে ছক করে কর্মকর্তাদের নাম, বিলুপ্ত সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের সাবেক পদ এবং সংযুক্ত পদ উল্লেখ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে গতকাল বিরোধী নেতা জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে বলেছেন, গতকালই (মঙ্গলবার) স্বাধীন বিচার বিভাগীয় সচিবালয়ের অপমৃত্যু ঘটানো হয়েছে।
জামায়াত আমির বলেন, বার্তা স্পষ্ট, বিচারের ওপর রাজনৈতিক প্রভাব ও কর্তৃত্ব নিরঙ্কুশভাবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। অথচ এই সরকার বিচার বিভাগকে পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া ও শক্তিশালী করার প্রত্যয় ঘোষণা করেছিল।
তিনি আরও বলেন, বিধিবাম এই অপসংস্কৃতিকে ঘৃণা করি। এর পরিবর্তন একদিন এই বাংলার মাটিতেই হবে, ইনশাআল্লাহ।
এদিকে গতকাল সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গনে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন আইনজীবীরা। সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট মুহাম্মদ শিশির মনির বলেছেন, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় বিলুপ্ত করে কর্মকর্তাদের সরিয়ে নেওয়া সিরিয়াস আদালত অবমাননা বলে মন্তব্য করেছেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী।
আইনজীবী মুহাম্মদ শিশির মনির বলেন, সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় গঠন করা হয়েছে। বিষয়টি এখনও আদালতে বিচারাধীন। এ অবস্থায় সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় বিলুপ্ত করা সিরিয়াস আদালত অবমাননা। আমরা আগামীকাল সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার আবেদন করব।
এনসিপি সমর্থিত আইনজীবীর প্রতিক্রিয়া
সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় বিলুপ্ত করে বিচারকদের আইন মন্ত্রণালয়ে ফিরিয়ে নেওয়ার সরকারি সিদ্ধান্তকে স্বাধীন বিচার বিভাগ ধ্বংসের ‘নীলনকশা’ বলে আখ্যায়িত করেছেন এনসিপিপন্থি আইনজীবীরা। একইসঙ্গে সচিবালয় প্রতিষ্ঠার সময় উচ্ছ্বাস প্রকাশ করা বর্তমান আইনমন্ত্রী ও অ্যাটর্নি জেনারেলের বর্তমান নীরবতা নিয়েও কড়া সমালোচনা করেছে এনসিপি সমর্থিত ন্যাশনাল লয়ার্স অ্যালায়েন্স।
গতকাল বুধবার ব্রিফিংয়ে এনসিপির আইনজীবী ফোরামের নেতা জহিরুল ইসলাম মুসা বলেন, স্বাধীন এবং পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার জন্য মানুষের, বিচারকদের যে আকাক্সক্ষা, সেটিতে বিএনপি সরকার খুবই বাজে একটি হস্তক্ষেপ করেছে।
মাসদার হোসেন মামলার রায়ের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে তিনি বলেন, ওই নির্দেশনার আলোকে স্বাধীন সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ প্রণীত হয়েছিল। বর্তমান রাজনৈতিক সরকার, বিএনপি সরকার বিচার বিভাগকে ধ্বংস করার জন্য তাদের যে আকাক্সক্ষা ছিল, আজকে সেই নীল নকশা জনমানুষের সামনে প্রকাশিত হলো। আমরা এর তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি।
সচিবালয় ইস্যুতে বর্তমান অ্যাটর্নি জেনারেল ও আইনমন্ত্রীর আগের ভূমিকার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে জহিরুল ইসলাম মুসা বলেন, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় নিয়ে যখন অধ্যাদেশ জারি হয়, তখন বর্তমান অ্যাটর্নি জেনারেল উচ্ছ্বসিত অভিব্যক্তি প্রকাশ করেছিলেন। তিনি এটিকে একটি মাইলফলক হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। আগের অধ্যাদেশ প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় বর্তমান আইনমন্ত্রী, যিনি তৎকালীন অ্যাটর্নি জেনারেল ছিলেন, তিনিও ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন। কিন্তু বর্তমান বিচার বিভাগ সংশ্লিষ্ট বিষয়সমূহে এই দুইজন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তির নীরবতা এবং রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় তাদের অংশগ্রহণ আমাদেরকে ব্যথিত করেছে বলে তিনি জানান।
সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, জনআকাক্সক্ষার বিপরীতে গিয়ে আপনারা রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়ন করবেন না। নিয়ন্ত্রিত বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করবেন না। ৩১ দফার যে ওয়াদা ছিল সেটি আপনারা মেনে নেন।
ব্রিফিংয়ে ন্যাশনাল লয়ার্স অ্যালায়েন্সের সুপ্রিম কোর্ট ইউনিটের আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট মোস্তফা আজগর শরিফী বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশের আলোকে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের সাথে আমরা লক্ষ্য করলাম গতকাল সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ে কর্মরত কর্মকর্তাদেরকে নির্দেশনার মধ্য দিয়ে আবার আইন মন্ত্রণালয়ে ফেরত নেওয়া হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে সচিবালয় কার্যক্রমের যবনিকা ঘটানো হয়েছে।
এই আদেশের মাধ্যমে বিচার বিভাগ, নিম্ন আদালতের বিচারক এবং সাধারণ জনগণ সংক্ষুব্ধ হয়েছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, অবিলম্বে স্বাধীন বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠা করার জন্য একটা কার্যকর আইন প্রণয়ন করতে হবে। সেই কার্যকর আইনের মধ্য দিয়ে বিচার বিভাগকে জবাবদিহিতার জায়গায় নিয়ে এসে একটি স্বাধীন ও স্বচ্ছ বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় বাতিলের সিদ্ধান্ত সরকারের স্বৈরাচারী মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ : ডাকসু
জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বিচার বিভাগের প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা, নিম্ন আদালতের বিচারকদের বদলি, পদোন্নতি এবং শৃঙ্খলাবিধান নিশ্চিতের লক্ষ্যে “সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়” প্রতিষ্ঠা করেছিল। কিন্তু বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর “সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় রহিতকরণ বিল” পাসের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশ বাতিল করে। সর্বশেষ, সচিবালয় বিলুপ্ত করে সিনিয়র সচিবসহ ১৫ জন কর্মকর্তাকে পুনরায় আইন মন্ত্রণালয়ে ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে, যা বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও প্রশাসনিক স্বায়ত্তশাসন নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদ সরকারের এমন সিদ্ধান্তের নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছে।
সংবিধান অনুযায়ী বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ জনআকাক্সক্ষা। অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, স্বৈরাচারী শেখ হাসিনার সরকার বিচার বিভাগকে প্রভাবিত করে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করেছে। অধস্তন আদালতের বিচারকদের বদলির ভয় এবং পদোন্নতির প্রলোভনের মাধ্যমে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিকে দমন-পীড়ন করেছে এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে নিজেদের রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে।
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার একটি মৌলিক ভিত্তি। রাষ্ট্রক্ষমতার পৃথকীকরণ ও বিচার বিভাগের প্রশাসনিক স্বাধীনতা ছাড়া কার্যকর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠা ছিল বিচার বিভাগের ওপর নির্বাহী বিভাগের অযাচিত প্রভাব হ্রাস এবং সাংবিধানিক ভারসাম্য রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। কিন্তু এ ধরনের ব্যবস্থা বাতিলের সিদ্ধান্ত বিচার বিভাগের স্বাধীন কার্যক্রমকে পুনরায় নির্বাহী নিয়ন্ত্রণের আওতায় নিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি করছে। বর্তমান সরকার বাংলাদেশের জনগনের রায় এবং আকাঙ্খাকে অবজ্ঞা করছে। গণআকাক্সক্ষা বাস্তবায়নের পরিবর্তে তা বাতিলের সিদ্ধান্ত সরকারের স্বৈরাচারী মনোভাবেরই বহিঃপ্রকাশ।
ডাকসু অবিলম্বে এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় পুনর্বহাল এবং বিচার বিভাগের পূর্ণাঙ্গ প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করার জন্য সরকারের প্রতি জোর দাবি জানাচ্ছে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতায় কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ থেকে সরকারকে বিরত থাকতে হবে। একইসাথে, অধস্তন আদালতের বিচারকদের বদলি, পদোন্নতি এবং শৃঙ্খলাবিধানের নিয়ন্ত্রণ সুপ্রিম কোর্টের কাছে ন্যস্ত করতে হবে।