সিলেটে ট্রিপল মার্ডার
কবির আহমদ, সিলেট ব্যুরো: দেশে বিদেশে আলোড়ন সৃষ্টিকারী সিলেটের ট্রিপল মার্ডার নিয়ে ব্যাপক আলোচনা সমালোচনা চলছে। পুলিশ ও বাদীর বক্তব্য সাংঘর্ষিক হওয়ায় এ মামলার ভবিষ্যত নিয়ে অনেকেই সংকিত। ইতিমধ্যে গতকাল রোববার সত্তার মিয়া দম্পতি ও কাজের মেয়ে হত্যাকারী সন্দেহভাজন গ্রেফতারকৃত আসামী বাবুল মিয়ার ১০ দিনের রিমান্ড পুলিশ চাইলে বিজ্ঞ আদালত তার ৪ দিনের আবেদন মঞ্জুর করেছেন। পুলিশ বলছে প্রেমের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ঘটনার দিন সকালবেলা কাজের মেয়ে তাহমিনাকে খুন করতে গিয়ে ধরাবাহিক খুনের শিকার হন সাত্তার মিয়া ও তার স্ত্রী সুরাইয়া বেগম। ঘাতক বাবুলকে রায়নগর রাজবাড়ী এলাকায় কেউ চিনেন রংমিস্ত্রি হিসাবে আবার কারো কাছে সে কসাই হিসেবে পরিচিত। কিন্তু প্রবাস থেকে আসা মরহুম সাত্তার মিয়ার পরিবার বাবুলকে আসামী করতে নারাজ। তাদের দাবি জায়গার দ্বন্দ্ব নিয়ে এ হত্যাকান্ড ঘটেছে। গত শুক্রবার ৩ জনের জানাযার নামায নগরীর শাহী ঈদগাহে সম্পন্ন হয়। দাফন শেষে এসএমপি’র কোতয়ালী থানায় নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে নিহতের মেয়ে যুক্তরাজ্য প্রবাসী সেলিনা সুলতানা মামলা দায়ের করলে মামলার এজাহারে কসাই বাবুল এর নাম আনা হয়নি। বরং এ মামলায় সন্দেহভাজন আসামী হিসেবে সিলেট জেলা বারের সিনিয়র আইনজীবী সিরাজুল ইসলাম এর নাম দেয়া হয়েছে। সন্দেহের তীর সিরাজুল ইসলাম এর দিকে থাকায় আইনজীবীসহ সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ উৎকন্ঠা বিরাজ করছে। পুলিশও এ ব্যাপারটি ভালো চোখে দেখছে না।
সিলেটে ট্রিপল মার্ডারের রহস্য নিয়ে তৈরি হয়েছে ব্যাপক জটিলতা। হত্যাকা-ের পর বাবুল মিয়া নামের এক শ্রমজীবীকে আটক করে পুলিশ। ওই সময় পুলিশের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, বাসার গৃহকর্মীর সাথে প্রেমের সম্পর্কের জেরে বাবুল একাই তিন খুন করেছে। কিন্তু নিহত এমএ সাত্তারের পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা দায়েরের পর উঠে এসেছে সম্পত্তি নিয়ে দ্বন্দ্বের চাঞ্চল্যকর তথ্য।
এমএ সাত্তারের যুক্তরাজ্য প্রবাসী মেয়ে সেলিনা সুলতানার দায়ের করা মামলায় অভিযোগে করা হয়, নগরের লামাবাজারস্থ ১২ শতক ভূমির মালিকানা নিয়ে এডভোকেট সিরাজুল ইসলাম নামের এক আবাসন ব্যবসায়ীর সাথে তাঁর বাবার দ্বন্দ্ব ছিল। এই দ্বন্দ্বের জের ধরে পেশাদার খুনিদের দিয়ে তাঁর বাবা-মা ও গৃহকর্মীকে খুন করা হয়েছে। মামলায় আটক বাবুলের ব্যাপারে কোন অভিযোগ করেননি সেলিনা।
গত ১২ আগস্ট বুধবার সকালে সিলেট নগরের রায়নগর মিতালী আবাসিক এলাকার ১১১ নম্বর নিজ বাসায় খুন হন আওয়ামী লীগ নেতা ও সিলেট চেম্বার অব কমার্সের সাবেক পরিচালক এমএ সাত্তার, স্ত্রী সুরাইয়া বেগম ও গৃহকর্মী তাহমিনা। খবর পেয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যান সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার (এসএমপি) সারোয়ার মুর্শেদ শামীম।
পরিদর্শন শেষে তিনি গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, হত্যাকা-ের নেপথ্যে পারিবারিক পূর্ববিরোধ কিংবা ডাকাতির ঘটনা হতে পারে। বাসার ভেতরে আলমিরা ও ওয়ার্ডব খোলা এবং জায়গার দলিলের কাগজ মেঝেতে পড়েছিল। বাসা থেকে মূল্যবান জিনিসপত্র খোয়া যাওয়ারও আশঙ্কা করেন কমিশনার। সন্ধ্যায় ঘটনাস্থলে গিয়ে গণমাধ্যমের সাথে আবারও কথা বলেন তিনি।
এসময় তিনি বলেন, হত্যাকা-ের ঘটনায় বাবুল মিয়া নামের এক ব্যক্তিকে আটক করা হয়েছে। সে রঙ মিস্ত্রি ও কসাইয়ের কাজ করে। আটকের পর সে পুলিশকে জানিয়েছে, কাজের সুবাদে যাতায়াতের কারণে ১৫-২০ দিন ধরে গৃহকর্মী তাহমিনার সাথে তার প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। সকালে সে তাহমিনার সাথে দেখা করতে গেলে কোন বিষয় নিয়ে মতবিরোধ হয়। এসময় সাথে থাকা ছোরা দিয়ে বাবুল প্রথমে তাহমিনাকে আঘাত করে। তার চিৎকারে এগিয়ে আসলে সুরাইয়া ও এমএ সাত্তারকেও সে খুন করে পালিয়ে যায়। এসময় বাসা থেকে মূল্যবান কাগজ বা জিনিসপত্র খোয়া যাওয়ার বিষয়টি এড়িয়ে যান কমিশনার।
ঘটনার পরদিন বাবুলের তথ্যমতে এমএ সাত্তারের বাসার পাশের একটি খালি প্লট থেকে হত্যাকা-ে ব্যবহৃত ছোরা উদ্ধারের দাবি করে পুলিশ। এসময় গণমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে এসএমপির ডেপুটি পুলিশ কমিশনার (নর্থ) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম জানান, তাহমিনার সাথে বাবুলের প্রেম নয় জানাশোনা ছিল। তাহমিনার করা কটাক্ষে বাবুল ক্ষুব্ধ হয়ে একাই তিন খুন করেছে। তবে বাসা থেকে কোন কিছু খোয়া যায়নি বলে মন্তব্য করেন তিনি। এক দিনের ব্যবধানে পুলিশের দুই কর্মকর্তার বক্তব্যে হেরফের নিয়ে মানুষের মধ্যে হত্যারহস্য নিয়ে প্রশ্নের উদ্রেক হয়। এক ব্যক্তির পক্ষে তিনজনকে খুন ও গৃহকর্মীর সাথে প্রেমের সম্পর্কের জেরে হত্যাকা- পুলিশের এমন বক্তব্য যেন মানুষের কাছে খাপছাড়া মনে হচ্ছিল।
ডিসি সাইফুল ইসলামের এ জোড়ালো বক্তব্যের পর আলোচনায় চলে আসে কসাই ওরফে রংমিস্ত্রী বাবুলের নাম। অনেকে ফেইসবুকসহ জাতীয় স্থানীয় পত্রিকায় বিবৃতি দিয়ে বাবুলের ফাঁসি দাবি করেন। জাতীয় স্থানীয় পত্রিকায় বাবুলকে ঘাতক আখ্যা দিয়ে প্রতিবেনও ছাপা হয়। কিন্তু নিহতের মেয়ের এজাহার দাখিলের পর ঘটনার মোড় পাল্টে যায়। বিজ্ঞজন মনে করছেন অন্য কাউকে ফাঁসানোর জন্যই কী নিহতের মেয়ে এমন এজাহার দাখিল করেছেন থানায়? এ নিয়ে সিলেটের জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। নগরবাসী মনে করছে পুলিশ খতিয়ে দেখলে প্রকৃত আসামীর নাম বেরিয়ে আসবে। ঘটনার শুরু থেকে অনেকে জায়গা-জমি সংক্রান্ত বিরোধের বিষয়টি সামনে আনলেও পুলিশ তা মানতে নারাজ।
মামলার এজাহারে বাদী উল্লেখ করেন, নগরীর লামাবাজারে ১২ শতক ভূমির মালিক তিনি ও তাঁর বাবা। ওই জায়গা নিয়ে ইম্পালস বিল্ডার্স লিমিটেডের চেয়ারম্যান এডভোকেট সিরাজুল ইসলামের সাথে তাদের দ্বন্দ্ব রয়েছে। এর জের ধরে সিরাজুল ইসলাম আদালত ও তাদের বাসায় গিয়ে কয়েকবার হুমকি দিয়েছেন। এসব ঘটনায় থানায় একাধিক জিডি ও আদালতে মামলা রয়েছে।
সর্বশেষ গত ২৮ জুলাই আদালতে তাদের আইনজীবীকে ও ৩০ জুলাই তার বাবাকে মামলা প্রত্যাহারের জন্য সিরাজুল ইসলাম হুমকি দেয়। আগামী ১৯ আগস্ট ওই জায়গা সংক্রান্ত একটি মামলার ধার্য্য তারিখও রয়েছে। সেলিনার অভিযোগ, ওই সম্পত্তির কারণে তার বাবা-মা ও গৃহকর্মী খুন হয়েছেন। তবে এডভোকেট সিরাজুল ইসলামের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি দৈনিক সংগ্রামকে জানান, “নির্মম এ হত্যাকান্ডে আমিও মর্মাহত ও ব্যাথিত। জায়গা সংক্রান্ত ব্যাপারে তাদের সাথে যদি আমার কোন মামলা থাকে তবে তা আদালত যে রায় দিবে আমি তা মেনে নিব, আমি হত্যাকান্ড ঘটাবো কেন? হত্যা বা মারামারি তা তো কোন সমাধান নয়”। তিনি বলেন, “পুলিশের উচিত হবে কোন প্রলোভন এ পা না দিয়ে সঠিক তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত খুনীকে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা হোক। এতে পুলিশের মর্যাদা বৃদ্ধি পাবে।”
গত শনিবার এসএমপির গণমাধ্যম কর্মকর্তা, অতিরিক্ত উপকমিশনার মো. মনজুরুল আলম জানান, একটি ঘটনার নেপথ্যে অনেক কিছু থাকতে পারে। আমাদের সামনে যা যা আসবে সব নিয়ে তদন্ত করব। যত ধরণের ক্লু বা তথ্য পাওয়া যাব সবগুলো যাচাই করা হবে। প্রাথমিক তদন্তে মনে হয়েছে প্রেমের সম্পর্কের জের ধরে বাবুল একা ঘটনাটি ঘটিয়েছে। পরিবারের পক্ষ থেকে দায়ের করা মামলায় সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের অভিযোগ করা হয়েছে। কোন তথ্যই তদন্তের বাহিরে থাকবে না।
বাবুল মিয়া ৪ দিনের রিমান্ডে
এদিকে গত ১২ আগষ্ট বুধবার সিলেট মহানগরীর রায়নগর এলাকায় মিতালি নিকুঞ্জ ভিলায় নির্মমভাবে তিন খুনের ঘটনায় বাবুল মিয়াকে গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে তুলেছে পুলিশ। গতকাল রোববার সকাল আনুমানিক ১১টার দিকে বাবুল মিয়াকে গ্রেফতার দেখিয়ে অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিষ্ট্রেট আদালতে হাজির করা হয়। এ সময় পুলিশ তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতের কাছে ১০ দিনের রিমা- আবেদন করে। আদালতের বিজ্ঞ বিচারক ফারহানা সুলতানা শুনানী শেষে ৪ দিনের রিমা- মঞ্জুর করেন।
গতকাল রিমান্ডের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন এসএমপির এডিশনাল কমিশনার (মিডিয়া) মো. মনজুরুল আলম।
উল্লেখ্য, গত ১২ আগস্ট সকাল ৯টার দিকে মহানগরীর রায়নগর মিতালী আবাসিক এলাকার ১১১ নম্বর বাসা নিকুঞ্জ ভিলার মালিক বিয়ানীবাজার আখাখাজনা এলাকার মৃত আবরু মিয়ার ছেলে রায়নগর রাজবাড়ি এলাকার মিতালি ১১১ নম্বর বাসার মালিক মো. আব্দুস সাত্তার (৮২), তাঁর স্ত্রী সুরাইয়া বেগম (৭৬) ও গৃহকর্মী তাহমিনা (২৫) হত্যাকা-ের ঘটনা ঘটে। পরে পুলিশ লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য সিলেট এমএজি ওসমানী কলেজের মর্গে প্রেরণ করে। গত শুক্রবার বাদ আসর সিলেটের ঐতিহ্যবাহী শাহী ঈদগাহ ময়দানে আব্দুস সাত্তার ও সুরাইয়া বেগমের নামাজের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এবং পরবর্তীতে মহানগরীর মানিক পীরের টিলায় নিহত দম্পতির দাফন সম্পন্ন হয়।