ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) কর্তৃক প্রকাশিত ঐতিহাসিক দালিলিক গ্রন্থ শহিদ শরিফ ওসমান হাদি'র বক্তব্য সংকলন ‘বারুদমাখা কথামালা’-এর মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। আজ বিকেল ৪টায় জুলাই শহিদ স্মৃতি ভবন অডিটোরিয়ামে এ মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়।
শহিদ শরিফ ওসমান হাদির ৪৪টি বক্তব্য লিপিবদ্ধ করে প্রকাশিত ‘বারুদমাখা কথামালা’ গ্রন্থটি সম্পাদনা ও প্রকাশ করেছেন ডাকসুর সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক মুসাদ্দিক আলী ইবনে মোহাম্মদ। বইটি শহিদ ওসমান হাদির বক্তব্যসমূহকে সংরক্ষণের একটি প্রয়াস হিসেবে প্রকাশ করা হয়েছে।
অনুষ্ঠানের শুরুতে কোরআন তেলাওয়াত করেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ক্বারী আব্দুল্লাহ আল জাওয়াদ। এরপর ইসলামি সংগীত পরিবেশন করেন জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী আহমেদ আতাউল্লাহ সালমান।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন দৈনিক আমার দেশ-এর সম্পাদক ড. মাহমুদুর রহমান।
এ ছাড়া অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ, এমপি, সেক্রেটারি, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ; ডেইলি ওয়াদাহ-এর সম্পাদক ও সাবেক প্রেস সচিব জনাব শফিকুল আলম; এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক জনাব নাসিরুদ্দিন পাটোয়ারী; ডা. মাহমুদা মিতু, এমপি; ডা. মারদিয়া মমতাজ, এমপি; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক জহিরুল ইসলাম; ডাকসুর জিএস এস এম ফরহাদ; ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক আব্দুল্লাহ আল জাবের; ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব ও ডাকসুর মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন বিষয়ক সম্পাদক ফাতিমা তাসনিম জুমা; ডাকসুর ক্রীড়া সম্পাদক আরমান হোসেন; কার্যনির্বাহী সদস্য উম্মে উসওয়াতুন রাফিয়া; জহুরুল হক হলের ভিপি আহসান হাবীব ইমরোজ এবং ওসমান হাদি হল সংসদের (প্রস্তাবিত) জিএস আহমেদ আল সাবাহ।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন (প্রস্তাবিত) ওসমান হাদি হল সংসদের ভিপি মুসলিমুর রহমান; কুয়েত মৈত্রী হলের সাহিত্য সম্পাদক সুমাইয়া সুলতানা লুবনা; কবি সুফিয়া কামাল হল সংসদের সংস্কৃতি সম্পাদক তাহমিদা আকবরসহ ডাকসু ও বিভিন্ন হল সংসদের নেতৃবৃন্দ।
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন ডাকসুর কার্যনির্বাহী সদস্য আফসানা আক্তার। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ডাকসুর ভিপি জনাব সাদিক কায়েম।
গ্রন্থটির সম্পাদনা ও প্রকাশনার কাজে সম্পাদক মুসাদ্দাক আলী ইবনে মোহাম্মদের সঙ্গে সহ-সম্পাদক হিসেবে কাজ করেছেন নাইম আল-ইসলাম সজীব, সাবিকুন্নাহার তামান্না, আফসানা আক্তার, ইউসুফ আব্দুল্লাহ, সুমাইয়া ইসলাম লুবনা, রিয়াদুল ইসলাম যুবা, রিজওয়ান য্যুবরান মানসূরী, মমিনুল ইসলাম, সায়মুম ফেরদৌস সৌরভ, আসফাকউল্লাহ আসিফ, সুহাইল মাহদীন ও আব্দুর রহিম (ইরহাম)।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে দৈনিক আমার দেশ-এর সম্পাদক ড. মাহমুদুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের বিভিন্ন হত্যাকাণ্ড, গুম-নির্যাতন ও জুলাই গণহত্যার দায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের আশ্রয়স্থল হিসেবে ভারত বারবার সামনে আসছে।
তিনি বলেন, ‘‘শেখ হাসিনা ভারতে, হাদির হত্যাকারীরা ভারতে, আয়নাঘরের সঙ্গে জড়িত জেনারেলরা ভারতে এবং জুলাই গণহত্যা চালানোর অভিযোগে অভিযুক্ত এমপি-মন্ত্রীরাও ভারতে রয়েছেন। প্রশ্ন হচ্ছে, পৃথিবীতে এত দেশ থাকতে অভিযুক্তরা কেন বারবার ভারতেই আশ্রয় নিচ্ছেন?’’
মাহমুদুর রহমান বলেন, শহীদ শরীফ ওসমান হাদি বাঙালি মুসলমানের নিজস্ব পরিচয় ও সাংস্কৃতিক সত্তাকে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন। সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও বাঙালি মুসলমানের নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচয় নিয়ে দীর্ঘদিনের সংকট রয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
তার ভাষ্য, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে আরও সংহত করতে নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচয় শক্তিশালী করার বিকল্প নেই। এ কারণেই ওসমান হাদি একটি ‘কালচারাল রেভল্যুশন’ বা সাংস্কৃতিক বিপ্লবের কথা বলতেন।
ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে মাহমুদুর রহমান বলেন, তিনি ও ওসমান হাদি একসঙ্গে হাদির মায়ের লাশ কবরে রেখেছিলেন। কিন্তু কিছুদিন পর তাকেই ওসমান হাদির লাশ কবরে রাখতে হয়েছে। জুলাই বিপ্লবের একটি শক্তিশালী প্রতীক বা আইকন হয়ে ওঠার কারণেই হাদি হত্যার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছেন বলে তিনি মনে করেন।
সংসদ সদস্য ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ বলেন, ওসমান হাদি প্রায়ই বলতেন, সংসদে যেতে পারলে তিনি বাকি ২৯৯ সংসদ সদস্যের ঘুম হারাম করে দেবেন। কিন্তু আজ সংসদে দাঁড়িয়েও তার হত্যার বিচার পাওয়া যাচ্ছে না। তিনি ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানান।
ডেইলি ওয়াদা-এর সম্পাদক শফিকুল আলম বলেন, ওসমান হাদি যেভাবে বাংলাদেশের আজাদী বা স্বাধীনতার প্রশ্নটি উপস্থাপন করতেন, এ দেশে খুব কম মানুষই আগে এভাবে বিষয়টি সামনে এনেছেন।
তিনি বলেন, হাদি বিশ্বাস করতেন জুলাই এখনো শেষ হয়নি এবং মানুষের লড়াই মূলত একটি সাংস্কৃতিক লড়াই। বাংলাদেশের মানুষের প্রকৃত মুক্তির জন্য সাংস্কৃতিক সচেতনতা প্রয়োজন বলেও তিনি মনে করতেন।
এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসিরুদ্দিন পাটোয়ারী বলেন, ওসমান হাদি ইনকিলাব মঞ্চ থেকে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতেন এবং তাদের নানা পরামর্শ দিতেন। তবে রাজনৈতিক দলগুলো অনেক সময় তার চিন্তা ও পরামর্শকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়নি।
তিনি বলেন, হাদি যে বাংলাদেশপন্থী রাজনীতির রূপরেখা রেখে গেছেন, তার মৃত্যুর পর তা আরও বেশি মানুষের হৃদয়ে দাগ কেটেছে।
ভারতে আশ্রয় নেওয়া অভিযুক্তদের প্রসঙ্গে নাসিরুদ্দিন পাটোয়ারী বলেন, খুনিদের আশ্রয় দিয়ে ভারতও একটি জটিল পরিস্থিতিতে পড়েছে। তাদের অন্য দেশে হস্তান্তর করলে ভারতের সমর্থকদের একটি অংশ ক্ষুব্ধ হতে পারে, আবার বাংলাদেশে না ফিরিয়ে রাখলে বাংলাদেশের জনগণের আকাঙ্ক্ষার বিপরীতে অবস্থান নেওয়া হয়।
সংসদ সদস্য ডা. মারদিয়া মমতাজ বলেন, ওসমান হাদি তাদের ওপর অনেক দায়িত্ব দিয়ে গেছেন। তার বক্তব্য ও চিন্তাভাবনার সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ প্রয়োজন। দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার স্বার্থে তার চিন্তা থেকে প্রয়োজনীয় বিষয় বাস্তবায়নের কথাও বলেন তিনি।
সংসদ সদস্য ডা. মাহমুদা মিতু বলেন, ভারতের সঙ্গে ন্যায্য পানি বণ্টন নিশ্চিত করা, ওসমান হাদির হত্যাকারীদের ফিরিয়ে আনা এবং জুলাই গণহত্যার সঙ্গে জড়িতদের দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের আওতায় আনার বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে।
ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) এস এম ফরহাদ বলেন, শহীদ শরীফ ওসমান হাদি বিভিন্ন পডকাস্ট, সাক্ষাৎকার ও অন্যান্য মাধ্যমে যেসব বক্তব্য রেখে গেছেন, সেগুলো একটি শক্তিশালী চিন্তাধারার প্রতিনিধিত্ব করে।
তিনি বলেন, সমাজ, রাষ্ট্র এবং জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে হাদি কীভাবে চিন্তা করতেন, তার বক্তব্যগুলোতে তার প্রতিফলন রয়েছে। এসব ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বক্তব্য একত্রিত করেই ডাকসু এই সংকলন প্রকাশ করেছে। সংকলনটিতে হাদির ৪৪টি লেখা ও বক্তব্য স্থান পেয়েছে।
ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব আব্দুল্লাহ আল জাবের বলেন, শহীদ ওসমান হাদি সাংস্কৃতিক বিপ্লবে বিশ্বাস করতেন। তার ধারণা ছিল, এ অঞ্চলে যত রাজনৈতিক বিপ্লবই হোক না কেন, সাংস্কৃতিক বিপ্লব ছাড়া মানুষের ভাগ্যের প্রকৃত পরিবর্তন সম্ভব নয়।
সভাপতির বক্তব্যে ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম বলেন, শহিদ ওসমান হাদির বক্তব্যগুলো প্রত্যেকটা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং প্রত্যেকটা জায়গায় ছড়িয়ে দিতে হবে।
যারা জুলাইয়ের বেশি সেবায়, তারা জুলাইয়ের সঙ্গে প্রতারণা করবে। আজকে আমরা দেখতে পাচ্ছি একটা দল নির্বাচিত হয়েছে। নির্বাচিত হওয়ার পর ছয় মাসের মধ্যে যারা আজকে জনগণের সাথে তারা প্রতারণা করছে।
এই ক্যাম্পাসে যদি আবার কেউ গেস্টরুম গণরুম ফিরিয়ে নিয়ে আসতে চায়, যদি শিক্ষার্থীদের উপর নিপীড়ন করতে চায়, তাহলে ওসমান হাদী আমাদেরকে শিখিয়েছে আমাদের জীবন দিয়ে হলেও এই অন্যায় প্রতিরোধ করতে হবে। ।
যারা ফিজিক্যালি চ্যালেঞ্জড আছে তাদের জন্য আমরা ব্রেইলে বই বের করছি। অন্যান্য ধর্মাবলম্বী ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের ভাষায়ও আমরা বই বের করতে যাচ্ছি। আমরা যত বৈচিত্র্যময় কাজ করা যায়, সেই কাজগুলো আমরা আমাদের জায়গা থেকে অব্যাহত রাখছি। আমরা দোয়া করছি শহীদ উসমান হাদীর জন্য, আল্লাহ তাআলা ওনাকে জান্নাতুল ফেরদৌসের মানুষ হিসেবে কবুল করুন।
ডাকসু ভিপি আরও বলেন, শহীদ ওসমান হাদি যে পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেই স্বপ্নকে শুধু কথার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে কাজের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করতে হবে।
তিনি বলেন, কিছু মানুষ পৃথিবীতে না থাকলেও তাদের চিন্তাধারা ও আদর্শ মানুষের মধ্যে বেঁচে থাকে। শহীদ শরীফ ওসমান হাদি তেমনই একজন ব্যক্তি। তিনি মানুষের অব্যক্ত কথাগুলো কীভাবে উচ্চারণ করতে হয়, তা শিখিয়ে গেছেন।
ওসমান হাদির স্মৃতি ও চিন্তাধারা সংরক্ষণে আধিপত্যবাদবিরোধী ও ফ্যাসিবাদবিরোধী সব রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান ডাকসু ভিপি।