দেশে যখন বিদ্যুৎ সংকট তীব্র, তখন ব্যাটারিচালিত রিকশা ও অটোরিকশা চার্জ দিতে জাতীয় গ্রিড থেকে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ ব্যবহারের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, এসব যানবাহনের একটি বড় অংশ অবৈধ সংযোগের মাধ্যমে চার্জ দেওয়ায় সরকার বিদ্যুতের পাশাপাশি বিপুল রাজস্বও হারাচ্ছে।
গত ৯ আগস্ট দেশে লোডশেডিং ৩ হাজার ৭০০ মেগাওয়াট ছাড়ানোর তথ্য সামনে আসে। এর মধ্যেই রাতে বিদ্যুতের চাহিদা কমার সময় ব্যাটারিচালিত যানবাহন চার্জ দেওয়ার কারণে গ্রিডে বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট গবেষণায় উঠে এসেছে।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) হিসাবে দেশে ব্যাটারিচালিত যানবাহনের সংখ্যা ৪৫ থেকে ৫০ লাখ। অন্যদিকে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) ও বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসাবে এ সংখ্যা প্রায় ৬০ লাখ। এর মধ্যে শুধু ঢাকাতেই প্রায় ২০ লাখ ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল করছে বলে দাবি করা হয়েছে।
এসব রিকশায় সাধারণত চার থেকে ছয়টি ১২ ভোল্টের ব্যাটারি থাকে। একটি রিকশার ব্যাটারি চার্জ দিতে ঘণ্টায় প্রায় ১ হাজার ১০০ ওয়াট বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয়। আট ঘণ্টা চার্জে থাকলে একটি রিকশায় প্রায় ৯ ইউনিট বিদ্যুৎ খরচ হতে পারে।
সিপিডির গবেষণা অনুযায়ী, ব্যাটারিচালিত রিকশা চার্জ দিতে প্রতিদিন জাতীয় গ্রিড থেকে প্রায় ৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ব্যবহৃত হচ্ছে। দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৫ শতাংশ প্রতিদিন গ্রাস করছে অনিয়ন্ত্রিত ব্যাটারিচালিত রিকশা বা অটোরিকশা—যা স্থানীয়ভাবে ‘টেসলা’ নামেও পরিচিত।
মূল মিটার বাইপাস করে অবৈধ লাইনে চার্জ দেওয়ার কারণে এই খাত থেকে সরকার বছরে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার বিপুল রাজস্ব হারাচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে, জাতীয় গ্রিড থেকে প্রতিদিন এই বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ কীভাবে গায়েব হচ্ছে?
অবৈধ সংযোগের পেছনে সিন্ডিকেট
ব্যাটারিচালিত রিকশার সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গড়ে উঠেছে অসংখ্য অননুমোদিত চার্জিং গ্যারেজ। এসব স্থানে বিদ্যুতের খুঁটি থেকে অবৈধ সংযোগ নিয়ে রিকশার ব্যাটারি চার্জ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
সিপিডির তথ্য অনুযায়ী, অবৈধ সংযোগের কারণে সরকার বছরে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। পাশাপাশি গ্যারেজ ভাড়া ও চার্জ বাবদ এই খাতে বড় ধরনের অনানুষ্ঠানিক লেনদেনও হচ্ছে।
ঢাকার প্রায় ২০ লাখ অটোরিকশার প্রতিটি থেকে গ্যারেজ ভাড়া ও চার্জ বাবদ দিনে গড়ে ১০০ টাকা নেওয়া হলে শুধু রাজধানীতেই দৈনিক লেনদেন দাঁড়ায় প্রায় ২০ কোটি টাকা। বছর শেষে এর পরিমাণ প্রায় ৭ হাজার ২০০ কোটি টাকা। একই হিসাবে সারা দেশে এ ধরনের লেনদেনের পরিমাণ বছরে প্রায় ২১ হাজার কোটি টাকা হতে পারে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ড. হাদিউজ্জামানের মতে, এসব যানবাহন অবৈধ হলেও চালকেরা বিভিন্ন জায়গায় চাঁদা দিয়ে সড়কে চলাচল করছেন। এর সঙ্গে বড় একটি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড জড়িয়ে পড়ায় সমস্যাটি সমাধানে সরকারের কৌশলী পদক্ষেপ প্রয়োজন।
জীবিকার বড় উৎস, ঝুঁকিও কম নয়
ব্যাটারিচালিত রিকশা শুধু পরিবহনের মাধ্যম নয়, অনেক মানুষের জীবিকারও প্রধান অবলম্বন। তুলনামূলক কম খরচে এই যানবাহন চালানো যায় এবং প্যাডেল রিকশার তুলনায় শারীরিক পরিশ্রমও কম। ফলে বিভিন্ন পেশা থেকে কাজ হারানো মানুষও সহজে এই খাতে যুক্ত হচ্ছেন।
একটি ব্যাটারিচালিত রিকশা তৈরি করতে প্রায় ৭০ থেকে ৭২ হাজার টাকা খরচ হয়। বিপরীতে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা কিনতে কয়েক লাখ থেকে ১০-১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত প্রয়োজন হতে পারে। কম ভাড়া ও সহজলভ্যতার কারণে যাত্রীদের কাছেও এসব যানবাহনের চাহিদা রয়েছে।
তবে এর সঙ্গে সড়ক নিরাপত্তার ঝুঁকিও রয়েছে। প্রশিক্ষণ ও ট্রাফিক আইন সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান না থাকা অনেক চালক সড়কে যানবাহন চালাচ্ছেন বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, এক বছরে অটোরিকশা সংশ্লিষ্ট দুর্ঘটনায় ১ হাজার ৩৭৬ জনের মৃত্যু হয়েছে।
নিষেধাজ্ঞা নয়, নিয়ন্ত্রণের পরামর্শ
বিশেষজ্ঞদের মতে, একবারে ব্যাটারিচালিত রিকশা বন্ধ করে দেওয়া বাস্তবসম্মত নয়। কারণ, এই খাতের সঙ্গে বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবিকা জড়িত। তাই শুধু সড়ক থেকে রিকশা জব্দ করে সমস্যার স্থায়ী সমাধান করা সম্ভব নয়।
অবৈধ রিকশার যন্ত্রাংশ আমদানিকারক, স্থানীয়ভাবে বডি তৈরির কারখানা এবং অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া চার্জিং গ্যারেজের ওপর নজরদারি বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন তাঁরা। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ চুরির সঙ্গে জড়িত সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের মতে, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলোকে সমন্বিতভাবে দায়িত্ব ভাগ করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে। পাশাপাশি অবৈধ চার্জিং গ্যারেজগুলোর বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিদ্যুৎ সংকটের সময়ে ব্যাটারিচালিত রিকশার অনিয়ন্ত্রিত চার্জিং একদিকে জাতীয় গ্রিডে বাড়তি চাপ তৈরি করছে, অন্যদিকে সরকার হারাচ্ছে রাজস্ব। আবার এই খাতের সঙ্গে লাখ লাখ মানুষের জীবিকাও জড়িত। ফলে রিকশা বন্ধের বদলে বিদ্যুৎ ব্যবহার ও চার্জিং ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণে এনে খাতটিকে একটি কার্যকর নীতিমালার আওতায় আনার বিষয়টিই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।