ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৫–২৬ শিক্ষাবর্ষের নবীন শিক্ষার্থীদের বরণ করে নিতে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার উদ্যোগে দিনব্যাপী নবীনবরণ অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়েছে।

শনিবার (১৬মে) বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি অডিটোরিয়ামে তিনটি পৃথক স্লটে এ আয়োজন সম্পন্ন হয়। সকাল ৯টা ৩০ মিনিটে কলা, আইন ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের শিক্ষার্থীদের নিয়ে প্রথম সেশন, দুপুর ২.৩০ টায় বিজ্ঞান অনুষদ ও সংশ্লিষ্ট ইনস্টিটিউটসমূহের শিক্ষার্থীদের নিয়ে দ্বিতীয় সেশন এবং সন্ধ্যা ৭ টায় ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের শিক্ষার্থীদের নিয়ে তৃতীয় সেশন অনুষ্ঠিত হয়।

সকালের কলা, আইন ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সেশনে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম। তিনি শহীদ ওসমান হাদীর রুহের মাগফিরাত কামনা করে নবীন শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে বলেন, ইউনিভার্সিটি রেগুলার স্টুডেন্টদের জায়গা হোক; এখানে কোনো আদু ভাইয়ের জায়গা না হোক। এটাই আমাদের স্বপ্ন। এই স্বপ্ন নিয়েই ডাকসুতে স্টুডেন্টদের কাছে আমাদের কমিটমেন্ট ছিল। শিক্ষার্থীরা সেই কমিটমেন্টের ওপর আস্থা রেখেছে এবং আমরা তা বাস্তবায়ন করতে বদ্ধপরিকর।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ডাকসুর ভিপি ও ছাত্রশিবিরের আন্তর্জাতিক সম্পাদক মো. আবু সাদিক কায়েম বলেন, জুলাই বিপ্লবের আগে ফ্যাসিবাদী আমলে এই ক্যাম্পাস ছিল শিক্ষার্থীদের নিপীড়নের ক্যাম্পাস। গণরুম, গেস্টরুমের অসহ্য যন্ত্রণাসহ নানারূপী ফ্যাসিবাদী কাঠামো থাকার ফলে প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার সময়ই থাকতো না। ৫ আগস্টের পরে আমরা এই ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার কবর রচনা করেছি। নবীন শিক্ষার্থীরা যদি শিরদাঁড়া সমুন্নত রেখে নিজের অধিকার বুঝে নিতে পারে তাহলে এই ক্যাম্পাসে আর কোনোদিন গণরুম, গেস্টরুম কালচার ফিরবে না। শিক্ষার্থীদের এই দাবিতে আমরা আমাদের জীবন দিয়ে হলেও পাশে থাকবো।

তিনি আরও বলেন, ডাকসু এখন পর্যন্ত বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ করেছে। তবে প্রশাসনিক অসহযোগিতা ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা অনেক সময় ডাকসুর কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করছে।

700679585_1449635107204056_3723650094611573340_n

সকালের সেশনে প্যানেল আলোচক হিসেবে বক্তব্য দেন ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি জেনারেল ও বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র অ্যাডভোকেট শিশির মনির, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ড. শিব্বির আহমেদ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ বিলাল হোসেন এবং ছাত্রশিবির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি ও ডাকসুর এজিএস মুহা. মহিউদ্দিন খান।

দুপুর ২টায় বিজ্ঞান অনুষদের সেশনে ক্বারী আব্দুল্লাহ আল জাওয়াদের কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে ২য় স্লটের অনুষ্ঠান শুরু হয়। পরে সংগীত পরিবেশন করে প্রবাহ সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সংসদ।

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন ছাত্রশিবির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক মু. সাজ্জাদ হোসাইন ।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ডাকসুর জিএস ও ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক এস এম ফরহাদ বলেন, আপনারা ক্যাম্পাসে কিছুদিন পার করার পরে দুটো চিত্র দেখবেন। একটায় দেখবেন আপনার কিছু বন্ধু লাইব্রেরিতে সময় কাটাবে, ধর্মীয় আচার-কানুন মেনে চলবে। আরেক চিত্রে দেখবেন কিছু বন্ধু ক্যাম্পাসে নেতার পিছে ছুটে বেড়ায়, হলের ছাদে বিড়ি-গাঁজা খায়। পাঁচ বছর পরে দেখবেন আপনার এক বন্ধু সেরা ছাত্র হয়ে বের হবে, আবার বিপরীতে দেখবেন কেউ হারিয়ে গেছে, যাদের নিয়ে এলাকার মুরুব্বিরা গর্ব করতেন, পাঁচ বছর পরে তাদের নাম শুনে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। এ ক্যাম্পাসে ভালো এবং খারাপ হওয়ার সব উপকরণই আছে। এখন সিদ্ধান্ত আপনাদের।

তিনি আরও বলেন, গত নবীনবরণে শিবিরের সভাপতি হিসেবে এসেছিলাম, আর এই নবীনবরণে ডাকসুর জিএস হিসেবে এসেছি।

এস এম ফরহাদ বলেন, ডাকসুর সফলতা একটাই যে বাংলাদেশে এই প্রথম কোনো নির্বাচনের পরে কেউ হল দখল করেনি। ডাকসুর সফলতা এইটাই যে একটা দল জাতীয় নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ ভোট পেয়ে সরকার গঠন করার পরেও কেউ ক্যাম্পাস দখল করতে পারেনি। আপনাদের কাছে একটাই অনুরোধ, আপনারা সত্য প্রকাশে ভয় পাবেন না। আমরা ভাই হিসেবে আপনাদের সাথে থাকবো।

বিজ্ঞান অনুষদের সেশনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহ সিবগা বলেন, জুলাইয়ের ১৬ তারিখ সারা দেশ থেকে গণরুম-গেস্টরুমকে বিতাড়িত করেছে। কেউ যদি এ বিশ্ববিদ্যালয়ে গণরুম ফিরিয়ে আনতে চায়, তাহলে তাকে ছাত্রশিবিরের রক্তের ওপর দিয়ে যেতে হবে। শিবির ছাত্রছাত্রীদের জন্য ঢাল হয়ে দাঁড়াবে।

তিনি আরও বলেন, আবরার ফাহাদকে যারা হত্যা করেছিলো তারাও ভালো স্টুডেন্ট ছিলো। নষ্ট রাজনীতি তাদের খুনি বানিয়ে দিয়েছে। আমরা তোমাদের কাছে একটা সুন্দর ক্যাম্পাস রেখে গেলাম। আমরা বিশ্বাস করি, যদি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ঐক্যবদ্ধ হয় তাহলে পৃথিবীর কোনো শক্তি তাদের থামাতে পারবে না।

699515848_1449635220537378_2738013474800343582_n

তিনি শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে বলেন, ইসলামি ছাত্রশিবির সবসময় তোমাদের সাথে আছে। তোমরা কোনো কষ্টে বা বিপদে পড়লে সেটা আমাদের সাথে শেয়ার করবা। আমরা আমাদের সর্বোচ্চ সামর্থ্য দিয়ে তোমাদের পাশে থাকবো।

ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি ও পরিকল্পনাবিদ সিরাজুল ইসলাম নবীন শিক্ষার্থীদের অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, আমরা আশা করতে চাই তোমাদের মাধ্যমে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড পাশ্চাত্যের অক্সফোর্ডের সাথে প্রতিযোগিতা করবে।

বিজ্ঞান অনুষদের সেশনে প্যানেল আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আব্দুর রব, বুয়েটের ন্যানোম্যাটেরিয়ালস ও সিরামিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. ফখরুল ইসলাম এবং মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ইইই বিভাগের খণ্ডকালীন ফ্যাকাল্টি মো. শরফুদ্দিন।

সন্ধ্যা ৭ টায় ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের শিক্ষার্থীদের নিয়ে তৃতীয় সেশন অনুষ্ঠিত হয়।

ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের সেশনে প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাইন্যান্স বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এইচ এম মোশাররফ হোসেন, খাস ফুডের সিইও হাসিবুল মুস্তফা আরমান এবং মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম এফসিএ (আইসিএবি), এসিএ। তারা শিক্ষার্থীদের ক্যারিয়ার পরিকল্পনা, উচ্চশিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন বিষয়ে বিভিন্ন দিকনির্দেশনা দেন।

দিনব্যাপী প্রতিটি সেশনে নবীন শিক্ষার্থীদের মাঝে আল কুরআন, ব্যাগ, নোটপ্যাড, কলম ও চাবির রিংসহ বিভিন্ন উপহার সামগ্রী বিতরণ করা হয় এবং নাস্তা পরিবেশনের মাধ্যমে প্রতিটি সেমিনার সেশন সমাপ্ত হয়।