শতভাগ আবাসন, আবাসন ভাতা, মেধার ভিত্তিতে অটোমেশন পদ্ধতিতে সিট বন্টন, পরিবহন সংস্কার, পরবর্তী চাকসু ও সিনেট নির্বাচনের রোডম্যাপ প্রকাশের দাবি এবং সম্প্রতি ছাত্রদল কর্তৃক সিট দখলের অপচেষ্টা প্রসঙ্গে “সংবাদ সম্মেলন” করেছে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শাখা।
বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) প্রশাসনিক ভবনের সামনে সংবাদ সম্মেলন আয়োজন করে শাখা ছাত্রশিবির।
বিশ্ববিদ্যালয় সেক্রেটারি হাবিব উল্লাহ খালেদের সঞ্চালনায় এতে লিখিত বক্তব্য পেশ করেন শাখা ছাত্রশিবিরের সভাপতি ইব্রাহীম হোসেন রনি।
লিখিত বক্তব্যে ইব্রাহীম হোসেন রনি বলেন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সময়ে একটি আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। অথচ প্রতিষ্ঠার প্রায় ছয় দশক পরও এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিক্ষার্থীর জন্য আবাসন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। এটি শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়; এটি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার একটি দীর্ঘস্থায়ী বৈষম্য এবং শিক্ষার্থীদের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করার বাস্তব চিত্র।
১৯৬৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হলেও গত ৬০ বছরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০ শতাংশেরও কম শিক্ষার্থীর আবাসন ব্যবস্থা আছে। প্রায় ৮০ শতাংশের অধিক শিক্ষার্থী ক্যাম্পাসের পার্শ্ববর্তী অস্বাস্থকর কটেজ, মেস ও শহরে উচ্চ ভাড়া বহন করে বসবয়াস করতে বাধ্য হচ্ছে।
অথচ জুলাই পরবর্তী সকল প্রশাসনকে শিক্ষার্থীরা বারবার শতভাগ আবাসনের দাবি দিয়ে আসছিল। কিন্তু প্রশাসন এখন পর্যন্ত শতভাগ আবাসনের নির্দিষ্ট কোনো রোডম্যাপ দিতে পারেনি। আমরা আজকের সংবাদ সম্মেলন থেকে অফিসিয়ালি পুনরায় শতভাগ আবাসনের দাবি উত্থাপন করছি। আশা করব আগামী ৭২ ঘন্টার মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন শতভাগ আবাসনের একটি স্পষ্ট রোডম্যাপ শিক্ষার্থীদের কাছে তুলে ধরবে।পাশাপাশি শতভাগ আবাসন ব্যবস্থাপনার পূর্ব পর্যন্ত অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের আবাসনের দুর্ভোগ কমাতে আবাসন ভাতা চালুর জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও স্বজন প্রীতি মুক্ত করণের লক্ষ্যে সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়ায় শুধুমাত্র মেধার ভিত্তিতে হলের সিট বন্টন নিশ্চিত করতে হবে। সম্প্রতি ছাত্রদল কর্তৃক অবৈধভাবে সিট দখলের অপচেষ্টা এবং বিভিন্ন হলে প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন মহলের সুপারিশের ভিত্তিতে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের আসন বরাদ্দ দেওয়ার তথ্য উঠে আসছে। আমরা স্পষ্ট ভাষায় বলছি, হলের সিট পাওয়া শিক্ষার্থীদের মৌলিক অধিকার আর সেটা সুষ্ঠুভাবে বন্টন করা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। কিন্তু প্রশাসন যদি কাউকে সুবিধা দেওয়ার জন্য মেধার ভিত্তিতে সিট না দিয়ে রাজনৈতিক বিবেচনা সিট বরাদ্দ দেয় তবে আমরা এর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে যেতে বাধ্য হবো।
তিনি আরও বলেন, পরিবহন সংকটও আবাসন সংকটের অংশ আবাসন সংকটের কারণে হাজার হাজার শিক্ষার্থীকে ক্যাম্পাসের বাইরে থাকতে হয়। ফলে তাদের জন্য নিরাপদ ও পর্যাপ্ত পরিবহন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দায়িত্ব। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো বৃহৎ আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিবহন কোনো বিলাসিতা নয়; এটি শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন একাডেমিক জীবনের অপরিহার্য অংশ। তাই আবাসন সমস্যার সমাধানের পাশাপাশি পরিবহন ব্যবস্থার আমূল সংস্কার করতে হবে।
সিট দখল প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আজ আমরা এমন একটি সময়ে সংবাদ সম্মেলন করছি, যখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসনসংকট আবারও আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে, হলের সিট দখলকে কেন্দ্র করে ছাত্রদলের রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের নজির সামনে এসেছে। এটি আমাদের গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করেছে। ফ্যাসিবাদী আমলে সর্বশেষ অ্যালটমেন্ট হয়েছিল ২০১৭ সালে। ফ্যাসিবাদী আমল শুরু হওয়ার পর থেকে ক্রমান্বয়ে সিট দখল করে শেষ পর্যন্ত অবৈধভাবে শতভাগ হল দখল করতে সক্ষম হয়েছিল নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগ। সম্প্রতি নতুন করে বেশ কয়েকটি হলে প্রভোস্ট কর্তৃক একটি নির্দিষ্ট দলকে সুবিধা দিয়ে অবৈধ পন্থায় সিট বন্টনের পথ উন্মোচন করছে। যেসব হলে প্রভোস্টের মাধ্যমে ছাত্রদল নেতৃবৃন্দ তাদের সুবিধা আদায় করতে পারছে না তাদেরকে বিভিন্নভাবে হুমকি ও চাপ প্রয়োগ করে আদায়ের প্রচেষ্টা সোহরাওয়ার্দী হলের সদ্য পদত্যাগকৃত প্রভোস্টের ঘটনায় শিক্ষার্থীদের কাছে স্পষ্ট হয়েছে৷ আমরা এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জ্ঞাপন করছি। অতি দ্রুত সময়ের মধ্যে প্রভোস্টের সাথে ছাত্রদল সেক্রেটারির এমন ন্যাক্কারজনক আচরণের তদন্ত পূর্বক ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করার ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রতি সুস্পষ্ট দাবি জানাচ্ছি।
একজন শিক্ষার্থীর ছাত্রত্ব শেষ হয়ে গেলে কিংবা তিনি নিয়মিত শিক্ষার্থী না থাকলে, শুধু রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে তার জন্য আবাসিক সিট ধরে রাখার কোনো সুযোগ থাকতে পারে না। আমরা স্পষ্ট করে বলতে চাই, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের হল হবে শিক্ষার্থীদের জন্য; কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মী পুনর্বাসনের জায়গা হিসেবে হলকে ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না। আমরা অতীতের সেই সংস্কৃতিতে ফিরে যেতে চাই না, যেখানে রাজনৈতিক পরিচয় ছিল সিট পাওয়ার প্রধান যোগ্যতা। সিট বণ্টনে আমাদের অবস্থান অত্যন্ত পরিষ্কার। অটোমেশন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শুধুমাত্র মেধার ভিত্তিতে স্বচ্ছভাবে সিট বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে।
এসময় লিখিত বক্তব্যের মাধ্যমে পাঁচ দফা দাবি উত্থাপন করা হয়- ১. শতভাগ আবাসন নিশ্চিত করতে হবে।
২. শতভাগ আবাসন নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত আবাসন ভাতা চালু করতে হবে।
৩. পরিবহন ব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ সংস্কার করতে হবে।
৪. অটোমেশন প্রক্রিয়ায় শতভাগ স্বচ্ছতার সঙ্গে মেধার ভিত্তিতে হলের সিট বণ্টন করতে হবে।
৫. অবিলম্বে চাকসু ও সিনেট নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করতে হবে।
এসময় আরও উপস্থিত ছিলেন শাখা ছাত্রশিবিরের অফিস সম্পাদক রবিউল ইসলাম, বায়তুলমাল সম্পাদক মো. ইসহাক ভূঁঞা, আন্তর্জাতিক ও মানবাধিকার সম্পাদক সাঈদ বিন হাবিব, ছাত্র অধিকার সম্পাদক মোনায়েম শরীফ, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক হারেস মাতব্বর সহ বিভিন্ন পর্যায়ের দায়িত্বশীলবৃন্দ।