গত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে আরো ৫ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে আরো ১ হাজার ১৭০ জন শিশুর মধ্যে রোগটির উপসর্গ দেখা গেছে। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, গত এক দিনে হামের উপসর্গ নিয়ে ঢাকা বিভাগে ২ জন ছাড়াও চট্টগ্রাম ও খুলনা বিভাগে ১ জন করে মোট ২ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

এদিকে গত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে ১২৫ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে। পাশাপাশি এই সময়ে আরো ১ হাজার ১৭০ জন শিশুর মধ্যে রোগটির উপসর্গ দেখা গেছে। এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে ২৩ মার্চ বৃহস্পতিবার পর্যন্ত মোট ২৮ হাজার ৩৩৪ জন শিশুর মধ্যে হামের উপসর্গ পাওয়া গেছে। সেই সঙ্গে এই সময়ে মোট ৪ হাজার ৫৯ জন শিশুর হাম শনাক্ত হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত সারা দেশে হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ১৮ হাজার ৮৪৫ জন শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। তাদের মধ্যে এ পর্যন্ত সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছে ১৫ হাজার ৭২৮ জন শিশু।

এদিকে শিশুদের পাশাপাশি বয়স্করাও হামে আক্রান্ত হচ্ছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বয়স্কদের মধ্যে যারা হামের টিকা নেননি তারা আক্রান্ত হচ্ছেন। চিকিৎসকরা জানান, হাসপাতালে ৩০ বছরের বেশি বয়সী অনেক রোগী আছেন। বর্তমানে হামের জন্য ৯ ও ১৫ মাসে যে এমআর টিকা দেওয়া হয়, তা এই বয়সী ব্যক্তিদের পাওয়ার কথা নয়। কারণ, তখন এই টিকার প্রচলন ছিল না। তবে, অনেক রোগী পাওয়া যাচ্ছে যারা হামের দুই ডোজ টিকাই নিয়েছেন। টিকা নেওয়ার পরও কেন তারা আক্রান্ত হচ্ছেন, তা নিয়ে সরকার ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার যৌথ গবেষণা প্রয়োজন। চিকিৎসকদের প্রাথমিক ধারণা, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকার কারণেই এরা সহজে আক্রান্ত হচ্ছেন।

হাম-সন্দেহে দুই হাজার ৩১০ জন শিশুর ওপর চালানো জরিপ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এদের মধ্যে ৫৪.৭ শতাংশ শিশু কোনো টিকাই নেয়নি। ২২ শতাংশ শিশু প্রথম ডোজ (এমআর-১) নেওয়ার পরও হামে আক্রান্ত হয়েছে। আর সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, ২৩.২ শতাংশ শিশুকে হামের পূর্ণ দুই ডোজ (এমআর-১ ও এমআর-২) দেয়ার পরও তাদের শরীরে হামের উপস্থিতি পাওয়া গেছে।

নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত ৭৫১ জনের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ৭১.৮ শতাংশ শিশু টিকা নেয়নি (এর মধ্যে ৪৯ শতাংশ শিশুর টিকা নেওয়ার বয়সই হয়নি)। ১৭ শতাংশ শিশু এক ডোজ টিকা নেওয়ার পরও আক্রান্ত হয়েছে। আর ১১.২ শতাংশ শিশু হামের পূর্ণ টিকাদান কর্মসূচি সম্পন্ন করার পরও হামে আক্রান্ত হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ন্যাশনাল ইপিআই সার্ভিল্যান্সের এক সাম্প্রতিক জরিপে এমন উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে।

চিকিৎসকরা জানান, হাসপাতালে ভর্তি শিশুদের মধ্যে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ এমন রোগী আছে, যারা এক বা দুই ডোজ এমআর টিকা নিয়েছে। টিকা নেওয়ার পরও আক্রান্তদের অধিকাংশেরই নিউমোনিয়া কিংবা ডায়রিয়ার মতো জটিলতা দেখা যাচ্ছে।

এমতাবস্থায় সারাদেশের হাসপাতালগুলোকে রোগী ব্যবস্থাপনায় কঠোর নির্দেশনা দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদফতর। নতুন এ নির্দেশনায় বলা হয়েছে, শয্যা খালি না থাকার অজুহাতে কোনো হাসপাতাল থেকে হাম বা হাম উপসর্গের রোগী অন্যত্র রেফার করা যাবে না। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট হাসপাতালকেই অতিরিক্ত শয্যার ব্যবস্থা করে রোগীর চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, শয্যা খালি না থাকার অজুহাতে কোনো হাসপাতাল থেকে হাম বা হাম উপসর্গের রোগীকে অন্য হাসপাতালে রেফার করা যাবে না। প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে অতিরিক্ত শয্যার ব্যবস্থা করতে হবে।

এতে আরও উল্লেখ করা হয়, শুধুমাত্র অতি প্রয়োজনীয় উন্নত চিকিৎসার ক্ষেত্রে রোগী রেফার করা যাবে। এ ধরনের রেফারের ক্ষেত্রে উপজেলা, জেলা, মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও বিশেষায়িত হাসপাতালের নির্ধারিত ফ্লো চার্ট অনুসরণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। নির্দেশনায় বলা হয়েছে, এ আদেশ অমান্য হলে সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল প্রধানকে জবাবদিহির আওতায় আনা হবে।

এ নির্দেশনা কার্যকর করার জন্য দেশের সব মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বিশেষায়িত হাসপাতাল, জেলা সদর ও জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক, সিভিল সার্জন এবং উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।